Image description

ঢাকায় তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যাকাণ্ডের পর আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে অপরাধ জগতের পুরোনো-নতুন শক্তির দ্বন্দ্ব। বিবিসি বাংলার এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরোনো সন্ত্রাসীদের প্রভাব কমলেও তাদের জায়গা দখলে এখন নতুনদের তৎপরতা বাড়ছে।

 

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে অপরাধীদের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই এবং প্রভাব বিস্তারের খবর সামনে আসছে। তবে ঢাকার পুলিশ কমিশনার অবশ্য বলছেন, আগের মতো সংগঠিত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ এখন তেমন নেই। যারা আছে, তারা মূলত পুরোনোদের সহযোগী বা সেই পরিচয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

 

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, যারা নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের আগেভাগেই নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই নতুন মুখগুলো কারা এবং কীভাবে তারা অপরাধ জগতে প্রবেশ করছে?

 

পুলিশ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, একসময় এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বড় সন্ত্রাসীদের উত্থান ঘটত। কিন্তু এখন দৃশ্যপট বদলেছে। নতুন প্রজন্মের অপরাধীরা উঠে আসছে মূলত কিশোর গ্যাং থেকে। তারা ছিনতাই, চাঁদাবাজি বা ছোটখাটো অপরাধ দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে বড় অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়ছে।

 

বিশ্লেষকদের অভিযোগ, এই উঠতি অপরাধীদের পেছনে অনেক সময় ‘গডফাদার’ বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সমর্থন থাকে। রাজনৈতিক ছত্রছায়াও তাদের শক্তি জোগায়, যা তাদের দ্রুত ‘বড়’ সন্ত্রাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে সহায়তা করে।

 

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকার অনেকেই বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের কয়েকজন জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এদের মুক্তির পর অপরাধ জগতে আবারও অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে।

 

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এ এইচ এম শাহাদত হোসেন বলছেন, সমাজে যেন সন্ত্রাসী হিসেবে কারও আবির্ভাব না ঘটে সেজন্য পুলিশের দিক থেকে প্রতিরোধমূলক অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়, কিন্তু এগুলো কতটা সফল হচ্ছে সেটি নির্ধারণের কোনো মাপকাঠি নেই।

 

ঢাকার অপরাধবিষয়ক সাংবাদিক ও আজকের পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কামরুল হাসান বিবিসি বাংলাকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অন্তত ছয়জন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীর মুক্তির খবর পাওয়া গেছে, যার পরপরই অপরাধ জগতে নতুন করে সক্রিয়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

 

তিনি আরও বলেন, অনেকে জেলে বসেই তাদের নেটওয়ার্ক চালু রেখেছিল, আবার কেউ বিদেশে থেকেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করেছে, এমন অভিযোগও আছে।

 

এর আগে, ২০২৪ সালের ৮ আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেওয়ার পর ১১ আগস্ট কিলার আব্বাস ও ১৩ আগস্ট সুইডেন আসলাম কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। তারা দুজনই সরকার কর্তৃক পুরস্কার ঘোষিত ২৩ সন্ত্রাসীর তালিকায় ছিলেন।

 

এরপর ১৫ আগস্ট কেরানীগঞ্জের কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় থাকা সানজিদুল হাসান ইমন। তিনি ও কিলার আব্বাস মুক্তি পেয়েই দেশ ছেড়েছেন বলে জানা গেছে।

 

এর কয়েক দিন পরেই আলোচনায় আসেন ওই তালিকার অন্যতম নাম সুব্রত বাইন। খবর ছড়ায় যে তিনিও জামিন পেয়ে জেল থেকে বেরিয়ে গেছেন। এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনার মধ্যেই পরে ২০২৫ সালের ২৭ মে সেনাবাহিনী সুব্রত বাইন ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোল্লা মাসুদকে কুষ্টিয়া থেকে আটক করে।

 

এ ছাড়া শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় থাকা ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল এবং খোরশেদ আলম ওরফে রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসুও মুক্তি পেয়েছেন বলে জানা গেলেও এখন তাদের অবস্থান কোথায় সে সম্পর্কে কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি।

 

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৯৯৮ সালে সুইডেন আসলাম, জোসেফ, বিকাশ ও প্রকাশকে ধরতে ৫০ হাজার টাকা করে প্রথম পুরস্কার ঘোষণা করেছিল সরকার। এরপরের কয়েক বছরে একের পর এক ঘটনায় আলোচিত হয়ে ওঠা মোট ২৩ জনকে শীর্ষ সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করে ধরার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার।

 

এর মধ্যেই বিভিন্ন সময়ে সুইডেন আসলাম, ইমন, টিটন, সুব্রত বাইন, জোসেফ, কিলার আব্বাস, বিকাশ কুমার বিশ্বাসসহ অনেককেই আটক করতে সক্ষম হয় পুলিশ।

 

কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই ২০০৯ সালেই পুলিশের তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ বিকাশ কুমার বিশ্বাস জামিনে মুক্তি পান। তার ভাই প্রকাশ কুমার বিশ্বাসও ওই তালিকার একজন। তবে তার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়নি।

 

তবে আওয়ামী লীগ আমলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় জোসেফ আহমেদের মুক্তি পাওয়ার ঘটনা। মুক্তির আগে তিনি প্রায় ২০ মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। যাবজ্জীবন সাজার আসামি আলোচিত এই জোসেফ আহমেদের বড় ভাই হারিস আহমেদের নামও ছিল পুলিশের শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায়। তারা দুজন সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সমাজ অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক মনে করেন, ৯০-এর দশকের পর থেকেই সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং রাজনৈতিক বলয়ের অংশ হয়ে যায়। দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা—সব মিলিয়ে এটি এক ধরনের ‘অপরাধ অর্থনীতি’ তৈরি করেছে।

 

তার মতে, এই কাঠামো ভাঙা না গেলে নতুন সন্ত্রাসীর জন্ম ঠেকানো কঠিন।