দুর্নীতিবিরোধী একমাত্র রাষ্ট্রীয় সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক এখন অকার্যকর। দুই মাস ধরে কমিশন নেই। আইন অনুযায়ী, কমিশনের স্যাংশন ছাড়া নতুন কোনো অনুসন্ধান শুরু করা যাচ্ছে না। একই কারণে সম্ভব হচ্ছে না নতুন কোনো মামলা দায়ের। দায়ের হওয়া মামলাগুলো তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয়া যাচ্ছে না। বন্ধ রয়েছে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ, অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ, চার্জশিট অনুমোদন, বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল, আসামির পক্ষে দেয়া হাইকোর্ট বিভাগের জামিন আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের সিদ্ধান্ত, আইনজীবী নিয়োগসহ গুরুত্বপূর্ণ সব মৌলিক কার্যক্রম। ছোট-বড় সব ধরনের দুর্নীতি দমন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। আসামি নাগের ডগায় ঘুরে বেড়ালেও গ্রেফতার নেই। জামিনে কারামুক্ত হলেও আটকানোর আইনি পথ নেই। দৈনিক অন্তত ডজনখানেক দুর্নীতির নতুন অভিযোগ জমা পড়লেও সেসব যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত দেয়ার কেউ নেই। দুর্নীতির অভিযোগের পাহাড় জমে আছে। শতাধিক চার্জশিট ঝুলছে কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায়। কমিশনের অনুমোদন ছাড়া বিচারার্থে কোনো মামলাই আদালতে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না। দুদক কর্মকর্তাদের নিয়মিত কার্যক্রম চলছে অনেকটা ফ্রি-স্টাইলে।
দীর্ঘদিনের গভীর এই অচলাবস্থা সহসাই নিরসন হবেÑ এমন কোনো আভাস কোনো দিক থেকে মিলছে না। কারা পরবর্তী কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেতে পারেন, এমন সম্ভাব্য ব্যক্তিদের নাম মুখে মুখে ঘুরে বেড়ালেও দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ অনুযায়ী গঠিত ‘সার্চ কমিটি’র কোনো কার্যক্রমের কথাও জানা যায় না। এর ফলে দুর্নীতিবাজদের মাঝে বইছে এক প্রকার প্রশান্তির হাওয়া। চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ শিবিরে রীতিমতো চলছে উল্লাস। তারা কমিশনহীনতার এই সুযোগটিতে অবৈধ উপায়ে অর্জিত টাকা-কড়ি নিরাপদে সরিয়ে নিতে পারছে। বিচারিক আদালতের দেয়া ‘দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা’ হাইকোর্টে উবে যাচ্ছে কর্পূরের মতো। জব্দকৃত ব্যাংক অ্যাকাউন্টও খুলে যাচ্ছে উচ্চ আদালতের আদেশে। অথচ আদালতে এই ঘটনাগুলো ‘ঠেকিয়ে’ দিতে সিদ্ধান্ত দেয়ার কেউ নেই। দুদক কর্মকর্তারা এসব তাকিয়ে দেখছেন। কিছুই করার থাকছে না। যদিও দুদক সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহিম এ প্রতিবেদকের দাবি, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় দুদকের মামলাগুলো দেখছে। আনকন্টেস্টে কোনো আসামিই জামিন পাচ্ছে না! এ বিষয়ে তার সঙ্গে সরকারের শীর্ষ আইন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে ২০০৪ সালের পর দুদক এত দীর্ঘ সময় কখনো অকার্যকর থাকেনি। ‘দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪’-এর মাধ্যমে ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’কে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’-এ উন্নীত করা হয়। তিন সদস্যের কমিশন গঠনের পরও সংস্থাটিকে অকার্যকর করে রাখা হয়। ওই সময় দুদক ‘সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের ৪শ’ গাড়ি উধাও’ হয়ে যাওয়ার ঘটনা পরীক্ষামূলকভাবে অনুসন্ধানে নামে। অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় যখন ৪শ’ গাড়ির তালিকা, বরাদ্দপ্রাপ্ত, ব্যবহারকারীসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত মন্ত্রিপরিষদের কাছে চাওয়া হয়, তখনই বাধে বিপত্তি। তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. সা’দাত হুসাইন পাল্টা চিঠি দিয়ে প্রশ্ন তোলেন, দুদক কোন বিধির আলোকে অনুসন্ধান শুরু করেছে? পরে বিধি না হওয়া পর্যন্ত দুদক অনুসন্ধান-তদন্ত কার্যক্রমকে ‘বিলম্বিত’ ঘোষণা করেন তিনি। ২০০৭ সালে অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিধি প্রণয়নের পর দুদক সত্যিকারার্থে অনুসন্ধান-তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে। বিশ্লেষক মহলের তখন বুঝতে বাকি রইল না যে, মূলত আমলাদের দুর্নীতির রেকর্ডপত্র নিয়ে টান দেয়াতেই দুদককে তৎকালীন ব্যুরোক্রেসি প্রায় তিন বছর পরিকল্পিতভাবে ‘অকার্যকর’ করে রাখে। বর্তমান দুদকের ‘অকার্যকারিতা’র সঙ্গে ওই সময়কার পরিস্থিতির সাদৃশ্য পাওয়া যায়। বিশ্লেষক মহলের সন্দেহ, এবারো সুপরিকল্পিতভাবে দুর্নীতিবাজরাই সংস্থাটিকে অকার্যকর করে রেখেছে কি না। এমন সন্দেহের যুক্তিসঙ্গত কারণও রয়েছে।
ফ্যাসিস্ট হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলজুড়ে চলে অবাধ লুণ্ঠন। সৃষ্টি হয় এস.আলম, সামিট গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, শিকদার গ্রুপ, বেক্সিমকো, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, হামিম গ্রুপ, আরামিট গ্রুপ, নোমান গ্রুপ, ইউনাইটেড গ্রুপের মতো অলিগার্ক, লুটেরা শ্রেণি। ঋণের নামে ব্যাংকগুলো ফতুর করে দেয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি হয়। রেন্টাল-কুইকরেন্টালের নামে বেসরকারি বিদ্যুৎপ্রকল্পের নামে লুট করা হয় হাজার হাজার কোটি টাকা। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, পদ্মাসেতু নির্মাণ, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ, জমি অধিগ্রহণ, পায়রা বন্দর, কর্ণফুলী টানেল, মেট্টোরেল, আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ, সারাদেশে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিরাট ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণ, স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটা, নদী খনন, মহাসড়ক প্রশস্তকরণ, আইসিটি খাত, পরিবেশ ও জলবায়ু খাতসহ যেন কোনো সেক্টর নেইÑ লুটপাট হয়নি। জালজালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক ঋণ, কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিবারভিত্তিক ব্যাংকগুলোতে পরিচালকদের বেনামি ঋণ এবং ঋণের টাকা বিদেশে পাচারের ঘটনা ঘটে বেশুমার। ১৫ বছরে বিভিন্ন দেশে পাচার হয় ২৮ লাখ কোটি টাকা। আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত হাসিনা সরকারের এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হয়েছিল চব্বিশের ৫ আগস্ট হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর। দুর্নীতি দমন কমিশন লুটেরা অলিগার্ক প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা করে। ১৪১টি মামলা রুজু করে। মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অর্থ-সম্পদ জব্দ করে। তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয়। ১৫টি মামলার চার্জশিট দেয়। ছয়টি মামলার রায় হয়। আদালতের আদেশ নিয়ে সংস্থাটি দেশ-বিদেশে অন্তত ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার সম্পদ জব্দ করে।
দুদকের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকও পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ডিভিশন’ নামে বিশেষ সেল গঠন করে। এ ছাড়া দুর্নীতি তদন্তে দুদককে অন্তর্ভুক্ত করে যৌথ তদন্ত কমিটি (জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিম-জিট) গঠিত হয়। বলা চলে, হাসিনামুক্ত বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী একটি ঢেউ তুলতে সমর্থ হয়। নানা সমালোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়ে হরেও ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন নেতৃত্বাধীন কমিশন এ কার্যক্রমগুলো চালিয়ে আসছিল। গত ৩ মার্চ তিনিসহ তিন কমিশনার পদত্যাগের পর দুদক কার্যক্রম স্তব্ধ হয়ে যায়। তখন মানুষ ধারণা করেছিল হয়তো অচিরেই নুতন কমিশন দায়িত্ব নেবেন। গতকাল রোববার (৩ মে) দুদক অভিভাবকহীনতার দুই মাস অতিক্রম করল। অদ্যাবধি সংস্থাটিতে নিয়োগ দেয়া হয়নি কোনো কমিশন। এ যেন প্রবল গতি নিয়ে ধাবমান দুদককে হঠাৎ থামিয়ে দেয়া! কেন, কী কারণ? এ প্রশ্নের কোনো উত্তর মিলছে না।
এদিকে বিদ্যমান আইনে দুদক পুনর্গঠন সংক্রান্ত ‘সার্চ কমিটি’র সদস্য সচিব এবং সদস্য হতে পারেনÑ এমন দু’জন সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ হয় এ প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশে আপত্তি জানিয়ে তারা বলেন, অদ্যাবধি সার্চ কমিটি সভা করার কোনো চিঠি আমি পাইনি। এমন কোনো আভাষ-ইঙ্গিতও তারা পাননি বলে জানান।
এর আগে গতবছর ২৩ ডিসেম্বর ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দুদকের সংস্কার সম্বলিত একটি অধ্যাদেশ করে। বর্তমান জাতীয় সংসদ সেটি অনুমোদন করেনি। ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটি অকার্যকর হয়ে যায়। সংসদে সরকার পক্ষ তখন অধ্যাদেশটি অনুমোদন না করার পক্ষে যুক্তি তুলে বলা হয়, সংস্কার আইনটি নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত বা আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
তবে আইনজ্ঞরা বলছেন, সরকার বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের করা অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদন না-ই করতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে, দুদক অকার্যকর হয়ে পড়ে থাকবে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেন চৌধুরীর মতে, সংস্থাটির অকার্যকর করে রাখার আইনগত কোনো কারণ দেখি না। অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছেÑ এখন ২০০৪ সালের আইন বিদ্যমান। এই আইনেই দুদক পুনর্গঠন হবে।
প্রায় অভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। তার মতে, পূর্বতন সরকারের অধ্যাদেশ পরবর্তী সরকারকে অনুমোদন করতেই হবেÑ এমন বাধ্যবাধকতা নেই। দুদক নিয়ে সরকারের হয়তো ভিন্ন চিন্তা রয়েছে। এ কারণেই হয়তো বিলম্ব করছে।
তিনি বলেন, বিদ্যমান আইনে (২০০৪ সালে প্রণীত) দুদক পুনর্গঠিত হতে পারত। কিন্তু দুই মাস গত হলেও সেটি হয়নি। এতে নিশ্চিতভাবেই দুর্নীতিবাজরা বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে। কারণ একটি নোটিশ দিতে কমিশনের সিদ্ধান্ত লাগে। কোনো কর্মকর্তাকে তদন্তভার দিতে কমিশন লাগে। এসব থেকেই স্থবির হয়ে আছে।
‘এই অচলাবস্থা সৃষ্টি পরিকল্পিত কি না’-জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরাসরি এমনটি বলা যাচ্ছে না। তবে আমরা একটি বিষয় লক্ষ করছি, বিগত কমিশনার কী কারণে পদত্যাগ করেছেন, আমরা জানি না। যদিও তারা পদত্যাগের কারণ ‘ব্যক্তিগত’ বলে উল্লেখ করেছেন। সরকারের দিক থেকে তাদের ওপর কোনো চাপ ছিল কি-না, আমরা জানি না। হয়তো সরকারের পরামর্শ কিংবা নির্দেশনাই তারা পদত্যাগ করেছেন। দুদকের কার্যক্রমের গতি নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সরকারের উচিত ছিল আইনানুযায়ী গঠিত সার্চ কমিটির মাধ্যমে কমিশন পুনর্গঠন করা। দ্রুত কমিশন নিয়োগ দেয়া উচিত। না হলে দুর্নীতি প্রশ্নে এ সরকারের অবস্থান নিয়ে মানুষ সন্দেহ পোষণ করবে।
অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মো. মঈদুল ইসলাম বলেন, বিদ্যমান পরিস্থিতি সৃষ্টি করা পরিকল্পিত কি-না সেটি স্পষ্ট বলতে পারছি না। তবে ভাব-চক্করে মনে হচ্ছে, দুদক নিয়ে সরকারের মাথাব্যথা নেই। এটিকে তারা কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছে না। ফলে এ সরকারের নির্বাচনী যে প্রতিশ্রুতি, সেটি পূরণে কতখানি আন্তরিক সেই প্রশ্ন জনমনে œ সৃষ্টি হয়েছে। পূর্বতন ঘটনার দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি বলেন, ২০০৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি যখন দুদক আইন হয়েছিলো, সেটি বলবৎ করেছিল ওই বছর ৯ মে। দেড় মাস লাগিয়েছিল বলবৎ করতে। কমিশন গঠন করা হয় ওই বছর ২১ নভেম্বর। সাত-আট মাস লাগিয়েছিল কমিশন নিয়োগ দিতে। এমন কমিশন নিয়োগ দেয়া হলো যে তিন কমিশন তিন দিকে ছিলেন। তারা কোনো কাজই করেনি। এখন সেটিরই ধারাবাহিকতা কি-না সেটি আবার জিজ্ঞাস্য হয়ে যায়। কারণ তৎকালীন বিএনপি সরকার দুর্নীতি দমন কমিশন আইন করেছিল বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীর চাপে। ফলে কমিশন গঠনে গড়িমশি করে। ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’ থেকে যেসব কর্মকর্তাদের কমিশনে নেয়ার যে প্রক্রিয়া আইনে বলা ছিল (যোগ্য-অযোগ্য বাছাই করে) সেটি অনুসরণ করেনি। এসব বিষয়টিও তখন জটিলতা সৃষ্টি করে। এই জটিলতা নিযে পরবর্তী দু’টি কমিশন কার্যক্রম চালায়। এ সরকার আগের সেই ধারাবাহিকতা বহন করছে কি-না, সেই প্রশ্ন চলে আসে।