সাত বছরের নুসরাত আক্তার বৃষ্টি। পরিবার নিয়ে থাকে রাজধানীর মেরুল বাড্ডায়। বড় বোনের সঙ্গে খেলার ছলে খাট থেকে পড়ে গিয়ে বাঁ হাতে গুরুতর আঘাত পায় সে। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় শেরেবাংলা নগরের জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে (পঙ্গু হাসপাতাল)। এক্স-রেতে ধরা পড়ে কনুইয়ের ওপরের হাড়ে ফাটল। অপারেশন হয়, হাড়ে বসানো হয় একটি স্ক্রু।
কিন্তু চিকিৎসার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে খরচের বোঝা। অপারেশন ‘বিনামূল্যে’ হলেও, বাস্তবে একের পর এক খরচের তালিকা ধরিয়ে দেওয়া হয় তার বাবা ইসমাইল হোসেনের হাতে। শুধু স্ক্রুই কিনতে হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ টাকায়। এর বাইরে প্রায় ৭ হাজার টাকার ওষুধ, ইনজেকশন, সুই, সেলাইয়ের সুতা, গজ- সবই কিনতে হয়েছে বাইরে থেকে। একটি ছোট চায়ের দোকানের আয়ে চলা পরিবারটির জন্য এই খরচ যেন হঠাৎ নেমে আসা এক দুর্ভার চাপ।
জানতে চাইলে ইসমাইল হোসেন বলেন, অপারেশনটা ফ্রি বলেই এখানে এসেছি। কিন্তু পরে দেখি, সবকিছুই নিজের টাকায় কিনতে হচ্ছে। হাসপাতালের ভিতরেই বিভিন্ন কোম্পানির লোকজন ঘোরে, তারাই এসব জিনিস এনে দেয়। রোগীদের স্বজনদের অভিযোগ, অপারেশনের আগে চিকিৎসকরা একটি ‘লিস্ট’ ধরিয়ে দেন। সেই তালিকায় থাকে অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব উপকরণ- সুই থেকে শুরু করে সুতা, গজ, ইনজেকশন পর্যন্ত। কোনো কিছুই হাসপাতাল থেকে সরবরাহ করা হয় না। তবে অপারেশনের আগে যেসবের লিস্ট ধরিয়ে দেওয়া হয় সেগুলো সরবরাহ করে থাকেন হেলথ কেয়ার ক্লিনিকের প্রতিনিধিরা। এরা এই সরকারি হাসপাতালে বিভিন্ন আড়ালে বেসরকারি বাণিজ্য করে থাকেন।
আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে অপারেশনের আগে ওই তালিকা ঘিরে। অনেক স্বজনের দাবি, তালিকায় থাকা সব উপকরণ অপারেশনে ব্যবহারই হয় না। অতিরিক্ত এসব সামগ্রি পরে বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান সড়ক দুর্ঘটনায় আহত মো. মোক্তার। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে দুর্ঘটনায় তার ডান হাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তাকে পাঠানো হয় পঙ্গু হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসকরা জানান, তার ডান হাত কেটে ফেলতে হবে।
অপারেশনের আগে তাকেও দেওয়া হয় প্রায় ৭ হাজার টাকার ওষুধ ও সরঞ্জামের তালিকা। মোক্তার বলেন, রাতে অপারেশন। ডাক্তারের দেওয়া সবকিছু আগেই কিনে রেখেছি। না হলে অপারেশনই হবে না।
সরকারি হাসপাতাল মানেই স্বল্প খরচে চিকিৎসা- এ ধারণা অনেক আগেই প্রশ্নের মুখে। অপারেশন থিয়েটারের ভিতরে চিকিৎসা যতটা ‘ফ্রি’, তার বাইরে প্রতিটি ধাপে যেন খরচের ফাঁদ। সুই, সুতা, গজ- যে জিনিসগুলো একটি সরকারি হাসপাতালের নিজস্ব সরবরাহে থাকার কথা, সেগুলোই কিনে আনতে হচ্ছে রোগীর স্বজনদের। তৃতীয় তলায় পুরুষ ওয়ার্ডের শেষ মাথায় মেঝেতে পাটি বিছিয়ে দুজন বসে ছিলেন। একজন নারী, একজন পুরুষ। তারা মাতা ও পিতা। দুজনের মুখেই গভীর বেদনার ছাপ। জানতে চাইলাম, আপনাদের রোগী কোথায়? পিতা ইশারা করে বেডের ওপরে দেখালেন। একটা ২২-২৩ বছর বয়সি ছেলে ঘুমাচ্ছে। ডান হাত কাটা পড়েছে। বাবা গাজীপুরে এক অটোমেটিক ব্রিক ফিল্ডে কাজ করেন। সেখানে বেড়াতে গিয়েছিল ছেলেটি আর অসাবধানতাবশত ছেলেটির হাত সেখানকার ব্লেডেই কাটা পড়ে। পিতা নিজেকে কোনোভাবেই প্রবোধ দিতে পারছেন না। পরিবার বাড়িতে তালা ঝুলিয়ে এখানে এসেছে। পুরো সংসার এখন হাসপাতালে। এ পর্যন্ত তাদের ১ লাখ টাকার মতো খরচ হয়ে গেছে। তাদের কোনো জমানো টাকা ছিল না। সব টাকাই ধার করতে হয়েছে। আরও কতটা করতে হয় সেটাও এখনই বলা যাচ্ছে না।
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের (নিটোর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান বলেন, সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনার রোগীরা এই হাসপাতালে আসেন। অপারেশনের রোগীদের ওষুধপত্র বেশির ভাগই হাসপাতাল থেকে সরবরাহ করা হয়। অল্প কিছু রোগীকে কিনতে হয়। তবুও রোগীরা নানা ধরনের অভিযোগ করে থাকেন। তবে যতই অভিযোগ থাকুক না কেন, আমরা একজন রোগীকেও বিনা চিকিৎসায় ফেরত দিই না। যে অবস্থায় থাকুক না কেন আমরা তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করি। ভাঙা পা নিয়ে পঙ্গু হাসপাতালের জরুরি বিভাগের অপারেশন থিয়েটারের কাছে মেঝেতে জায়গা পেয়েছেন ঝিনাইদহের মুদি দোকানদার জসিম উদ্দিন। রাস্তা পার হওয়ার সময় একটি মোটরসাইকেলের ধাক্কায় আহত হন তিনি। ঘটনার দিনই হাসপাতালে পৌঁছানোর পরও অপারেশনের অপেক্ষায় মেঝেতে থাকেন ৫৫ বছরের এই ব্যক্তি। তার মেয়ে বলেন, দুর্ঘটনার পর সরাসরি আমরা এখানে এসেছি কিন্তু হাসপাতালে বিছানা না পেয়ে মেঝেতে থাকতে হচ্ছে।