ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল শেখ হাসিনা সরকারের পতন-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়। তখন কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের পাশাপাশি দলটির পশ্চিমবঙ্গের নেতাদের অনেকের কথায়ও ছিল উসকানি। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ওইসব নিয়ে খুব বেশি প্রভাব পড়েনি। কারণ, তখন পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় ছিল মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল সরকার। তবে এই পারদের উচ্চতা একটু একটু করে বাড়তে থাকে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনে মমতার জায়গায় বিজেপির প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর এগিয়ে থাকার সময় থেকেই। চূড়ান্ত ফলাফলে বিজেপির জয়লাভ নিশ্চিত হওয়ার পর নিউমার্কেটসহ বেশকিছু এলাকায় ভাঙচুরের ঘটনায় উত্তেজনা আরেকটু বাড়তে থাকে। এরপর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল দেশটির অবৈধ নাগরিকদের পুশব্যাক করার জন্য বাংলাদেশের কাছে সহযোগিতা চেয়ে বক্তব্য দেন। সর্বশেষ শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার একদিন আগে শুক্রবার রাতেই বিএসএফ-এর গুলিতে প্রাণ হারান দুই বাংলাদেশি। এমন পরিস্থিতিতে পর্যবেক্ষক মহলের পাশাপাশি বাংলাদেশের জনমনেও একধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। বলা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকার দায়িত্বশীল না হলে দুদেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে আগের রাজনৈতিক দল হিসাবে বিজেপির অবস্থান এবং শাসনক্ষমতায় বসা বিজেপির মধ্যে পদক্ষেপের পার্থক্য থাকবে-এমন প্রত্যাশাও রয়েছে তাদের।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন, ‘বিজেপি নেতাদের বক্তব্যে উৎকণ্ঠার জায়গা আছে। তাদের সরকারের নানা মহল থেকে যেসব বক্তব্য আসছে, সেগুলোকে রাষ্ট্রসম্পৃক্ত বক্তব্য মনে হচ্ছে না।’ যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘অভ্যন্তরীণভাবে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব বা যে যার অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য এ ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন। কিন্তু মনে রাখা ভালো, ভারত ও বাংলাদেশ দুটি পৃথক দেশ। মুক্তিযুদ্ধে তারা আমাদের সহযোগিতা করেছিল। কিন্তু আমরা দেশ ও জাতি হিসাবে আত্মমর্যাদাশীল। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক রাখতে চায়। ভারতের সঙ্গে আমরা কোনো সংঘাতে যেতে চাই না। সম্পর্কও খারাপ করতে চাই না। যে বক্তব্যগুলো আসছে, তা মূলত ভারতের অভ্যন্তরীণ কারণেই। কিন্তু সেসব সমস্যা যদি বাংলাদেশের ওপর চালান দিতে চায়, তাহলে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জটিলতা বাড়বে। মনে করি, এ রাস্তায় না হাঁটাই ভালো হবে। কারণ, ভারত নেতিবাচক অবস্থার সৃষ্টি করলে বাংলাদেশও তার অবস্থান শক্ত করবে। জাতীয়ভাবেই তখন বাংলাদেশকে একটা অবস্থান নিতে হবে। যারা বাংলদেশি নন, তাদের যদি ভারত একটি সাম্প্রদায়িকতার চেহারা দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠায়, তাহলে বাংলাদেশকে এর বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। এটি বাংলাদেশের মানুষের চাহিদাও।’
তিনি বলেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রীও সে কথাই বলেছেন। এতে দুই দেশের সম্পর্ক অবনতি হওয়ার আশঙ্কা আছে। মনে রাখতে হবে, আমরা প্রতিবেশী এবং উভয়কেই উভয়ের প্রয়োজন। সেটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, পারস্পরিক বোঝাপড়া, শ্রদ্ধা ও স্বার্থের ভিত্তিতে চালু থাকা উচিত।’
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচনের আগে ও পরে ‘বাংলাদেশ’ অন্যতম ইস্যু। ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রার্থী ও কেন্দ্রের সরকারের দায়িত্বশীল অংশ থেকে বাংলাদেশ বিষয়ে কয়েকটি বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্ককে আবারও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ভারতের অবৈধ নাগরিকদের বাংলাদেশে পুশব্যাক এবং ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত আরও জোরদারবিষয়ক বক্তব্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুই দেশের অবনমিত সম্পর্ক নতুন করে জোড়া দেওয়ার চেষ্টার কথা বলে আসছে ঢাকা ও দিল্লি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমান্তে হত্যা চলতে থাকলে এবং অস্থিরতা সৃষ্টি ও পুশব্যাকের বিষয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য এলে তা জটিলতা বাড়াবে। নির্বাচনে জয়লাভের পর বিজেপি সরকারের দায়িত্বশীল জায়গা থেকে বক্তব্য বুঝেশুনে দেওয়া উচিত। দলটি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৪৫ দিনের মধ্যে জমি অধিগ্রহণ করে সীমান্তের উন্মুক্ত স্থানে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হবে-এমন বক্তব্য দিয়েছিলেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা অমিত শাহ। মমতা ব্যানার্জির বিপরীতে বিজেপির প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী ভোটের আগে-পরেও বাংলাদেশ বিষয়ে নানা বক্তব্য দিয়েছেন। নির্বাচনের মধ্যেই ‘পুশইন’ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনে বিজয়ের পর এবং সরকার গঠনের মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যেই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি বরাদ্দ দেওয়া হবে। এতে আরও বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন করলে সীমান্ত নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাজ্য সরকারের পূর্ণ সহযোগিতায় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এবং পুলিশ যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করবে। এতে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় যে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন হচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গবেষক ব্রি. জে. (অব.) মো. বায়োজিদ সরোয়ার যুগান্তরকে বলেন, ‘বিজেপির কেন্দ্রের ও পশ্চিমবঙ্গের কিছু নেতা নির্বাচনি প্রচারণার সময় এনআরসি এবং সিএএ কার্যকরের কথা বলেছেন। তথাকথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের পুশব্যাকের কথা বলেছেন। বিজেপি ক্ষমতায় আসার ফলে বাংলাদেশের জনপরিসরে এসব বিষয় নিয়ে শঙ্কা ও উৎকণ্ঠা প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষত সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব দেখা গেছে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সীমানা সবচেয়ে বেশি। এসব ঘটনায় সীমান্তে উত্তেজনা দেখা দিতে পারে। অতীতে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে (বিশেষত মুসলমান) ঘৃণাসূচক বক্তব্য বেড়েছে। বেড়েছে গণপিটুনি ও সহিংসতা। এসব বিবেচনায় বাংলাদেশের মানুষের মনে নানা আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে আমি মনে করি, বিজেপি সরকার মুসলমানদের বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে ঠেলে দেওয়ার মতো চরম পদক্ষেপ নেবে-এমন আশঙ্কা কম।
অবশ্যই সীমান্তে বিজিবিকে সতর্ক থাকতে হবে। নজরদারি এবং সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।’
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ এবং ভারত ৪,১৫৬.৫৬ কিমি. দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমানা ভাগাভাগি করছে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ২২১৬.৭ কিলোমিটার। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে এই সীমান্তের মধ্যে ১৬৪৭.৬৯৬ কিলোমিটারে বেড়া দেওয়া হয়েছে। বাকি ৫৬৯.০০৪ কিলোমিটার সীমান্তে এখনো বেড়া দেওয়া হয়নি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সফিউল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের যেসব জায়গায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়নি বা যায়নি, এবার ভারতের পক্ষ থেকে সেখানেও বেড়া দেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে। ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে কুমির-সাপ ছেড়ে দেওয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়গুলো বাংলাদেশকে সতর্কতার সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে।’
‘ভারতে কয়েক লাখ মানুষকে ভোট দিতে দেওয়া হয়নি। বলা হয়েছে, এরা বাংলাদেশের মানুষ। তাই পুশব্যাকসহ নানা ইস্যুতে বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে’, যোগ করেন এই সাবেক কূটনীতিক।