রাজনীতি নিষিদ্ধ বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সমালোচনা এবং এ ঘটনার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গতকাল শনিবার (২ মে) রাতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি মো. রাকিবুল হাসান রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে ২৫ সদস্যবিশিষ্ট বুটেক্স ছাত্রদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে সভাপতি হিসেবে ৪৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন কাজল এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ৪৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মিয়া মোহাম্মদ রুবেল মনোনীত হয়। একই সঙ্গে এই কমিটিকে আগামী ত্রিশ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের এক জরুরি সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সকল ধরনের রাজনৈতিক সংগঠন, ছায়া সংগঠন এবং এর কার্যক্রমের সাথে সম্পর্ক ও সম্পৃক্ততা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এমতাবস্থায় ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় কমিটি ঘোষণা হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। গতকাল রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নানা সমালোচনা করে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি প্রবেশের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে রবিবার (৩ মে) বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচির ডাক দেয়।
আজ রবিবার কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীরা দুপুর ১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের সামনে জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকে। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের সামনে থেকে আরম্ভ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কক্ষের সামনে জড়ো হয়। এসময়ে স্লোগানে শিক্ষার্থীরা বলেন, রাজনীতি নিষিদ্ধ বুটেক্সে ছাত্রদলের কমিটি, প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভছাত্রদল না চামচাদল, ভাড়ায় খাটা নেতার দল", "ছাত্ররাজনীতির ঠিকানা, এই বুটেক্সে হবে না", "ছাত্র রাজনীতির কালো হাত, ভেঙ্গে দাও, গুড়িয়ে দাও" প্রভৃতি।
সেসময় উপস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. রাশেদা বেগম দিনা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “তোমরা যে বিষয়গুলো নিয়ে এসেছ— রাজনীতি ও নতুন কমিটির বিষয়, সেগুলো সম্পর্কে প্রশাসন অবগত আছে। তবে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে আমাদের একটি নির্দিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, তাই হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়। তোমাদের দাবিগুলো আমরা দেখছি এবং বিষয়টি নিয়ে কথা বলব। সার্টিফিকেট বাতিলের মতো বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তদন্ত ও দাপ্তরিক অভিযোগ প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী যা করা সম্ভব, আমরা সেটিই খতিয়ে দেখব।”
এবিষয়ে প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, ”ক্যাম্পাসে মূল বিষয় হচ্ছে আসলে কোনো রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিটি হচ্ছে কিনা। বাইরে কোনো সংগঠন কমিটি দিতেই পারে, সেটি নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের এখতিয়ারে পড়ে না, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে যেন কোনো ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম না চলে, সেটি নিশ্চিত করাই আমাদের দায়িত্ব। যারা ইতোমধ্যে গ্র্যাজুয়েট তারা যদি এসব পদে থাকে, তাদের বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনায় আসবে। এদিকে হলগুলোতে মিষ্টি বিতরণ বা উল্লাসের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যেহেতু ক্যাম্পাসে রাজনীতি নিষিদ্ধ, তাই এ ধরনের কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।”
ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সারোয়ার হোসেন সামি বলেন, প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেসকল শিক্ষক আজকে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি ফিরিয়ে আনার জন্যে পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন তাদেরকে জানাই ধিক্কার। আমি চাই, এই শিক্ষকরাই ছাত্ররাজনীতির নামে যে নোংরামি হয় তার প্রথম ভুক্তভোগী হোক। বিগত দুবছর ধরে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ছাত্ররাজনীতিমুক্ত থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে এসেছিলো, যারা দেখে এসেছিলো ছাত্রলীগের অপকর্মের কর্মফল। তখনও এই শিক্ষকরাই নীরব ভূমিকা পালন করে এসেছেন, আজও নীরব রয়েছেন।
ঘোষিত বুটেক্স ছাত্রদলের সভাপতি শাহাদাত হোসেন কাজল এই আন্দোলনের প্রতিক্রয়ায় বলেন, ” আমি এই আন্দোলনের কোন যৌক্তিকতা খুজে পাই না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে যারা রাজনীতি চায়নি, তারাই পরে গুপ্ত রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল। অধিকাংশ ছাত্ররা যেভাবে বলবে আমরা তাদের পক্ষ থেকে কাজ করব। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হয়ে হলের আবাসন সমস্যা এবং টিউশন ফি কমানোর মতো বিষয়গুলো নিয়ে প্রশাসনের সাথে কথা বলবো।"
বুটেক্স ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মিয়া মোহাম্মদ রুবেল বলেন, ”বুটেক্স ছাত্রদল শিক্ষার্থীদের সার্বিক কল্যাণের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে সকল ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর কার্যকরি সহাবস্থান নিশ্চিত করবে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে এবং যত দ্রুত সম্ভব ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনবে। আজকের কয়েকজন শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ সেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার'ই অংশ।”