শুরুটা হয়েছিল ইরানে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর। জ্বালানি তেল সংকট হতে পারে এই শঙ্কা থেকে যানবাহনে
জ্বালানি নিতে হিড়িক পড়ে। তারপর থেকে দেশের জ্বালানি তেলের পাম্পগুলোতে হ-য-ব-র-ল অবস্থা। সরকার বলছে তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও মজুত আছে। ডিপো থেকে পাম্পে নিয়মিত জ্বালানিও দেয়া হচ্ছে। কিন্তু পাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ সারি কমছে না। পাম্পে তেল আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে, আগে যা পুরো দিনেও শেষ হতো না। এই অবস্থায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এত জ্বালানি যাচ্ছে কোথায়?
পেট্রোল পাম্প কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, সংকটের দোহাই দিয়ে কিছু ব্যক্তি পর্যায়ের ক্রেতা তেল মজুত করছেন নিজের প্রয়োজনে। তারা এও ভাবছেন একসময় তেলই পাওয়া যাবে না। আবার আরেক শ্রেণি বাণিজ্যিক দৃষ্টিতে বিভিন্ন পাম্প থেকে বিভিন্নভাবে তেল সংগ্রহ করে জমিয়ে পাচার করছে। এ ছাড়া আরও কিছু লোক তেল সংগ্রহ করে খুচরা বিক্রেতার কাছে বেশি দামে বিক্রি করছেন। আবার খুচরা বিক্রেতারা সেই তেল সাধারণ ক্রেতার কাছে চড়া দামে বিক্রি করছেন।
পাম্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঢাকার পেট্রোল পাম্পগুলোতে আগে দৈনিক ৫ থেকে ১০ হাজার লিটারের বেশি তেল লাগতো না। মাসে লিটারের হিসাব করলে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ লিটারের মতো তেল লাগতো। কিন্তু দেশে চলমান এই অস্থিরতার মধ্যে কিছু পাম্পে বিক্রি বেড়ে গেছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। কিছু পাম্পে কমেছে। কোথাও কোথাও আগের মতোই সরবরাহ করা হচ্ছে জ্বালানি তেল।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, যদি সাধারণ গ্রাহকরা একবারে তাদের গাড়ির ট্যাংকি পূর্ণ করে নেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবে টানা কিছুদিন পাম্পে ভিড় থাকার কথা। এরপর কয়েকদিন ভিড় কমে যাওয়ার কথা, কারণ তখন অধিকাংশ গাড়িতেই পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত থাকবে। পরে যখন সেই তেল ফুরিয়ে আসবে, তখন আবার পাম্পগুলোতে ভিড় বাড়ার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। প্রতিদিনই পাম্পে উপচে পড়া ভিড়।
চলমান সংকটের মাঝে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে জ্বালানি তেলের চাহিদা। গত ১ মাসে সরজমিন বিভিন্ন পাম্পে গিয়ে দেখা গেছে, পাম্পে তেল নিয়ে আসলেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে, উপায় না পেয়ে বিক্রি বন্ধ রাখতে হয় তেল। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তেল না পেয়ে ফিরে যেতে হয় চালকদের। পাম্পের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তেল পেলেই তারা তা বিক্রি করছেন। তবে শেষ হয়ে গেলে পাম্পে ‘তেল নাই’ বলে নোটিশ টানিয়ে দেন।
আগে প্রতি মাসে পরিবাগের পূর্বাচল ট্রেডার্স-এ ১ লাখ ৮০ কিংবা ২ লাখ লিটারের মতো তেল প্রয়োজন হতো। কিন্তু এই মাসে সংকটের এই সময়টাতে আগের চেয়ে বিক্রি বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। ২ লাখ ২০ থেকে ৩০ হাজার লিটারের মতো বেশি বিক্রি হয়েছে গত মাসে। সরকারি পাম্প মেঘনা মডেল সার্ভিসে গত রোববার প্রারম্ভিক জমা তেল ছিল ২১ হাজার ৫০০ লিটার অকটেন ও পেট্রোল ২ হাজার ৯০০ লিটার। প্রতিদিন পাম্পটি প্রায় ৩০ হাজার লিটার তেল জমা করে। এর মধ্যে ২৮ থেকে ২৯ হাজার লিটার তেল বিক্রি করে দেয়। গত ৩০শে মার্চ পাম্পটিতে প্রারম্ভিক মজুত দেখানো হয়েছিল ১৭ হাজার ৪০০ লিটার অকটেন ও ৮ হাজার ১০০ লিটার পেট্রোল। মতিঝিলের মেঘনা ফিলিং স্টেশন, রহমান ফিলিং স্টেশনে সংকটের আগে ৯ হাজার ৫০০ লিটার তেল লাগতো। এখনো তাই লাগে। তবে এখন তা অল্প সময়ের মধ্যেই বিক্রি হয়ে যায়। একই এলাকার করিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে আগে ১৮ হাজার লিটার অকটেন ও ৪ হাজার ৫০০ লিটার তেল বিক্রি করতো। এখন পরিমাণ কমিয়ে ৯ হাজার লিটার অকটেন, ৪ হাজার ৫০০ লিটার ডিজেল দেয়া হয়।
খোদ পাম্প কর্তৃপক্ষই অবাক হচ্ছেন, আগের ভোক্তাদের যে পরিমাণ, বর্তমানে একই সংখ্যক ভোক্তা থাকলেও চাহিদা বেড়ে গেছে অসীম। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এমন অস্থিরতার কারণ আতঙ্ক আর অবৈধভাবে মজুত। তারা বলছেন, বেশির ভাগ বাইকারদের মধ্যে তেল খুচরা কিনে মজুত করার প্রবণতা রয়েছে। মজুতের জন্য একজন কয়েকবার করেও তেল কিনছেন। কেউ কেউ মজুতকৃত তেল বিক্রি করে দেন। তবে, সারা দেশের অবৈধভাবে তেল মজুতের অসংখ্য নজির মিলছে। সরকার মাসব্যাপী অভিযান চালিয়ে লাখ লাখ লিটার তেল জব্দও করছেন। আবার অভিযোগ আছে, পাম্পে বেশি টাকা দিয়ে কেউ কেউ অবৈধভাবে সংগ্রহ করছেন তেল। তবে, পাম্প মালিকদের সংগঠনের দাবি, তেলের বাজারের এই অস্থিরতা কমাতে বিশ্ব বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে দেশের তেলের বাজার।
পরিবাগের সরকারি তেলের পাম্প মেঘনা মডেল সার্ভিসের ম্যানেজার হাবিবুল্লাহ বলেন, প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ হাজার লিটার তেল বিক্রি হতো। তবে, এখন রেশনিং করে বিক্রি করতে হচ্ছে। তাই কিছুট কম বিক্রি করতে হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজার লিটারের মতো তেল সরকার দেয়। তবে সবটা বিক্রি করছি না। পনেরশ’ থেকে ২ হাজার লিটারের মতো পরের দিনের জন্য রেখে দেয়া হচ্ছে। মানুষের চাহিদার জন্য বেসরকারি পাম্পগুলোতে অনেক বেশি বিক্রি হচ্ছে।
মতিঝিল মেঘনা ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক সজীব হোসেন বলেন, আমরা এই সংকটের আগে ৯ হাজার ৫০০ লিটার তেল পেতাম সেটি আমাদের সারাদিন চলে যেতো। এখন ৩ ঘণ্টার মধ্যেই তেল শেষ হয়ে যায়। অনেকে একবার তেল নিয়ে আবার আসে তেল নিতে আমরা এমন অনেককে দেখেছি। কিন্তু এগুলো তো আমরা বন্ধ করতে পারি না, মানুষ হুমড়ি খেয়ে তেল নিচ্ছে। এত তেল যাচ্ছে কোথায় সেটাও প্রশ্নের বিষয় কারণ রাস্তায় তো গাড়ির সংখ্যা আগের মতোই রয়েছে বাড়েনি।