সারা দেশে চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বিষয়টি বার বার বলে আসছেন। এরপর গত রোববার রাতে চাঁদাবাজির অভিযোগে কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল কাইয়ুমকে আটক করে পুলিশ। এই আটকের মধ্য দিয়ে সমাজে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছে তারেক রহমানের সরকার। যদিও আটকের ১২ ঘণ্টা পর মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে রেজাউল কাইয়ুমকে। ফলে এ নিয়ে কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হলেও অপরাধ বিশ্লেষক ও সমাজের বিশিষ্টজনরা বলছেন, এটাও বা কম কিসে! কারণ অতীতে কোনো সরকারকে নিজ দলের কারও বিরুদ্ধে এমন সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যায়নি।
তাদের মতে, বিএনপি সরকার সত্যিকার চাঁদাবাজদের দু-একজনকে ধরলে দেশে চাঁদাবাজি অর্ধেকে নেমে আসবে। আর যদি পুরো মাত্রায় অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার শুরু করে তাহলে চাঁদাবাজি পুরোপুরি বন্ধ হতে বাধ্য।
সূত্রগুলো বলছে, সরকারের সুনাম ক্ষুণ্ন হয় এমন কিছু বরদাশত করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরকারের গ্রিন সিগনাল পেয়ে লাগাতার অভিযান শুরু করেছে। ইতোমধ্যে সারা দেশে চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ করে ‘অলআউট’ অ্যাকশনে নেমেছে তারা।
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেশের সবকটি মহানগর এলাকা, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার পুলিশ সুপার ও অন্যান্য ইউনিটকে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আইনের আওতায় আনার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চাঁদাবাজির মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করতেও সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানিয়েছেন, চাঁদাবাজদের বিষয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ‘জিরো টলারেন্স’ (শূন্য সহনশীলতা) নীতি কঠোরভাবে পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে-চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী সে যে দলেরই হোক, যত বড় নেতাই হোক না কেন, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে ‘অ্যাকশন’ শুরু হয়ে গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই যৌথ অভিযান শুরু করার কথা বলেছেন।
সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, চাঁদাবাজি, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে আমরা যৌথ অভিযান চালাচ্ছি। গত ১ মে থেকে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান শুরু করেছে। সূত্র বলছে, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের দমনে পুলিশের পক্ষ থেকে পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় বিট পুলিশিংয়ের আদলে কমিটি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কমিটির নাম হতে পারে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি, কমিউনিটি পুলিশিং বা বিট পুলিশিং। ওইসব কমিটিতে মসজিদ, স্কুল, ব্যবসায়ী প্রতিনিধিসহ রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ সবাই অন্তর্ভুক্ত হবে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তখনই অভিযান পরিচালনা করে যখন অপরাধটা মহামারির আকার বা একটা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তাছাড়া অতীতে এ ধরনের অভিযানে মূল চাঁদাবাজরা গ্রেফতার হওয়ার নজিরও তেমন নেই। তবে ২৪-এর জুলাই আন্দোলনের পরের নির্বাচিত সরকার মূল চাঁদাবাজদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে আশা প্রকাশ করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান যুগান্তরকে বলেন, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ইউনিটভিত্তিক কঠোর অভিযান চলছে। এর পাশাপাশি থানায় চাঁদাবাজির যে মামলাগুলো হচ্ছে, সেগুলোর তদন্ত এগুচ্ছে কিনা তা নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। চাঁদাবাজির মামলাগুলো তদন্ত দ্রুত শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক যুগান্তরকে বলেন, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে কোনো অবস্থাতেই পার পাওয়ার সুযোগ নেই। ঢাকা রেঞ্জের সব পর্যায়ের কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে যথাযথ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চাঁদাবাজদের গ্রেফতারে লাগাতার অভিযান অব্যাহত আছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, চাঁদাবাজদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী অ্যাকশন প্ল্যান প্রস্তুত করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জিরো টলারেন্স নীতিতে অটল, এমনটি জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, এবার যে কোনো মূল্যে দেশকে চাঁদাবাজ মুক্ত করা হবে। তিনি বলেন, সরকারের সামনে এ মুহূর্তে জাতীয় কিছু ইস্যু রয়েছে। তবে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ মুহূর্তে বড় কাজ হচ্ছে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক সমূলে উৎপাটন করা। এ নিয়ে সরকার সিরিয়াসলি কাজ করছে বলে জানান তিনি।
ঢাকা মহানগরীতে তিন দিনে গ্রেফতার ১৩৩ চাঁদাবাজ : ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) আটটি ক্রাইম বিভাগের ভিত্তিতে এক হাজার ২৫৪ জন চাঁদাবাজের একটি তালিকা তৈরি করেছে। সেই তালিকায় থানাভিত্তিক চাঁদাবাজদের নাম রয়েছে। তালিকা ধরে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে ডিএমপি বিভিন্ন থানা ও গোয়েন্দা বিভাগ। গত তিন দিনে ৬৫ জন তালিকাভুক্তসহ ১৩৩ জন চাঁদাবাজকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির আলামত জব্দ করা হয়েছে।
গত রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেছেন, চাঁদাবাজসহ অপরাধীদের ছাড়াতে কেউ তদবির করলে ধরে নেওয়া হবে সেও চক্রের সঙ্গে জড়িত। তদবিরে কাউকে ছাড়া হবে না। চাঁদাবাজ যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের জন্য উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি। শহরের ফুটপাত থেকে শুরু করে বড় শিল্পকারখানা, গণপরিবহণ ও নির্মাণাধীন ভবনসহ বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট তৎপর হয়েছে বলে আলোচনা আছে। চাঁদার টাকা না পেয়ে হামলার অসংখ্য ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকারের শীর্ষপর্যায়ের নির্দেশে চাঁদাবাজ ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের তালিকা হালনাগাদ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট।
চাঁদাবাজদের নিয়ে র্যাবের তৈরি করা এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা দেশে চাঁদাবাজদের গডফাদার রয়েছে ৬৫০ জন। এসব গডফাদারের অধিকাংশেরই রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়, যা তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এছাড়া চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বন্ধ এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ৬৪ জেলার প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করেছে পুলিশ। এই তালিকায় প্রায় চার হাজার চাঁদাবাজের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা পেয়ে চাঁদাবাজ গ্রেফতারে মাঠে নেমেছে র্যাব। ১৫টি ব্যাটালিয়ন একযোগে অভিযান শুরু করেছে। আশা করছি খুব শিগগিরই ভালো ফলাফল আসবে।
অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, আমাদের দেশে অতীতে দেখা গেছে, অভিযান পরিচালনা করে যাদের ধরা হয়, তারা মূল চাঁদাবাজ না। তারা অন্য কারো হয়ে কাজ করে। যার হয়ে বা যে গ্রুপের হয়ে কাজ করে সেই গ্রুপের পৃষ্ঠপোষক নেতারা সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। ফলে চাঁদাবাজদের মূল নেতা বা মূল পৃষ্ঠপোষকদের গ্রেফতারের বাইরে রেখে এই অভিযানে মোটা দাগে অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
ড. তৌহিদুল হক আরও বলেন, আমাদের দেশে যারা ক্ষমতায় থাকে, রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক সরকার প্রত্যেকেরই একটা সুবিধাভোগী নিজস্ব বাহিনী তৈরি হয়। তারা ক্ষমতাকে ব্যবহার করে আধিপত্য বিস্তার বা আক্রমণ করে এই চাঁদাবাজির ঘটনাগুলো সৃষ্টি করে।
তিনি বলেন, অভিযানের মাধ্যমে যারা চাঁদাবাজির মূল হোতা, যাদের নির্দেশে চাঁদাবাজির ঘটনাগুলো ঘটে সেই হোতাদের খুঁজে বের করে এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কোনো অপরাধী যেন রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় না পায়, রাজনৈতিক দলের কাছে সেটাই আমরা প্রত্যাশা করি। শুধু বক্তৃতায় বা বিবৃতি দিয়ে মানুষকে আশা দেখানোর পরিবর্তে ব্যবস্থা গ্রহণ করে বর্তমান সরকারকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।