বরেন্দ্র এলাকাখ্যাত বৃহত্তর রাজশাহীর তিন জেলায় খরাপ্রবণতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় পুকুর, খাল পুনঃখনন ও খরা সহিষ্ণু ফসল উৎপাদনে কৃষকের সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ চলছে। এই কাজের তত্ত্বাবধানে আছেন বেসরকারি সংস্থা পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন-পিকেএসফ। রাজশাহীর তানোরে এটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে এসকেএস ফাউন্ডেশন। উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের বিনোদপুর এলাকায় সরকারি পাঁচটি খাস পুকুর সংস্কার নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। ঠিকাদারকে তানোরের ইউএনও নাঈমা খানের একটি অনৈতিক প্রস্তাব এবং এ ঘটনায় উদ্ভূত পরিস্থিতি এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
উপজেলা পরিষদের ক্যাম্পাসে একটি পুকুর ভরাটের প্রস্তাবে ঠিকাদার রাজি না হওয়ায় ইউএনও বুধবার ঘটনাস্থলে তার কর্মচারীদের নিয়ে উপস্থিত হয়ে পুকুর খননের কাজে ব্যবহৃত এক্সকেভেটরের ৪টি ব্যাটারি এবং টুল বক্স খুলে তার কার্যালয়ে নিয়ে যান। এক্সকেভেটর চালকের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পিয়ন রাজন হোসেনের বিরুদ্ধে। অভিযানের পর পুকুর খনন কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
জানা গেছে, রাজশাহীসহ তিন জেলায় সরকারি পুকুর এবং খাল তথা জলাশয় সংস্কারের কাজ করছে ১৮টি এনজিও। ৩০ মার্চ তানোরে পুকুর খননের কার্যাদেশ পায় রাজশাহী মহানগরীর সিপাইপাড়ার বাসিন্দা রিপন রয় কুশের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স কুশ এন্টারপ্রাইজ। ৫২ লাখ টাকার কাজটি শুরু হয় ১ এপ্রিল। জানা যায় ইউএনও নাঈমা খান বাস্তবায়নকারী সংস্থা এসকেএস ফাউন্ডেশনের এ অঞ্চলের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর (পিসি) আরাফাত রহমানকে নিজ কার্যালয়ে ডাকেন। ইউএনও এ সময় আরাফাতকে উপজেলা পরিষদ চত্বরের পুকুরটি ভরাটের প্রস্তাব করেন। আরাফাত বিষয়টি ঠিকাদার রিপন রয় কুশকে অবহিত করেন এবং রিপন এতে হতবাক হয়ে যান। রিপনের সাড়া না পাওয়ায় ইউএনও তার অফিস সহকারী ইমরান আলীকে এনজিও কর্মকর্তা এবং ঠিকাদারের সঙ্গে যোগাযোগের নির্দেশ দেন। ইমরান পহেলা বৈশাখের আগে ওই দুজনকে ইউএনও কার্যালয়ে ডেকে ইউএনওর নির্দেশনা সম্পর্কে অবহিত করেন এবং দ্রুত পুকুর ভরাটের তাগাদা দেন। রিপন পুকুর ভরাটের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, পুকুর ভরাট করতে অন্তত পাঁচ লাখ টাকা লাগবে, ফলে প্রস্তাব বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। পরে ইউএনওর পিয়ন রাজন ঠিকাদারের কাছে সমস্যা সমাধানের জন্য এক লাখ টাকা ‘উৎকোচ’ দাবি করেন। এটিও প্রত্যাখ্যান করেন ঠিকাদার। পরে বুধবার অভিযান চালিয়ে ইউএনও ৪টি ব্যাটারি এবং টুল বক্স খুলে নেওয়ার নির্দেশ দেন। পিয়ন রাজন এ সময় একটি ব্যাটারি হ্যামার (বড় হাতুড়ি) দিয়ে আঘাত করে ভেঙে ফেলেন। রাজন এ সময় চালকের মোবাইল ফোনটিও কেড়ে নেন।
ঠিকাদারের ম্যানেজার বাপ্পি বলেন, ‘অভিযান চলাকালে পিয়ন রাজন ঘটনাস্থলে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন। তিনি আমাদের ভয় দেখান এবং গালাগাল করেন। তিনি এক্সকেভেটরচালকের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেন। আমরা কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই ইউএনও স্বল্প সময়ের মধ্যেই অভিযান শেষ করেন।’
ইউএনওর কথা বলে লাখ টাকা উৎকোচ দাবি এবং চালকের মোবাইল ফোন নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে পিয়ন রাজন হোসেন বলেন, ‘আমি এক্সকেভেটরের ব্যাটারি ভাঙিনি। মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগও ঠিক নয়। আর এক লাখ টাকা দাবির বিষয়টিও সত্য নয়। কোনো কিছু ঘটে থাকলে ইউএনও স্যার উত্তর দেবেন।’ এ ব্যাপারে অফিস সহকারী ইমরান আলী বলেন, ‘ইউএনও স্যার পুকুর ভরাটের জন্য এনজিও কর্মকর্তা এবং ঠিকাদারকে বলতে বলেছিলেন। তাই তাদের পহেলা বৈশাখের দু-একদিন আগে অফিসে ডাকা হয়। আমি ইউএনও স্যারের নির্দেশনা তাদের অবহিত করেছি। এর বেশি কিছু বলব না।’ উপজেলা কম্পাউন্ডের ভেতরে পুকুর ভরাটের প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়টি সরকারি বিধি অনুযায়ী দেওয়া যায় কিনা-এ প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি ইউএনও। এটি সরকারি কাজ নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ইউএনও বলেন, ‘এনজিও কাজ করছে, তাদের যদি বিধানে থাকে-তাহলে তারা করতে পারবে। তাদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তারা করতে পারলে করবেন। আর এটি প্রকৃতপক্ষে কোনো পুকুর না, ছোট একটি ডোবা।’
ইউএনও বলেন, ‘ঠিকাদার পুকুর সংস্কারের মাটি বাইরে বিক্রি করছিলেন। এ কারণে অভিযান চালানো হয়েছে। আর ব্যাটারি ভেঙে ফেলার অভিযোগ সঠিক নয়। সেগুলো নিয়ে আসা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আর এ ধরনের কাজ করবে না অঙ্গীকার করে মুচলেকা দিলে সেগুলো ফেরত দেওয়া হবে।’ কার্যালয়ের অফিসের পিয়নের উৎকোচ দাবি এবং মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ইউএনও বলেন, ‘যদি পিয়ন রাজন উৎকোচ দাবি করেন এবং সেটি প্রমাণিত হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আমি বলতে পারব না। জানা নেই।’ ঠিকাদার রিপন রয় কুশ বলেন, ‘যে পুকুর ভরাটের কথা বলা হচ্ছে, সেটি অন্তত ১০-১২ কাঠার। পুকুরটি ভরাট করতে পরিবহণ ব্যয়সহ পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা ব্যয় হবে।’ ইউএনওর এ অন্যায্য আবদার আমার পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়। রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘যদি কোনো ধরনের ব্যত্যয় ঘটে থাকে, তাহলে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’