ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে নরসিংদীতে জমি অধিগ্রহণে দুর্নীতি অনুসন্ধানে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসছে। রীতিমতো স্ট্যাম্পে চুক্তি করে শত শত কোটি টাকা ঘুস কমিশন নিতে ফাঁদ পাতা হয়। এমনকি ক্যাডার কর্মকর্তাদের এই চক্র ‘ঘুস আসক্তিতে’ এতটাই বেপরোয়া ও নিমজ্জিত হয়েছিল যে, তারা ঘুস কমিশনের চুক্তিপত্র জেলা প্রশাসনের নথিপত্রেও সংযুক্ত করেন। যা প্রশাসনের ইতিহাসে অবিশ্বাস্য ও বিরল ঘটনা।
অথচ দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, এ ধরনের দুঃসাহসিক ঘুস ফাঁদের সঙ্গে স্বয়ং জেলা প্রশাসকের (ডিসি) নেতৃত্বে জড়িত এডিসি, সড়ক ও জনপথের (সওজ) প্রকৌশলী, গণপূর্তের প্রকৌশলী, স্থানীয় সাংবাদিক, সার্ভেয়ার, কানুনগো ও চিহ্নিত দালালসহ অন্তত ২০-২৫ জনের একটি প্রভাবশালী চক্র। বাড়তি লেনদেনের ফর্মুলা জায়েজ করতে প্রতিটি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে নালাকে ভিটি ও ভিটিকে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়া হয়েছে। রাতারাতি গড়ে উঠেছে জোড়াতালি দেওয়া নিুমানের ঝুঁকিপূর্ণ বাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। প্রায় সাড়ে ১৬ একর জমি অধিগ্রহণ প্রকল্পে নজিরবিহীন কমিশন বাণিজ্য ধরা পড়েছে যুগান্তরের ছয় মাসের অনুসন্ধানে। অবস্থা এমন যে, মসজিদে দানকৃত জমিও ব্যক্তি নামে ক্ষতিপূরণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তারা।
এদিকে জমি অধিগ্রহণ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে নরসিংদীতে এখন সুনাম অর্জনকারী সবচেয়ে আলোচিত কর্মকর্তার নাম অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদা বেগম। কারণ যোগদানের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে তিনি ঘুস সিন্ডিকেটের ঘুম হারাম করে দিয়েছেন। তার শক্ত অবস্থানের কারণে চলমান এই প্রকল্পে তিন ধরনের মানুষের মুখোশ খুলে গেছে। যাদের কেউ কেউ নিজেদেরকে এখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে মনে করেন। বিপরীতে লাভবান হয়েছে সরকার। যদিও এর সঙ্গে জড়িত দুর্নীতিগ্রস্ত ক্যাডার কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টরা চেয়েছিলেন, কম দামের জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে বাণিজ্যিক হিসেবে দেখিয়ে বেশি লাভবান হতে।
তবে এডিসি মাহমুদা বেগমের কঠোর পদক্ষেপের কারণে এই ভয়াবহ দুর্নীতির অপচেষ্টা একরকম ভেস্তে গেছে। তারই একক প্রচেষ্টায় সরকারের প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতে চলেছে। কিন্তু বিধি বাম। তিনি থাকতে পারলেন না। প্রভাবশালী কর্মকর্তার নীতিবহির্ভূত তদবির না শোনায় ২৭ এপ্রিল তাকে সিনিয়র সহকারী প্রধান হিসাবে পরিকল্পনা কমিশনে বদলি করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এডিসি মাহমুদা বেগম সোমবার যুগান্তরকে বলেন, জমি অধিগ্রহণের ফিল্ডবহিতে সরকারি স্বার্থের পরিপন্থি অনেক বিষয় ছিল। যে কারণে অধিগ্রহণ তালিকায় নিয়মবহির্ভূতভাবে অনেক ভবন স্থান পেয়েছে। যেগুলো অধিগ্রহণের সিদ্ধান্তের পর বিভিন্ন সময়ে নির্মিত হয়েছে। নিয়ম হচ্ছে-সরকারের অধিগ্রহণ সিদ্ধান্তের পর জমির শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। ফসলি জমি ও শিল্পকারখানার ক্ষতি না করে অধিগ্রহণের নকশা প্রণয়ন করতে হবে। নরসিংদীর ক্ষেত্রে এটা ছিল উলটো। ক্ষতিপূরণের তালিকায় অস্বচ্ছতা ছিল নজিরবিহীন। তাই বাস্তব তথ্য-উপাত্ত ও জমির রেকর্ডপত্র বিশ্লেষণ এবং অধিগ্রহণ আইন ও নিয়মনীতির মাধ্যমে অবৈধ অধিগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে। সরকারের টাকা সাশ্রয় করতে গিয়ে তিনি ব্যক্তি আক্রোশের শিকার হয়েছেন বলেও জানান।
মাহমুদা বেগম বলেন, ‘একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির অবৈধ তদবির রক্ষা করতে না পারায় রীতিমতো ‘ঘোষণা’ দিয়ে তাকে বদলি করে দেওয়া হয়েছে। এরা এতটাই প্রভাবশালী যে, সরকারি স্বার্থ রক্ষার জন্য আমাকে সরে যেতে হলো।’
প্রসঙ্গত, ‘জমি অধিগ্রহণের ৮ কোটি টাকা পেতে ঘুস এক কোটি, ডিসি অফিসের ঘুসের ফাঁদে মারা যান সাহাবুদ্দিন’ শিরোনামে গত ১৯ অক্টোবর যুগান্তরে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ ঘটনার পর টনক নড়ে সংশ্লিষ্টদের। এরপর ভেস্তে যায় ঘুস সিন্ডিকেটের সব হিসাবনিকাশ।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ১২শ কোটি টাকা বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত আরও অন্তত তিন হাজার কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের প্রস্তাবিত তালিকার সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যায়নি। এ কারণে বিভিন্ন এলএ কেসে ক্ষতিপূরণের তালিকাভুক্ত নামের একটি বড় অংশ বাতিল করা হয়েছে। কারণ অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত জানতে পেয়ে তিনগুণ ক্ষতিপূরণের আশায় এরা রাস্তার পাশে বাণিজ্যিকভাবে স্থাপনা তৈরি করেন।
২০১৮ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট শাখায় দায়িত্বরত ডিসি-এডিসি ছাড়াও সওজ ও গণপূর্তের প্রতিনিধি, সার্ভেয়ার ও কানুনগো বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এসব স্থাপনাকে বাণিজ্যিক ক্ষতিপূরণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এই তালিকা নিয়ে জেলায় এখন অস্বস্তিকর অবস্থা বিরাজ করছে। কারণ ক্ষতিপূরণের এ তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হতে অঢেল টাকা ঘুস দিয়েছিলেন এসব জমির মালিক। কিন্তু যারা ঘুস নিয়ে নাম অন্তর্ভুক্ত করেন জেলায় সেই কর্মকর্তাদের একজনও নেই। আলোচ্য প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে বড় অঙ্কের টাকা লুটপাটের তথ্য দিয়ে সতর্ক করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক)। ২০২০ সালের ১৯ জানুয়ারি দুদকের তৎকালীন মহাপরিচালক জহির রায়হান ওই সময়ের জেলা প্রশাসককে সতর্ক করে চিঠি দিয়েছিলেন।
চুক্তিপত্রের সাতকাহন : স্থাবর সম্পত্তি হুকুমদখল সংক্রান্ত একটি আইনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে দালালরা জমি মালিকদের বিভ্রান্ত করেছে। আর অধিগ্রহণের টাকা তুলতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি রাখার নামে জেলা প্রশাসনের অধিগ্রহণ শাখার কর্মকর্তারা গড়ে তুলেছে দালাল সিন্ডিকেট। এ সুবাদে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে রীতিমতো অধিগ্রহণের কমিশন চুক্তির হিড়িক পড়ে। সরকারি অধিগ্রহণ মানেই তিনগুণ ক্ষতিপূরণ। এভাবে শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে জমির মূল্য বৃদ্ধি করতে স্থানীয় দালালদের প্রলোভনে পড়েন শত শত ব্যক্তি।
এ বিষয়ে তথ্য-তালাশ করতে গিয়ে জানা যায়, স্থাবর সম্পত্তি হুকুমদখল আইন ২০১৭ (২০১৭ সালের ২১ নম্বর আইন) এর ৮ ধারা (৩)(ক) উপধারা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে জমির মালিককে নির্দিষ্ট ফরমে (ফরম-গ) নোটিশ প্রদান করা হয়। যুগান্তরের তথ্যানুসন্ধানে ২০২৪ সালে ভূমি অধিগ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারজনের স্বাক্ষরিত একটি নোটিশের ফটোকপি পাওয়া যায়। ওই সময় জারি করা এক নোটিশের এক স্থানে বলা হয়, ‘যথাযথ কর্তৃপক্ষ ক্ষতিপূরণের টাকা গ্রহণের নিমিত্ত আপনি স্বয়ং বা যথাযথ ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধির মাধ্যমে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে নির্ধারিত অঙ্গীকারনামাসহ (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন) হাজির হবেন।’ নরসিংদী জেলা প্রশাসকের পক্ষে নোটিশে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা রেহানা মজুমদার মুক্তিসহ চারজন। অপর তিনজন হলেন সার্ভেয়ার আমির হোসেন, মুহা. আব্দুল আজিজ ও কানুনগো মো. আব্দুল জলিল। এ সময় নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ছিলেন ড. বদিউল আলম।
স্থানীয় সাধারণ মানুষ ভূমি অধিগ্রহণের ওই সময়কে লুটতরাজের স্বর্ণযুগ হিসাবে আখ্যায়িত করেন। ইতোমধ্যে ৯০০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণের চেক হস্তান্তর হয়েছে। এর মধ্যে খুব কম ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি নিজের হাতে জমি অধিগ্রহণের টাকা পেয়েছেন। টাকা দেওয়া হয়েছে দালালদের হাতে। রীতিমতো অধিগ্রহণ মূল্যের ৪০-৬০ শতাংশ টাকা ভাগাভাগি করে নিয়েছে সিন্ডিকেট। এ বিষয়ে একজন ভুক্তভোগী যুগান্তরকে বলেন, অধিগ্রহণের চেক তদন্ত করলেই কমিশন ভাগাভাগির প্রমাণ বেরিয়ে আসবে। এটি বের করা তো কঠিন কিছু নয়। আমরা এ ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছা দেখতে চাই।
তথ্যানুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্রে দেখা গেছে, পরেশ সূত্রধর ও সরোজ কুমার সাহাও চুক্তিপত্র করে মরজাল মৌজায় বিশাল আকৃতির দালানকোঠা বানিয়েছেন। নরসিংদীতে এই দুজন বড় ব্যবসায়ী হিসাবে পরিচিত। জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা তাদের বেশ সমাদর করেন। বাস্তবে তারা জমি অধিগ্রহণ ব্যবসায়ী। সম্ভাব্য অধিগ্রহণকৃত এলাকায় যৌথ উদ্যোগে বহুতল ভবন বানিয়ে বাণিজ্যিক হিসাবে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে যেনতেনভাবে ভবন বানিয়েছেন। শুধু এই দুই ব্যক্তিই নন, ১২ নম্বর এলএ কেস থেকেই ৩৫টি স্থাপনা বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া ১৩ নম্বর এলএ কেসে বড় ভবন চারটি এবং ছোট বিল্ডিং ৭৯টি। যা নিয়ে এখন এলাকাজুড়ে হইচই অবস্থা।
অধিগ্রহণ তালিকার নমুনা : ভূমি অধিগ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ১৫নং এলএ কেসে ক্ষতিপূরণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন মনিরুজ্জামান ও নাজির আহমেদ খান। তাদের বাড়ি নরসিংদীর পূর্ব ব্রাহ্মন্দী এলাকায়। তারা প্রকৃত তথ্য গোপন করে ৭ শতক জমির মূল্য হিসাবে ৭৫ লাখ ৪৮ হাজার ২৬৪ টাকা নিয়ে গেছেন। ভেলানগর বাজার জামে মসজিদের এক শতক জমি অধিগ্রহণের আওতায় অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু মসজিদকে আড়াল করে শিবপুরের দক্ষিণ কারারচরের আব্দুস সালেক ভূঁইয়ার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৯৫ সালে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট নরসিংদী জেলা হাসপাতালের নামে অধিগ্রহণ করা জমিও ব্যক্তি নামে ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করা হয় তালিকায়। ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে চুক্তির মাধ্যমে অন্যের জমিতে ঘর নির্মাণ করেও বাণিজ্যিক হিসাবে ক্ষতিপূরণের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেন চিনিশপুরের খলিলুর রহমান। এরকম শত শত আবেদনকে বৈধতা দিয়েছেন অধিগ্রহণ কর্মকর্তারা।
রাঘববোয়ালরা এখন বাঁচতে চায় : খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আওয়ামী লীগ আমলের শেষ সাত বছরে চারজন জেলা প্রশাসক (ডিসি) এই প্রকল্পের বারোটা বাজিয়েছেন। ২০১৮ সালে ঢাকা-সিলেট সড়কটি উন্নয়নে প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়। তখন নরসিংদীর ডিসি ছিলেন সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন। তিনি ২০১৮ সালের ১১ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২২ জুন পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। এরপর ২০২১ সালের ২২ জুন থেকে ২০২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবু নইম মোহাম্মদ মারুফ খান, ২০২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ড. বদিউল আলম এবং ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নরসিংদীর ডিসি ছিলেন মোহাম্মদ রাশেদ হোসেন চৌধুরী। আওয়ামী লীগের শেষ সাত বছরে জমি অধিগ্রহণের সব প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে রেখে গেছেন এই ক্যাডার কর্মকর্তারা। এর আগে যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পর গঠিত তদন্ত কমিটিকেও প্রভাবিত করার অপচেষ্টা করেন জড়িত কয়েকজন ক্যাডার কর্মকর্তা।
তদন্ত কমিটি রাঘববোয়ালদের বাদ দিয়ে চুনোপুঁটি খ্যাত তৃতীয় শ্রেণির সার্ভেয়ারদের সরিয়ে দিয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। এখানে উল্লেখ্য, গত ১৯ অক্টোবর জমি অধিগ্রহণ নিয়ে যুগান্তরে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বহুল আলোচিত সার্ভেয়ার আমির হোসেনকে বরিশালে বদলি করা হয়। পরে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দেওয়া হয়। এই আমির হোসেন ডিসি ও এডিসির ঘুস বাণিজ্যের বিষয়ে যুগান্তরের কাছে বিস্তর তথ্য দিয়েছিলেন। ক্যাডার কর্মকর্তারা তদন্ত করে শুধু তাকেই বলির পাঁঠা বানিয়েছেন। অথচ ক্যাডার কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে অধিগ্রহণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা কোনোরকম নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে যেভাবে পেরেছেন ক্ষতিপূরণের তালিকা প্রস্তুত করেন। মূলত এই সময় থেকেই স্থাপনা তৈরি করে বাণিজ্যিক ক্ষতিপূরণের আওতায় দালালদের সঙ্গে জমি মালিকদের চুক্তিপত্র করা শুরু হয়। এসব চুক্তিপত্রে ক্ষতিপূরণের টাকা ভাগাভাগির চিত্র দাপ্তরিকভাবে গৃহীত হয়েছে। চুক্তিপত্রে স্পষ্টাক্ষরে লেখা রয়েছে, ক্ষতিপূরণের টাকা ভাগাভাগি হবে ৪৫-৫৫ শতাংশ হারে। এর পরও দালাল, সার্ভেয়ার ও কানুনগোসহ অধিগ্রহণ কর্মকর্তাদের লাগাম টেনে ধরা হয়নি।
সূত্রমতে, দালালদের মাধ্যমে চুক্তিপত্রের এসব বিষয় প্রস্তুত করতেন সার্ভেয়ার আমির হোসেনসহ কয়েকজন। তিনি ছিলেন ডিসি অফিস নিয়ন্ত্রক। তার সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কর্মরত প্রভাবশালী আরও ছয়জনের নাম পাওয়া যায়। তারা হলেন-জেলা নাজির আব্দুর রউফ, ট্রেজারার (উপসহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা) শাহরিয়ার আহমেদ, সদর ভূমি অফিসের হিটলু চন্দ্র বাউল, রেকর্ডকিপার আব্দুর রহমান, সদ্য অবসরে যাওয়া আলমগীর হোসেন ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফারুক ভূঁইয়া। এই ফারুক ভূঁইয়া এডিসির (রাজস্ব) অফিসে একজন নারীর শ্লীলতাহানিও করেন। ওই নারী ফারুক ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ আছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে নরসিংদীতে চাকরি করে জেলা প্রশাসনকে নিজেদের কবজায় কুক্ষিগত করে রেখেছেন। পদাধিকার বলে তারা ডিসি-এডিসির হুকুম তামিল করবেন। অথচ জনশ্রুতি আছে, এই ছয় খলিফা ক্যাডার কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণ করেন। কারণ জেলা প্রশাসনের সব আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতি তাদের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। ক্যাডার কর্মকর্তাদের সব ধরনের দুর্বলতা সম্পর্কে তারা বেশি অবহিত।
এজন্য অধিগ্রহণসংশ্লিষ্ট কাজে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা উলটো ডিসি-এডিসিদের নিয়ন্ত্রণ করতেন। আর ঘুসের ভাগ নিতেন বলে কর্মকর্তারা তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও কোনো ব্যবস্থা নিতে পারতেন না। এছাড়াও নরসিংদীর সাবেক এডিসি (রাজস্ব) অঞ্জন দাস, মোস্তফা মনোয়ার, নাজমুল হাসান, এলএও চৌধুরী মোস্তাফিজুর রহমান, রেহানা মজুমদার মুক্তি, রাজিব দাস পুরকায়স্থ ও এএইচএম আজিমুল হকসহ ঘুস সিন্ডিকেটের সদস্য এসব ক্যাডার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযুক্ত সব কর্মকর্তার পক্ষে নরসিংদীর সাবেক এডিসি অঞ্জন দাস প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা করে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুস দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। ঘুস প্রস্তাবের ভিডিও প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত আছে। অথচ ওই সময় সংশ্লিষ্ট ক্যাডার কর্মকর্তারা প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেন, তাদের আমলে অধিগ্রহণে কোনো ধরনের দুর্নীতি হয়নি।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কানুনগো যুগান্তরকে বলেন, ‘যুগান্তরে প্রকাশিত তথ্য তদন্তে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে যে কমিটি করা হয় তাদের এক কোটি টাকা ঘুস দেওয়া হয়। এই টাকার বিনিময়েই তদন্ত কমিটি ক্যাডার কর্মকর্তাদের কৌশলে রক্ষা করেন। সবাই চাঁদা তুলে এই টাকা দেয়।’ তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. আজমল হোসেন নিজেও একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। তিনি এই তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন।’
বারবার চেষ্টা করেও মো. আজমল হোসেনের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কয়েকবার কল করা হয়। কিন্তু তিনি রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগের বিষয় উল্লেখ করে বক্তব্য চাওয়া হলেও তিনি তাতেও সাড়া দেননি।