Image description

রাজধানীর পার্ক ও খেলার মাঠগুলো একসময় ছিল শিশু-কিশোরের দৌড়ঝাঁপ, খেলাধুলা আর বয়স্কদের বিকেলে অবসরের জায়গা। এখন সেখানে মাদকের কারবার, হকারের উৎপাত আর বখাটের আড্ডা। কোথাও দখল, আবার কোথাও শিশু পার্কের নামে বাণিজ্যিক ব্যবহারে হারিয়েছে সৌন্দর্য। ফলে ইট-পাথরের নগরে মোবাইলের পর্দায় আশ্রয় খুঁজে নিতে চায় সব শ্রেণির মানুষ।

সরেজমিনে গেলে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দারা বলে, পার্ক ও খেলার মাঠগুলো সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। এগুলোকে মাদকসেবীদের হাত থেকে মুক্ত করতে সিটি করপোরেশনেরও কোনো পদক্ষেপ নেই।

কালের কণ্ঠের সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন মাঠ ও পার্কের বড় অংশই কার্যত জনসাধারণের হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে। কোথাও মাঠ আছে, কিন্তু ব্যবহার করা যায় না।

কোথাও পার্ক আছে, কিন্তু তা মাদকসেবী ও বখাটেদের নিয়ন্ত্রণে। আবার কোথাও উন্মুক্ত জায়গা পুরোপুরি দখল হয়ে গেছে দোকানপাট, মেলা, টার্ফ, নির্মাণসামগ্রীতে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল শহীদ পার্ক মাঠে সন্ধ্যা নামতেই জড়োসড়ো হয়ে বসে পড়ে একদল ব্যক্তি। তরুণ থেকে বয়স্ক সব বয়সী মানুষ আছে।

সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে গাঁজার বিকট গন্ধ। বিশেষ করে মাঠের পশ্চিম পাশের ফার্নিচার গলিতে বিকট গন্ধ পাওয়া যায়। গত বুধবার সন্ধ্যায় সরেজমিনে গেলে এ চিত্র দেখা যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সুজন বলেন, বিকেল থেকেই এখানে অল্পস্বল্প মাদকসেবীর আড্ডা শুরু হয়। তবে জমে উঠে সন্ধ্যা নামতেই।

আশপাশের মাদকসেবীদের পাশাপাশি টাউন হলের বিহারি ক্যাম্পের মাদকসেবীরাও এখানে এসে যোগ দেয়। তারা পুরো এলাকার পরিবেশ নষ্ট করেছে। সাধারণ মানুষ রাতে এখানে হাঁটতেও পারে না।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রাজধানীর অভিজাত এলাকা লালমাটিয়ায় তিনটি মাঠ থাকলেও ব্যবহারযোগ্য মূলত একটি। স্থানীয়দের অভিযোগ, ডি ব্লকের মাঠ ও জাকির হোসেন রোডের মাঠ এখন মাদকসেবী, হকার ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের দখলে।

ডি ব্লকের মাঠের বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙাচোরা। স্থানীয়রা জানায়, জুলাই আন্দোলনের পর তদারকির অভাবে মাঠের আলোকবাতি, সিসিটিভি ক্যামেরা, শিশুদের খেলনা ও লোহার বিভিন্ন অবকাঠামো চুরি হয়ে গেছে। সন্ধ্যার পর মাঠজুড়ে বেড়ে যায় মাদকসেবী ও বখাটেদের আনাগোনা।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহিন আকন্দ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার ছেলে-মেয়েদের কাছে খেলাধুলা মানেই এখন মোবাইল গেম। বাইরে গিয়ে খেলবে, সেই সুযোগটাই নেই। মাঠ থাকলেও সেটা নানা কাজে দখল হয়ে থাকে।’

তাঁর ভাষায়, ‘আমরা ছোটবেলায় মাঠে গিয়ে বন্ধু বানিয়েছি, দল বেঁধে খেলেছি, হারজিত শিখেছি। এখনকার বাচ্চারা বাস্তবের চেয়ে ভার্চুয়াল বন্ধুকেই বেশি চেনে।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘এ ব্লকের মাঠটিই কেবল কিছুটা ব্যবহার করা যায়। কিন্তু ডি ব্লক আর জাকির হোসেন রোডের মাঠে বাচ্চাদের খেলাধুলার কোনো পরিবেশ নেই। সেখানে মাদকসেবী, হকার আর দোকানপাটে ভরে গেছে।’

মোহাম্মদপুরেও একই বাস্তবতা। ইকবাল রোড, টাউন হল, সলিমুল্লাহ রোড ও তাজমহল রোড এলাকায় থাকা ছয়টি মাঠের মধ্যে মাত্র দুটি কিছুটা ব্যবহারযোগ্য। বাকিগুলো দখল, বাণিজ্যিক ব্যবহার ও মাদকসেবীদের আড্ডায় অনিরাপদ হয়ে পড়েছে।

টাউন হলের শহীদ পার্ক মাঠের প্রবেশপথ দখল করে বসেছে চা-সিগারেটের দোকান, আসবাবের স্টল ও হকার। মাঠের এক কোণে নিয়মিত বসে মাদকসেবীদের আড্ডা। অন্য পাশে উন্মুক্ত মূত্রত্যাগের কারণে দুর্গন্ধে হাঁটাহাঁটির পরিবেশও নেই।

সলিমুল্লাহ রোডের মাঠে প্রতি রবিবার বসে অস্থায়ী বাজার। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মাঠে স্টল বসাতে নিয়মিত চাঁদা দিতে হয়। একই সঙ্গে সেখানে মাদক বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। তাজমহল রোডের মাঠ ও শেরশাহ সুরি রোডের ঈদগাহ মাঠেও সন্ধ্যার পর মাদকসেবীদের আনাগোনা বাড়ে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

এখানে নিয়মিত শরীরচর্চা করেন স্থানীয় বাসিন্দা জাহিদ পারভেজ খান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মোহাম্মদপুরে হাঁটাহাঁটি বা ব্যায়ামের মতো পরিবেশ আছে মাত্র দুটি মাঠে। বাকি মাঠে পরিবার নিয়ে যাওয়ার মতো না। বেশির ভাগ মানুষ মাদকসেবীদের উৎপাতের কারণে পার্কে বের হতে চান না।’

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায়ও পার্ক ও মাঠের তীব্র সংকট রয়েছে। চন্দ্রিমা হাউজিংয়ে একটি মাঠ থাকলেও কোনো পার্ক নেই। মোহাম্মদিয়া হাউজিং, একতা হাউজিং, নবীনগর হাউজিং, চাঁদ উদ্যান, তুরাগ হাউজিং, কাদেরাবাদ, কাঁটাসুর, আদাবর, মনসুরাবাদ, মেট্রো হাউজিং কিংবা সিটি হাউজিংয়ের মতো বড় বড় আবাসিক এলাকাগুলোতেও নেই কোনো মাঠ বা পার্ক।

বছিলা পশ্চিম ধানমণ্ডি এলাকার বাসিন্দা মো. আলম বলেন, ‘এখানে বাচ্চারা রাস্তায় খেলাধুলা করে। রাস্তার ভাঙা ইট-পাথরে আঘাত পেয়ে প্রায়ই আহত হয়।’

শেখেরটেক পিসিকালচার হাউজিং এলাকার বাসিন্দা হাসান বাপ্পি বলেন, ‘আমাদের এলাকায় কোনো খেলার মাঠ বা বিনোদনের জায়গা নেই। বাচ্চাদের দূরে মাঠে পাঠাতে ভয় লাগে। তাই তারা রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করে বা বাসায় বসে মোবাইল দেখে।’

শেরেবাংলানগরের পুরনো বাণিজ্যমেলার মাঠেও একই চিত্র। সন্ধ্যার পর মাঠের বিভিন্ন অংশে মাদকসেবী ও বখাটেদের আড্ডা বসে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। মাঠের চারদিকে ছড়িয়ে আছে ময়লা-আবর্জনা, বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হয়েছে গর্ত।

এলাকার বাসিন্দা ইমরান হোসেন বলেন, ‘বিকেল থেকেই এখানে মাদকসেবীরা জড়ো হয়। রাত বাড়লে বখাটেদের সংখ্যাও বাড়ে। ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটে। মাঠের অন্ধকার অংশে অসামাজিক কার্যকলাপও হয়।’

কারওয়ান বাজার ও বাংলামোটরসংলগ্ন পান্থকুঞ্জ পার্ক একসময় নগরবাসীর হাঁটাহাঁটি ও অবসরের অন্যতম জায়গা ছিল। এখন সেটির বড় অংশ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ, টিনের বেড়া ও নির্মাণসামগ্রীর দখলে। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, প্রকল্পের নামে পার্কটির বড় সবুজ এলাকা ধ্বংস করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা থাকার পরও বিভিন্ন সময়ে সেখানে নির্মাণকাজ চলেছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই উন্মুক্ত সবুজ স্থান কার্যত সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

অন্যদিকে প্রশস্ত সড়ক, লেক ও আধুনিক আবাসনের কারণে আফতাবনগরকে রাজধানীর অন্যতম পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু বাস্তবে শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার মাঠ নেই বললেই চলে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২ নম্বর ব্লকের মাঠটি বছরের বড় সময় মেলা, পশুর হাট, বাণিজ্যিক অনুষ্ঠান কিংবা অস্থায়ী প্যান্ডেলের দখলে থাকে। বিকেলে সেখানে শিশুদের খেলাধুলার চেয়ে বাইরের নানা কার্যক্রমই বেশি দেখা যায়।

এদিকে গুলশান এলাকার শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি পার্ক এবং শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক (গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক) নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। রাজউক উন্নয়ন শেষে পার্ক দুটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে বুঝিয়ে দিলেও বাস্তবে সেগুলোর ব্যবস্থাপনা স্থানীয় সোসাইটি বা ক্লাবের হাতে। বর্তমানে ফজলে রাব্বি পার্ক পরিচালনা করছে গুলশান সোসাইটি এবং গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক দেখভাল করছে গুলশান ইয়ুথ ক্লাব।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০০০ সালের ‘খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন’ অনুযায়ী কোনো মাঠ বা পার্ক ভাড়া, ইজারা বা অন্য কাজে ব্যবহার করা যায় না। আইনের ৫ নম্বর ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান বা জলাধারের শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না এবং সেগুলো অন্য কোনো ব্যবহারের জন্য ভাড়া, ইজারা বা হস্তান্তরও করা যাবে না।

এ ছাড়া ১৯৯৫, ২০০৯ ও ২০১৩ সালে হাইকোর্টের পৃথক তিনটি রায়েও বলা হয়েছিল, পার্ক ও খেলার মাঠে কোনো ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। কিন্তু বাস্তবে রাজধানীর বিভিন্ন মাঠে গড়ে উঠেছে স্থায়ী স্থাপনা, টার্ফ, দোকানপাট ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো। কোথাও আবার মাঠের ভেতরেই বসছে বাজার ও মেলা।

গুলশান সোসাইটির ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ আলমাস কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নাগরিকরা নিয়মিত কর দিলেও সিটি করপোরেশন থেকে প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছে না। রাস্তা, লেক ও পার্কের রক্ষণাবেক্ষণ এখন অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়দেরই করতে হচ্ছে।’

ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান বলেন, ‘নতুন এলাকা যুক্ত হওয়ায় চাপ বেড়েছে। তবে মাঠ ও পার্ক সংরক্ষণে আমরা কাজ করছি।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাঠ-পার্ক দখলদারদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। ঈদের পর দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যাবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত একটি মাঠ বা পার্ক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’

তবে নগর পরিকল্পনাবিদদের প্রশ্ন—পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই কি হারিয়ে যাবে ঢাকার অবশিষ্ট উন্মুক্ত গণপরিসর? কারণ কংক্রিটের শহরে মাঠ হারালে শুধু সবুজই হারায় না, হারিয়ে যায় শিশুদের শৈশবও।