Image description
বৃষ্টির কারণে চাহিদা কিছুটা কমেছে

স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও এখন বেশি অকটেন, পেট্রোল এবং ডিজেল বিক্রি করা হচ্ছে দেশের সব তেলের ডিপো থেকে। এমনকি পেট্রোল এবং অকটেন গত বছরের (এপ্রিল, ২০২৫) এই সময়ের চেয়ে কোনো কোনো দিন ২০ থেকে ৩০ শতাংশের চেয়ে বেশি বিক্রি করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসি। এ কারণে পাম্পগুলোর সামনে এখন গাড়ির দীর্ঘ লাইন নেই। নেই মানুষের ভোগান্তিও। তবে শিল্প-কলকারখানা এবং বাস, ট্রাকে এখনো চাহিদামতো ডিজেল মিলছে না।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ডিজেল বিক্রির ক্ষেত্রে এক শ্রেণির পাম্প মালিক এবং কিছু ডিলার কারসাজি করে বেশি টাকা আদায়ের চেষ্টা করছেন। এদিকে, বিপিসি এবং জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আগামী এক-দুই মাসে জ্বালানি তেল আমদানি নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো-বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবার বাড়ছে। এভাবে বাড়লে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে বড় মাশুল দিতে হবে। জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব এবং মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী যুগান্তরকে বলেছেন, জ্বালানি তেলের সংগ্রহ নিয়ে আপাতত তেমন কোনো সমস্যা নেই। তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কয়েক দিন পর সারা দেশে জ্বালানি তেলের চরম সংকট দেখা দেয়। তবে ইরানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বিরতির পর জ্বালানি তেল সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসছে। গত সপ্তাহে চট্টগ্রামে বন্দরে একসঙ্গে তেলের আটটি জাহাজ ভিড়ে; যার পরিমাণ আড়াই লাখ টনের মতো। এর মধ্যে গত ১৯ এপ্রিল সরকার জ্বালানি তেলের ওপর রেশনিং তুলে দেয়। এক আদেশ দিয়ে জ্বালানি বিভাগ থেকে বলা হয়, ২০ এপ্রিল থেকে দেশের সব ডিপো থেকে আগের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি ডিজেল এবং পেট্রোল দেওয়া হবে। আর অকটেন সরবরাহ বাড়ানো হবে ২০ শতাংশ। সেই হিসাবে প্রতিদিন ডিপোগুলো থেকে ডিজেল ১৩ হাজার ৪৮ টন, অকটেন ১ হাজার ৪২২ টন এবং পেট্রোল ১ হাজার ৫১১ টন বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গত এক সপ্তাহের সরকারি হিসাবে দেখা গেছে, দেশের ডিপোগুলো থেকে এর চেয়েও বেশি তেল বিক্রি করা হচ্ছে। গত ২৫ এপ্রিল ডিজেল বিক্রি করা হয়েছে ১৫ হাজার ২৭৪ টন, অকটেন ১ হাজার ৭৩৩ টন এবং পেট্রোল ১ হাজার ৮০৭ টন। ২৬ এপ্রিল ডিজেল ১৪ হাজার ১২৬ টন, অকটেন ১ হাজার ৬৬৭ টন এবং পেট্রোল ১ হাজার ৭৬৬ টন। ২৭ এপ্রিল ডিজেল ১৪ হাজার ৪৮৪ টন, অকটেন ১ হাজার ৬১৬ এবং পেট্রোল ১ হাজার ৭৮৩ টন। ২৮ এপ্রিল ডিজেল ১৪ হাজার ৩৮৩ টন, অকটেন ১ হাজার ৫৫০ টন এবং পেট্রোল ১ হাজার ৮৪৬ টন বিক্রি করা হয়েছে। অথচ গত বছরের এপ্রিলে গড়ে তেল বিক্রি করা হয়েছে ডিজেল ১১ হাজার ৮৬২ টন, অকটেন ১ হাজার ১৮৫ টন এবং পেট্রোল ১ হাজার ৩৭৪ টন। সংশ্লিষ্টরা জানান, এ বছর গত বছরের তুলনায় এত বেশি তেল ব্যবহারের হিসাবটি রহস্যজনক। অনেকের মতে, এর অর্থ হতে পারে তেল নিয়ে কারসাজি হচ্ছে এবং কেউ কেউ এটি নিয়ে এখনো মজুতদারি করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ডিজেল নিয়ে ব্যবসায়ী এবং বাস চালকদের উদ্বেগ কাটছে না।

গাজীপুর শ্রীপুরের একটি কারখানার মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ফ্যাক্টরির মাল পরিবহণের কাজে ব্যবহৃত লরির জন্য প্রয়োজনীয় তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে করে ফ্যাক্টরির দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে।

ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ যুগান্তরকে জানান, ডিজেল সংকটে লাইটার জাহাজে পণ্য পরিবহণ এখনো ব্যাহত হচ্ছে। চাহিদার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে। এর রহস্য কোথায় বোঝা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, পণ্য বোঝাই করে নদীতে অনেক জাহাজ বসে আছে। অথচ তেল নেই।

চট্টগ্রামে এক লাইটারেজ জাহাজের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দেশে এখন ব্যবসা-বাণিজ্য কম। তাই নদী দিয়ে পণ্য পরিবহণ কমেছে। এরমধ্যে ডিজেল সংকটের কারণে নিয়মিত পণ্য পরিবহণ আরও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

রাজধানীতে চলাচলরত বাস সার্ভিস ‘এলিভেটর এক্সপ্রেসের’ সহকারী হাবিব গত মঙ্গলবার এই প্রতিবেদককে বলেন, পাম্পে ১০ থেকে ২০ লিটারের বেশি ডিজেল পাওয়া যায় না। তবে ৪০০-৫০০ টাকা অতিরিক্ত দিলে ৫০-৬০ লিটার ডিজেল মেলে ওই পাম্পে। তিনি বলেন, এমনিতে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বেড়েছে। সেই তুলনায় বাস ভাড়া বাড়েনি। এখন সরকারি দামে তেল কিনতেও অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে। এভাবে চললে তো বাস চালানো যাবে না।

তবে ডিজেল ব্যবহারকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং পরিবহণ মালিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকায় ডিজেলের তেমন কোনো সংকট না থাকলেও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন এলাকায় এখনো ডিজেল সংকট আছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ফাহাদ পেট্রোল পাম্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারহান নূর যুগান্তরকে বলেছেন, গত কয়েকদিন ধরে চাহিদামতো ডিজেল পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে বৃষ্টির কারণে সেচে ডিজেলের চাহিদা কিছুটা কমেছে। এছাড়া বৃষ্টিতে পরিবহণেও ডিজেলের চাহিদা কমেছে। তাই আপাতত ডিজেলের চাহিদা আগের মতো থাকবে না বলে মনে করি।

তেল বিতরণ কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা এবং যমুনার হিসাব অনুযায়ী ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ডিজেলের মজুত ১ লাখ ৭০ হাজার টন, অকটেন ৪৪ হাজার ৪৮৩ টন, পেট্রোল ১৯ হাজার ৩ টন, ফার্নেস অয়েল ৩৭ হাজার টন, জেট ফুয়েল ২১ হাজার ২০০ টন এবং কেরোসিন ৫ হাজার ৭৩৫ টন মজুত আছে।