বাংলাদেশের পারমাণবিক যুগে প্রবেশের জন্য আজ ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ দিন। পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত দেশের একমাত্র রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আনুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি তথা ফুয়েল লোডিং করা হবে। মূলত এর মাধ্যমে এখন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অবকাঠামোগত নির্মাণকাজ থেকে সরে বিদ্যুৎ উৎপাদন বা অপারেশনাল ফোকাসে চলে যাচ্ছে। পরমাণু বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করার ধাপটিই হচ্ছে ফুয়েল লোডিং। রূপপুর প্রকল্প এলাকায় আজ দুপুরে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমের উদ্ধোধন করা হবে। এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এতে উপস্থিত থাকবেন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি। অনুষ্ঠানে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের একটি ভিডিওবার্তা দেওয়ার কথা আছে।
এর আগে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জ্বালানি ‘ইউরেনিয়াম’ আসে বাংলাদেশে। এতদিন সর্বোচ্চ সতর্কতায় প্রকল্প এলাকায় এ জ্বালানি সংরক্ষিত ছিল। আজ যা রিঅ্যাক্টর প্রেশার ভেসেল বা চুল্লিপাত্রে বসানো হবে। এরই মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য নিশ্চিত করা হয়েছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা। ইতোমধ্যে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ভিভিইআর-১২০০ শ্রেণির জেনারেশন ৩ প্লাস রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা হয়েছে রূপপুর প্রকল্পে। ফুয়েল লোডিং কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার নির্মাণপ্রতিষ্ঠান রোসাটম একযোগে কাজ করছে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছেন, রূপপুরের বিদ্যুৎ নেওয়ার জন্য জাতীয় গ্রিড পুরোপুরি প্রস্তুত। এজন্য যেসব সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কথা সেসব শেষ হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ফুয়েল লোডিং শেষে আগামী আগস্টে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দিতে পারব বলে আশা করছি। এটাকে ৫০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করতে চেষ্টা করব। ডিসেম্বরের শেষ থেকে ২০২৭ সালের জানুয়ারির শুরুর দিকে ১ হাজার মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডে দেব।’ তিনি আরও জানান, দ্বিতীয় ইউনিটের ফুয়েল লোডিং শুরু হবে ২০২৭ সালের জুনে। সে বছরের সেপ্টেম্বর নাগাদ দুই ইউনিট মিলিয়ে মোট ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে গ্রিডে।
রূপপুর প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান পরমাণু বিজ্ঞানী ড. মো. শৌকত আকবর বাংলাদেশ প্রতিদিনকে গতকাল বলেন, ‘ফুয়েল লোডিং হচ্ছে একটি ক্রিটিক্যাল মাইলস্টোন, যে জায়গা থেকে একটি পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ প্রকল্প পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পদার্পণ করে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশে পদার্পণ করবে। অর্থাৎ এর মাধ্যমে আমাদের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যাত্রা হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম গতকাল বলেন, ‘ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ শেষে রিঅ্যাক্টর রিয়েল লাইফে চালু করে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন বা ফুয়েল লোডিং করার দিনটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এর মধ্যে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। এ প্রক্রিয়ায় কোনো যন্ত্রপাতিতে সমস্যা থাকলে তা বের করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ফুয়েল লোডিংয়ের মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের রিঅ্যাক্টর চালু করা হবে। এরপর এর সিনক্রোনাইজেশন, গ্রিড অ্যাকটিভিটি এগুলো পরীক্ষা করতে হবে। রিঅ্যাক্টর চালু করা হলেও তা নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু হবে না। এটি মাঝেমধ্যে চালু হবে আবার বন্ধ করে পরীক্ষানিরীক্ষা করতে হবে। বাণিজ্যিকভাবে এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করার ধাপই হচ্ছে ফুয়েল লোডিং। বলা যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করার ধাপ হচ্ছে ফুয়েল লোডিং। এটি মাঝেমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এবং তা বন্ধ করা হবে।