সংস্কারের পক্ষে ভোট চেয়ে এখন তা বাস্তবায়ন না করাই মূলত অন্তহীন প্রতারণা। যেসব নাগরিক গণভোটে সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছে, তার প্রতিফলন না দেখলে তারা চুপ করে বসে থাকবে না। তারা রাজপথে নেমে আসবে।
রোববার রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের মুক্তিযোদ্ধা হলে জাতীয় নাগরিক পার্টির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত ‘জ্বালানি, অর্থনীতি, মানবাধিকার, সংস্কার ও গণভোট’ শীর্ষক জাতীয় কনভেনশনের সর্বশেষ সেশনের বক্তারা এসব কথা বলেছেন।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণে জুলাই সনদ, সংস্কার ও গণভোট বিষয়ে সেশনটি আয়োজিত হয় । এতে প্যানালিস্ট হিসেবে আলোচনা করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, নাগরক ঐক্যের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাজমুস সাকিব আনোয়ার, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু প্রমুখ। সেশনটি সঞ্চালনা করবেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব।
এ সেশনে সভাপতিত্ব করবেন এনসিপির আহ্বায়ক, বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম। সেশনটি সঞ্চালনা করবেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার বলেন, ১৭ অক্টোবর আমরা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছি। নভেম্বরের ১৩ তারিখে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার আদেশ হয়েছে। নভেম্বরের ২৫ তারিখে গণভোটের অর্ডিন্যান্স জারি করা হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি একইসাথে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনের আগে আপনারা চার মাস সময় পেয়েছেন, কিন্তু একবারের জন্যও বলেননি যে গ্যাজেট, রাষ্ট্রপতির আদেশ সংবিধান বহির্ভূত, গণভোট মানেন না।
তিনি বলেন, জনগণ বুঝে ফেলেছে, সরকার দলের ঘাড়ে ভূত চেপেছে। তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। সংসদে তারা ঐক্যমত্য কমিশনের বই হাতে নিয়ে বলে, আমরা এই জুলাই সনদের সব অক্ষরে অক্ষরে মানবো। কিন্তু কোনোদিন তারা বলে না, গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে আমরা তা অক্ষরে অক্ষরে মানবো। গণভোট আর জুলাই সনদকে পার্থক্য করে তারা জনগণের মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। রাষ্ট্রপতির আদেশকে নিয়ে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এটা জনগণের সাথে অন্তহীন প্রতারণা। এটি যদি অন্তহীন প্রতারণা হয়, তাহলে চারমাস ধরে কেন বলেননি!
তারা জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে মানবেন, এর অর্থ হল, গুরুত্বপূর্ণ ৪৮ টি সাংবিধানিক সংস্কারের মধ্যে ১০ টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তাদের নোট অব ডিসেন্ট আছে। এরমধ্যে প্রধানমন্ত্রী একইসাথে দলের প্রধান না থাকা, পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি, দ্বিপাক্ষিক আন্তর্জাতিক চুক্তি উচ্চকক্ষে অনুমোদনসহ একাধিক বিষয় বলা আছে। এসব বিষয়ে ওনারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন।-যোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, গণভোটে যে ৪টি প্রশ্নে নির্বাচন হয়েছে, সেখানে কোনো নোট অব ডিসেন্ট ছিল না। যার অর্থ হল ৫ কোটি মানুষ ভোট দিয়ে বিএনপির নোট অফ ডিসেন্টকে খারিজ করে সংস্কারের ৪৮ টি পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। ফলে আপনি গণভোটের পক্ষে ভোট চেয়ে এখন তার বিরুদ্ধে কাজ করাই তো অন্তহীন প্রতারণা।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তির জায়গা থেকে যখন বলা হয়, প্রতিনিধিত্বশীল চেয়ার থেকে যখন বলা হয়, নির্বাচন আদায়ের জন্য আমরা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিলাম, আসলে সংস্কারের কোনো ইচ্ছা ছিল না এবং অন্যরা যখন সেখানে সায় দেয়—আমার কাছে তো মনে হয় যেন আকাশ ভেঙে পড়া। এটা তো আত্মস্বীকৃত মুনাফেকি।
তিনি বলেন, আমরা সরকারের কাছ থেক ৪ টি বিষয় চাই। প্রথমত -কোনো, যদি, কিন্তু ছাড়া, সংবিধানের সংস্কার চাই। তা না হলে আমরা পুনরায় সংবিধান নতুন করে লেখার যে দাবি, সেখানে ফিরে যাব। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং ভারসাম্য চাই। যেটির জন্য প্রায় ৫টা গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করার প্রস্তাবনা করা হয়েছে জুলাই সনদে। তৃতীয়ত, দলীয়করণ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন চাই। চতুর্থত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ একটি নির্বাচন চাই।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, হিটলারকে নিয়ে গবেষণা হয়েছিল যে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একজন পপুলার শাসক কিভাবে স্বৈরাচারী হয়ে যান। তখন দেখা যায়, হিটলারের সময়ে আর্থিক সংকটের কারণে রাষ্ট্র যখন ফেইল করে তখন সে অজনপ্রিয় হয়ে পড়ে। ফলে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য তাকে স্বৈরতান্ত্রিক হতে হয়। আজকে দুই মাসে আমরা যাদেরকে দেখতে পাচ্ছি, তারা তাদের অতীত ভুলে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে চোখ বন্ধ করেই আমি বলতে পারি, অবধারিতভাবে আগামী তিন বছরের মধ্যে বিএনপি স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠবে। কেন বলছি? বিএনপির যে অর্থনৈতিক পলিসিতে হাটছে। আমরা প্রায় ৩০ লক্ষ কোটি টাকার একটা ঋণভারে জর্জরিত হতে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ হয়েছে। দ্রব্যমূল্য বাড়ার একটা আশঙ্কা এখন তৈরি হয়েছে, বিদ্যুতের সংকট থাকবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অব্যবস্থাপনার কারণে আরও সন্ত্রাসের আশঙ্কা আমরা দেখতে পাচ্ছি। দলীয়করণের যেই পথে বিএনপি হাঁটা শুরু করেছে, আরও অন্তত আট ১০ মাস পেরুলে মানুষ হিসাব করবে যে ড. ইউনুসের শাসন এবং বিএনপির শাসনের পার্থক কী? তারপর হিসেব করবে শেখ হাসিনার শাসনামলের সাথে বিএনপির শাসনের পার্থক্য কী?
এতে সভাপতির বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রথম অধিবেশনে বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাবগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সে বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সরকার তা না করে নিজের মতো সংসদ পরিচালনা করেছে। এভাবে করলে জনগণকে সাথে নিয়ে আন্দোলন আমাদের একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়াবে।
তিনি বলেন, আমাদের ৫৪ বছর ধরে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের পর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা ছিল। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান তার কবর রচনা করে বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে। বিএনপি বহুদলীয় গণতন্তের কথা বলে। কিন্তু নির্বাচনের পরে দেখলাম তারা জনগণের সাথে প্রতারণা করছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা বলেছি, উচ্চকক্ষ লাগবে। কারণ বাংলাদেশে যেকোনো সরকার ক্ষমতায় এলে সংবিধান নিজের মতো সংশোধন করে নেয়। ফলে একটা ভারসাম্য দরকার। সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যেন একটি গণভোটের ব্যবস্থা থাকে। আমরা বলেছি, যেন সংবিধানিক প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ না হয়, নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর একক হাতে না থাকে। সর্বদলের সম্মতিতে গ্রহণযোগ্যভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেন প্রতিষ্ঠা হয়, বিচার বিভাগের পৃথকীকরকণ হয়। এগুলো দিয়েই যে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে, তা নয়। তবে আমরা ধাপে ধাপে এগোতে চাই।
নাহিদ বলেন, আমরা সাংবিধানিক সংস্কারের কথা বলেছি। সংশোধনের মাধ্যমে এটা টেকসই হবে না। বিএনপি সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তন করতে চাইলে সেটি টেকসই হবে না, যেকোনো সময় এটা বাতিল হতে পারে। আমি সংসদে বলেছি, জিয়াউর রহমান এই ঐতিহাসিক ভুল করেছিল। ফলে বাহাত্তরের সংবিধানের ধারাবাহিকতার নামে আওয়ামীলীগের আদর্শ এবং রাজনীতি ফিরিয়ে আনার দরজা খোলা রাখা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, নোট অব ডিসেন্টে অনেক কথা এসেছে। এটি আপনারা যেকোনো সিদ্ধান্তে দেখতে পাবেন। সংসদে অনেক সিদ্ধান্তে আমাদের বিরোধিতা আছে। অনেকের ভিন্নমত আছে। তার এই ভিন্নমত লেখা হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত কিন্তু পাশ হয়ে যায়। যেহেতু এটি একটি ঐতিহাসিক দলিল হয়ে থাকবে। জুলাই সনদ যেদিন স্বাক্ষর হয়, সেদিন আলাদা করে নোট যোগ করা হয়েছে সবগুলোতে। যে দল ক্ষমতায় আসবে, তাড়া ইশতেহার অনুযায়ী সনদ বাস্তবায়ন করবে। তাহলে তো আর সনদের কার্যকারিতা থাকে না। সে জায়গা থেকে গণভোট এসেছে।