বগুড়ার শিবগঞ্জে পীরব ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক মিজানুর রহমান চাকরি করছেন জাল সনদে। রয়েল ইউনিভার্সিটির নামে দেওয়া তার সনদটি জাল। এ জাল সনদ দিয়ে চাকরি করে ইতোমধ্যে সরকারের কোষাগার থেকে আদায় করেছেন ৩২ লাখ ২৮ হাজার ৯৬০ টাকা। সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে এ অনিয়মের বিষয়টি উঠে এসেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপিএডে সনদ জাল করে চাকরি করছেন পাবনার ইসমাইল হোসেন মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শহিদুল ইসলাম। তিনি আদায় করেছেন ৩৮ লাখ ১৭ হাজার ৭৭৬ টাকা। এশিয়ান ইউনিভার্সিটির জাল সনদে চাকরি করছেন টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে শমসের ফকির ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক (গ্রন্থাগারিক) আবদুল মোনায়েম সরকার। শুধু এ তিনজনই নন, সারা দেশে হাজার হাজার শিক্ষক জাল সনদে চাকরি করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। জাল সনদের শিক্ষকে সয়লাব হয়েছে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। ইতোমধ্যে ১ হাজার ৪১১ জন জাল সনদধারী শিক্ষককে শনাক্ত করেছে ডিআইএ। আরও প্রায় ২ হাজার সনদ যাচাইয়ের অপেক্ষায় রয়েছে। সব থেকে বেশি জাল সনদ ধরা পড়ছে শিক্ষক নিবন্ধনের এনটিআরসিএর। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্র বলছে, কয়েক বছর আগে এনটিআরসিএ দপ্তরের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সারা দেশে সয়লাব হয়েছে শিক্ষক নিবন্ধনের জাল সনদ।
তথ্যমতে, এর আগে ৬৭৮ জন স্কুল-কলেজ শিক্ষকের জাল সনদ প্রমাণিত হওয়ার পর পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের সুপারিশের ভিত্তিতে তাদের এমপিও স্থগিত করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। এরপর ২০২৪ সালে ১৫৪ জন শিক্ষকের সনদ জালিয়াতির প্রমাণ পেয়ে ডিআইএ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। কিন্তু রহস্যময় কারণে এখনো তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে চলতি মাসে এই ১৫৪ জনসহ মোট ৪৭১ জনের জাল সনদ চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর। এদের মধ্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের জাল সনদ ২২৯ জনের, শিক্ষক নিবন্ধনের এনটিআরসিএর জাল সনদ ১৯৪ জনের ও ৪৮ জনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে জাল বিপিএড, বিএড, গ্রন্থাগারসহ অন্যান্য শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের প্রমাণ মেলে। ডিআইএর সুপারিশের ভিত্তিতে জাল সনদধারী এই ৪৭১ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর চিঠি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। এদিকে, গতকাল সারা দেশের মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জাল সনদধারী ২৬২ শিক্ষক-কর্মচারীর তালিকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা ডিআইএ। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে ২৬২ জনের মধ্যে ২৫১ জনের শিক্ষক নিবন্ধনের এনটিআরসিএ সনদ ও বাকি ১১ জনের বিপিএড, বিএড বা গ্রন্থাগার বিষয়ের জাল সনদের প্রমাণ মিলেছে। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, সনদ প্রদানকারী দপ্তরগুলো জাল বা ভুয়া বলে প্রত্যয়ন করলে তবেই আমরা এসব সনদকে জাল বা ভুয়া আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ করে থাকি। আমাদের কাজ সুপারিশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। জাল সনদধারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার মন্ত্রণালয়ের। ডিআইএ সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পেলে জাল সনদধারীদের বিরুদ্ধে এমপিও (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) বন্ধসহ তাদের বিরুদ্ধে যাবতীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি)। জাল সনদধারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রসঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল প্রতিবেদককে বলেন, আমি সম্প্রতি মহাপরিচালকের দায়িত্বগ্রহণ করেছি। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।