Image description
নিয়ন্ত্রণে নেই সুনির্দিষ্ট আইন বা নীতিমালা

একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মোবাইল হাতে নিতেই শিউরে ওঠেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা জিনিয়া জাহান (ছদ্মনাম)। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে তার ছবি সংবলিত একটি ফটোকার্ড। একটি গণমাধ্যমের লোগো সংবলিত ওই ফটোকার্ডটি শেয়ার হয়ে গেছে ১০ হাজারের বেশি। বাস্তবে ওই ফটোকার্ডের দেওয়া ক্যাপশনের সঙ্গে জিনিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই; এটি তৈরি হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পোস্টটি ভাইরাল; বন্ধুবান্ধব, শিক্ষার্থী এমনকি পরিবারের লোকজনও এ নিয়ে কথা শোনান তাকে।

‘আমি ভেঙে পড়েছিলাম। প্রমাণ করার মতো কিছুই হাতে ছিল না, কারণ এটা আসলেই আমি নই। কিন্তু সবাই তো প্রথমে বিশ্বাস করে না’ যুগান্তরকে আক্ষেপ করে বলেন জিনিয়া। থানায় গিয়ে অভিযোগ করতে চাইলেও পুলিশ জানায়, এআই-নির্মিত কনটেন্ট বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো ফটোকার্ড নিয়ে বাংলাদেশে কোনো নির্দিষ্ট আইন নেই। শুধু মানহানির মামলা করা যেতে পারে। ফলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়াও কঠিন।

প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন জীবনকে সহজ করে, তেমনি এর অপব্যবহারে দুর্বিষহও হয়ে ওঠে। তৈরি হয় ভুয়া ফটোকার্ডে নতুন ডিজিটাল সন্ত্রাসী কার্যক্রম। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য আইনি কাঠামো থাকা উচিত। বিশ্বের অনেক দেশেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে সুস্পষ্ট আইন, নীতিমালা, নির্বাহী আদেশ ও কৌশলগত দিকনির্দেশনা থাকলেও বাংলাদেশে এখনো অপপ্রচার রোধে কোনো বিশেষ আইন নেই। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও ভারতসহ অনেক দেশই এ বিষয়ে নীতিমালার পথে এগিয়েছে। অপব্যবহার ঠেকাতেও নিয়েছে কার্যকর ব্যবস্থা। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো এআই ব্যবহারের জন্য নেই কোনো সমন্বিত আইন, গাইডলাইন, পলিসি বা স্ট্র্যাটেজি। ফলে প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রার মুখে দেশের প্রস্তুতি অপ্রতুল। ২০২৪ সালের খসড়া ‘ন্যাশনাল এআই পলিসি’ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। খসড়ায় সরকারি সেবা, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, কৃষি ও ডেটা গভর্ন্যান্সকে প্রাধান্য দেওয়া হলেও নীতির আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার) সৈয়দ হারুন অর রশীদ যুগান্তরকে বলেন, সাধারণত ফটোকার্ড তৈরি করে ভুয়া আইডি থেকে ছড়ানো হয়। ফটোকার্ডগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে, তা কিন্তু নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করার সুযোগ আমাদের হাতে নেই। তবে কেউ যদি ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি ও মিথ্যাচার করেন এবং বিষয়টি নিয়ে যদি ভুক্তভোগী সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ দেন, তাহলে আমরা সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিই। এর বাইরে এগুলো নিয়ে আমাদের কিছু করার নেই। কারণ এটার নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সোহাগ যুগান্তরকে বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমের আদলে তৈরি ভুয়া ফটোকার্ড ব্যবহার করে মানুষকে হেয়প্রতিপন্ন করার প্রবণতা বাড়ছে। এর ফলে শিক্ষাঙ্গন থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরে অস্থিরতাও তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, কোন এলাকায় এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে তা ম্যাপিং করতে হবে। প্রযুক্তির সহায়তায় ট্রেসিং করে অপরাধীদের শনাক্ত করতে হবে এবং দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অপরাধ করার সাহস না পায়।

ডিপফেক (এআই ব্যবহার করে তৈরি ছবি ও ভিডিও) শুধু তথ্য নয়, মানুষের আবেগ নিয়েও খেলে। চোখের সামনে ছবি বা ভিডিও দেখলে অনেকেই যুক্তিবোধ হারিয়ে ফেলে, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশে ভয়ংকর প্রভাব ফেলে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে একটি ‘এডিট করা’ অশ্লীল ফটোকার্ডকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় রাজধানী শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে রাজনৈতিক সংঘাত মনে হলেও এর গভীরে লুকিয়ে আছে প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি ‘ডিপফেক’ কনটেন্টের ভয়াবহতা।

তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য প্রযুক্তি অপব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে হুবহু আসলের মতো দেখতে স্ক্রিনশট ও ফটোকার্ড, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে যাচাই করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তেমনই এক অবস্থা তৈরি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এক শিক্ষার্থীর আইডি থেকে জাইমা রহমানকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ফটোকার্ড শেয়ার করার অভিযোগ তোলে ছাত্রদল। পরিস্থিতি সামাল দিতে ডাকসু নেতারা থানায় গেলে তারা হামলার শিকার হন। আহত হন সাংবাদিকসহ অন্তত দশজন। তবে ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান ‘রিউমর স্ক্যানার’ নিশ্চিত করেছে যে, যে স্ক্রিনশটটি ঘিরে এই লঙ্কাকাণ্ড, সেটি মূলত এআই জেনারেটেড এবং সম্পূর্ণ ভুয়া। অর্থাৎ যে শিক্ষার্থীর নামে এটি ছড়ানো হয়েছে, তার আইডি থেকে এমন কোনো পোস্টই করা হয়নি। প্রযুক্তির মাধ্যমে তার নাম ও ছবি ব্যবহার করে একটি কৃত্রিম ‘ডিজিটাল এভিডেন্স’ তৈরি করা হয়েছিল। তবে এটি কে বা কারা করেছিল, সেটি এখনো স্পষ্ট করে শনাক্ত হয়নি।

সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা যুগান্তরকে বলেন, ভুয়া ফটোকার্ড ও বিকৃত ছবি ছড়িয়ে সামাজিক অস্থিরতা তৈরির ঘটনা এখন অহরহ ঘটছে। তবে ছবি বা ফটোকার্ড প্রথম কে সামাজিকমাধ্যমে আপলোড করেছে, তা শনাক্ত করা প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাইলে সাইবার পেট্রোলিং, ডিজিটাল ফরেনসিক ও প্ল্যাটফর্মভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে উৎস বের করতে পারে। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট পেজ বা পোস্টের সুনির্দিষ্ট লিংক সংরক্ষণ করা গেলে প্রশাসনের পক্ষে অ্যাডমিন শনাক্ত করা কঠিন নয়। তিনি বলেন, দ্রুত তদন্ত, ডিভাইস ফরেনসিক পরীক্ষা এবং বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে এমন অপপ্রচার অনেকটাই কমে আসবে। তিনি আরও বলেন, সামাজিক উত্তেজনা, সহিংসতা বা মানহানি সৃষ্টিকারী কনটেন্ট মোকাবিলায় বিদ্যমান আইনেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে, তবে তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোও জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই-জেনারেটেড ভুয়া তথ্যের বহুমুখী প্রভাব রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, ব্যক্তিগত মানহানি। বিভিন্ন পোস্টে দেখা যায়, নিরপরাধ ব্যক্তি বা সমাজে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের সম্মানহানি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দাঙ্গা ও সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনি বা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সৃষ্টি করা সম্ভব। এসব ফটোকার্ড বা এআই কনটেন্ট গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে। নির্বাচন বা গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুগুলোতে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার হাতিয়ার হিসাবে এটি ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। সমাজে বা রাষ্ট্রে তৈরি হয়, ডিজিটাল ট্রাস্ট বা আস্থার সংকট। এর ফলে মানুষ ইন্টারনেটে দেখা আসল তথ্যকেও ভুয়া মনে করে উড়িয়ে দিচ্ছে, যা তথ্যের অবাধ প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সামাজিকমাধ্যমের অপব্যবহার রুখতে কঠোর আইন যেমন দরকার, একই সঙ্গে বাড়াতে হবে ডিজিটাল লিটারেসি। সাধারণ ব্যবহারকারীদের বুঝতে হবে যে, স্ক্রিনশট মানেই সত্য নয়। কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে নির্ভরযোগ্য ফ্যাক্ট-চেক সাইটের সহায়তা নিতে হবে। তাছাড়া মেটা (ফেসবুক) বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোকে এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট শনাক্তে আরও কঠোর হতে হবে। দেশের আইন মেনে এই কাজ করতে বাধ্য করতে হবে। যেন এমন ভুয়া তথ্য ছড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই তা রিমুভ করা যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তাহমিনা আক্তার যুগান্তরকে বলেন, ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভুয়া ফটোকার্ড, ট্রল, অতিরঞ্জিত কনটেন্ট ও প্রযুক্তির অপব্যবহার আমাদের সমাজে এক ধরনের অসুস্থতার লক্ষণ। বিশেষ করে নারীদের লক্ষ্য করে এ ধরনের অপপ্রচার বেশি হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক। তবে পুরুষরাও এর বাইরে নয়। তিনি মনে করেন, এই সমস্যা মোকাবিলায় আইনের প্রয়োগ যেমন দরকার, তেমনি সচেতনতা তৈরি করতে হবে। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের শেখাতে হবে কোনটি সঠিক আচরণ, কোনটি ভুল, কী শেয়ার করা উচিত আর কী নয়। এজন্য স্কুলের পাঠ্যসূচিতে নৈতিকতা, ডিজিটাল আচরণবিধি ও সামাজিক মূল্যবোধ অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। বলেন, স্কুল, কলেজ ও কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন। যুব ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ও সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। প্রথমে সচেতনতা, পরে প্রয়োজন হলে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।