আরো জটিল হচ্ছে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সংকট। উচ্চ সুদের হারে বিনিয়োগে মন্দা। বেসরকারি খাত ঋণ পাচ্ছে না। পেলেও তাতে ব্যবসায় খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফিন্যানশিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরলভাবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে যখন সুদের হার বাড়ানো হয়, তখন তার আঘাত সরাসরি গিয়ে পড়ে উৎপাদনশীল খাতের ওপর। ব্যাংকঋণের এই ক্রমবর্ধমান ব্যয় ব্যাবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার খরচ বা কস্ট অব ডুইং বিজনেস এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায় যে পণ্যের উৎপাদন খরচ আর প্রতিযোগিতামূলক থাকে না। কাঁচামাল কেনা থেকে শুরু করে শ্রমিকের মজুরি মেটানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যখন বাড়তি সুদের বোঝা টানতে হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসার নিট মুনাফায় টান পড়ে।’
তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে বেসরকারি খাত ও সাধারণ মানুষের জীবনযাপন জটিল এবং বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রানীতির কঠোর অবস্থান শিল্পোৎপাদন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে ঋণের সুদহারের ওপর যে ক্যাপ বা সীমা ছিল, তা তুলে দিয়ে বাজারভিত্তিক সুদহার প্রবর্তনের ফলে বর্তমানে ব্যাংকঋণের সুদ ১৪ থেকে ১৬ শতাংশের ঘরে পৌঁছেছে। এই উচ্চ সুদহারের প্রভাবে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে এসেছে, যা বর্তমানে ৯ শতাংশের আশপাশে ঘোরাঘুরি করছে। এর ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের প্রবাহ প্রায় ৩০ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে এবং উদ্যোক্তারা নতুন কোনো প্রকল্প হাতে নেওয়ার পরিবর্তে বিদ্যমান ঋণের বোঝা কমাতেই বেশি ব্যস্ত থাকছেন। উচ্চ সুদের কারণে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কমে গেছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শিল্প খাতের অভ্যন্তরীণ সংকট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় গত এক বছরে গড়ে ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। পোশাক খাতের উৎপাদন খরচও প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং এলপি গ্যাসের উচ্চমূল্যের কারণে পরিবহন ও উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন কাঁচামাল আমদানির খরচ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে দেশের মোট শিল্প-কারখানার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, মূলধনসংকট ও লোকসানের ভার সইতে না পেরে গত তিন বছরে অন্তত ৪০০ কারখানা বন্ধ হয়েছে। বড় কারখানাগুলো গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তাদের পূর্ণ সক্ষমতার মাত্র ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে, যা সামগ্রিক শিল্পোৎপাদন স্থবির করে দিয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের টার্নওভার বা লেনদেন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অন্তত ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমেছে বলে বাজার বিশ্লেষণে জানা যায়।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামাল দিতে দেশের বাজারেও গত ১৮ এপ্রিল সরকার মূল্য সমন্বয় করেছে। নতুন দর অনুযায়ী, ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেনের দাম ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রলের দাম ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে বাজারে। ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানোর পর ট্রাকভাড়া কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত সব পণ্যের দাম বেড়েছে।
গত তিন মাসের ব্যবধানে রান্নায় ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে সরকার নির্ধারিত দর এক হাজার ৯৪০ টাকা। কিন্তু ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে আরো ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়তি দাম দিয়ে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ১২ কেজি এলপিজির সিলিন্ডারের দাম ছিল এক হাজার ৩৫৬ টাকা।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা এখনো পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেনি বাজার। এর মধ্যেই আবার বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে তোড়জোড় শুরু করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বিইআরসি সূত্রে জানা গেছে, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিপিডিবি। বর্তমানে পাইকারি বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ৪ পয়সা। গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম প্রতি ইউনিট ৮ টাকা ৯৫ পয়সা। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প খাত—সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বাড়বে।
জ্বালানি তেল, এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ে ভোক্তার ওপর। এর ফলে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। এরই মধ্যে বাজারে শাক-সবজি থেকে প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর খুচরা বাজারের তথ্য ও টিসিবির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত তিন মাসের ব্যবধানে ফার্মের মুরগির ডিম প্রতি ডজনে ২১ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে কাঁচা পেঁপে কেজিতে ১৫০ থেকে ১৬৭ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে। বেগুন জাতভেদে কেজিতে ৬০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত, কাঁচা কলা হালিতে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে। সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৩ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে প্রতি লিটার বোতল ২০০ টাকায় এবং খোলা সয়াবিন তেল ১৮৬ থেকে ১৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি মানের চাল কেজিতে ৩ শতাংশ বেড়ে মানভেদে ৬০ থেকে ৬৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সাধারণ মানুষের আয় বাড়েনি। সর্বশেষ মূল্যস্ফীতির সরকারি তথ্য বলছে, এপ্রিলে তা বেড়ে ৯.০৪ শতাংশ হয়েছে। এটি আগের মাসে ৮ শতাংশের ঘরে ছিল। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির মানে আগের বছরের এই সময়ে যেসব পণ্য ১০০ টাকায় কেনা যেত, চলতি বছরের একই সময়ে তা কিনতে হচ্ছে ১০৯ টাকার চেয়েও বেশি দরে। অথচ এই সময়ে এই হারে বেতন বা মজুরি বাড়েনি। এটি সরকারি হিসাব হলেও বাস্তবতা বলছে, বাজারে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২ থেকে ১৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপণ্যের দাম গত এক বছরে ক্ষেত্রভেদে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে সীমিত আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে স্কেলের জোরালো দাবিতে। সরকার পে স্কেল দেওয়ার ঘোষণা দিলেও অর্থের অভাবে তা বাস্তবায়ন করতে পারছে না। এতে সরকারের অন্তত এক লাখ কোটিরও বেশি টাকা দরকার। অথচ সরকার রাজস্ব আয়ে প্রায় লাখ কোটি টাকা ঘাটতির কারণে এখন ব্যাংক থেকে ঋণ করে চলছে। সরকারি কর্মচারীদের পে স্কেল দেওয়ার চাপের মধ্যে তা সীমিত পরিসরে দেওয়ার চিন্তা করছে।
বলা যায়, একদিকে সরকার তহবিল সংকটে হাত খুলে খরচ করতে পারছে না, বরং নিত্যদিনের রাষ্ট্রীয় খরচ মেটাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অতি মাত্রায় ধার করছে; অন্যদিকে সরকারের নিজস্ব বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ-ব্যবসায় মন্দার কারণে কাঙ্ক্ষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কর্মসংস্থান হচ্ছে না ঠিকমতো। কারখানা বন্ধের ফলে অনেক মানুষ যেমন চাকরি হারাচ্ছে, আবার নতুন কাজের সুযোগও তৈরি হচ্ছে না; কিন্তু খরচ বাড়ছে লাগামহীন। পরিবারের খরচ মেটাতে অনেককে ধার করতে হচ্ছে। অনেকের জন্য টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ছে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ছোট-বড় সব খাতের শিল্পোদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরাও কঠিন দিন পার করছেন।
বস্ত্র খাতের শীর্ষ সংগঠন বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের নীতি সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবান্ধব নীতির অভাবে দেশের ব্যবসায়ীরা বর্তমানে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন। ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হার এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আস্থাহীনতার কারণে বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কারখানা পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান প্রায় বন্ধ হওয়ার অবস্থায় পৌঁছেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সরকারের বিলাসী প্রকল্পের চাপে দেশের অর্থনীতি এখন চরম মন্দার মুখোমুখি। এই পরিস্থিতিতে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো জরুরি। পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতার পরিবর্তে আমদানি বিকল্প শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে হবে।’
অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ব্যবসার আয়ের চেয়ে ব্যাংকঋণের সুদ পরিশোধের দায় বেড়ে যাচ্ছে, যার ফলে অনিবার্যভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসানের মুখে পড়ছে। যখন একটি সম্ভাবনাময় ব্যবসা লোকসান দিতে শুরু করে, তখন তার পক্ষে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এভাবেই আমাদের অর্থনীতিতে অনিচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির একটি নতুন শ্রেণি তৈরি হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৃহৎ মন্দঋণ পুনর্গঠন কমিটির অভিজ্ঞতায় মনে করি, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের সঙ্গে এই নিরুপায় উদ্যোক্তাদের গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না।’
ব্যবসায়ী-অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সুদের হারের এই অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লম্ফন নতুন বিনিয়োগও নিরুৎসাহ করছে। একজন ব্যবসায়ী যখন দেখেন যে ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা করেও মুনাফার বদলে লোকসান গুনতে হচ্ছে, আর তার চেয়ে বেশি অর্থ ব্যাংকের ঋণের সুদ মেটাতেই চলে যাবে, তখন তিনি সম্প্রসারণের চিন্তা বাদ দিয়ে টিকে থাকার লড়াইয়ে মন দেন। এর ফলে কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘ মেয়াদে জাতীয় প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে পড়ে। তাই শুধু মুদ্রানীতির কড়াকড়ি দিয়ে অর্থনীতি সামাল দেওয়ার চিন্তা না করে আমাদের উৎপাদনশীল খাতের উদ্যোক্তাদের ওপর এই সুদের হারের প্রভাব কতটা বিধ্বংসী হতে পারে, তা গভীরভাবে পুনর্বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি।