রূপগঞ্জে প্রভাবশালী ‘মাটিখেকো’ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে অসহায় হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে মানুষের কৃষিজমি ও বসতভিটার মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে দিনরাত। ভেকু বসিয়ে একরের পর একর জমি পরিণত করা হচ্ছে ২০-৩০ ফুট গভীর জলাশয়ে। প্রতিবাদ করলেই মিলছে জবাই করে হত্যার হুমকি। থানায় একাধিক অভিযোগ জমা পড়লেও কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় থামছে না এ অবৈধ খনন বাণিজ্য। ভয়ে ‘মাটিখেকো’ এ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কেউ কথাও বলতে চান না। রূপগঞ্জের করোটিয়া গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমি আর কিছু বলব না। আপনারা খবর প্রকাশ করলে রাতেই ধরে নিয়ে আমাকে জবাই করে শীতলক্ষ্যায় ফেলে দেবে’। তাঁর অভিযোগ, পৈতৃক জমির মাটি কেটে ইতোমধ্যে পুকুর বানিয়ে ফেলা হয়েছে। একসময় যেখানে ফসল ফলাতেন, এখন সেখানে মাছ চাষ করছে অন্যরা। বাধা দিতে গিয়ে হামলার শিকার হয়ে আহত হয়েছেন।
শুধু এই বৃদ্ধই নন, রূপগঞ্জ থানাধীন ভোলাব ইউনিয়নের করোটিয়া, আঙ্গারজোড়া, তারাইল এবং কাঞ্চন পৌরসভার কাঞ্চন, কেন্দুয়া ও বিরাব মৌজায় অবস্থিত অসংখ্য মানুষের জমির মাটি জোরপূর্বক কেটে নিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। গত বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, একরের পর একর আবাদি কৃষিজমি ও ভিটাজমির মাটি কেটে তৈরি করা হয়েছে ২০-৩০ ফুট গভীরতার অসংখ্য খাদ। কোথাও কোথাও সেই খাদই এখন জলাশয়ে পরিণত হয়েছে।
ঘটনাস্থলে তিনটি ভেকু দিয়ে একযোগে মাটি কাটতে দেখা যায়। সেই মাটি ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বিভিন্ন স্থানে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার মাটি বিক্রি হচ্ছে এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। আবাসন প্রকল্পসহ দরিদ্রদের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি তাদের প্রধান টার্গেট। মাটি কেটে ইটভাটাসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করছে। স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে মাটি লুট সিন্ডিকেটে কবির মোল্লা, তারেক মোল্লা, আরিফ, বাচ্চু ওরফে চাল বাচ্চু, ইমন, সুমন, হুমায়ুন কবীর জুয়েল, শামীম, মুহিত মোল্লা, সেলিম মোল্লা, হাজী আবুল কালাম আজাদ, ইসমাইল, রাকিব, আশরাফুল, রুবেল, সাখাওয়াত হোসেন, মোজাম্মেল হোসেন, মোগল, মফিজ, রফি, মনির মোল্লা, রবিউল, শান্ত ইসলাম, জহিরুলসহ দুই ডজনের বেশি নাম পাওয়া গেছে।
৩৫ বছর বয়সি এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির বেশির ভাগই কেটে নিয়ে গেছে। বাধা দিতে গেলে শরীর থেকে মাথা আলাদা করে ফেলার হুমকি দেয়। তাই কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।’ তিনি দূর থেকে একটা জলাশয় দেখিয়ে বলেন, ওইখানে তার জমি ছিল। সেখানে কৃষিকাজ করতেন। এখন গভীর জলাশয়। এতটা গভীর করে মাটি কেটে নিয়ে গেছে যে, বিক্রি করতে চাইলেও তেমন দাম পাবেন না বলে আশঙ্কা তার। ভুক্তভোগীরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই এই মাটি কাটার দৌরাত্ম্য শুরু হয়। তখন ‘সমন্বয়ক’ পরিচয়ে একটি চক্র মাঠে নামে। পরবর্তীতে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চক্রে নতুনরা যুক্ত হয় এবং পুরোনোদের একটি অংশ বিদায় নেয়। তবে মাটি লুট থামেনি।
অভিযোগ রয়েছে, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল কৃষক ও জমির মালিকদের টার্গেট করা হচ্ছে। তাদের রাজনৈতিক প্রভাব বা অর্থবল না থাকায় জমি রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে বহু জমি এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে আর কৃষিকাজ করা সম্ভব নয়, ঘরবাড়ি বানিয়েও থাকা সম্ভব নয়। এতে দরিদ্র ভূমিমালিকরা আরও দরিদ্র হয়েছেন। তারা এই জমি বিক্রিও করতে পারছেন না। একই সঙ্গে তৈরি হয়েছে ভূমিধসের ঝুঁকিও। রাতের আঁধারে বিভিন্ন আবাসন কোম্পানির মাটি, বালু, ইট নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ২৫ মে মোজাফফর হোসেন ভূইয়া ১৩ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, আসামিরা তার ক্রয়কৃত জমিতে অনধিকার প্রবেশ করে মাটি কেটে নিয়ে যায় এবং প্রাণনাশের হুমকি দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ভেকুসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করলেও পরে প্রভাবশালীদের চাপে তা ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবার শুরু হয় মাটি কাটা। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সময় কিছুদিন মাটি কাটা বন্ধ ছিল। গেল মার্চ থেকে ফের শুরু হয় মাটি কাটা। অভিযোগ রয়েছে, তারা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে এক রাতেই একটি আবাসন কোম্পানির জমি থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকার মাটি ও বালু কেটে নিয়ে যায়। এ বিষয়ে চলতি বছরের ১০ মার্চ রূপগঞ্জ থানায় একটি অভিযোগ দায়ের হয়। অভিযোগে ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ জনকে আসামি করা হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ এইচ এম সালাউদ্দিন বলেন, তিনি চলতি মাসেই যোগদান করেছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পুলিশ সুপার মো. মেহেদী ইসলাম বলেন, ‘আইন অনুযায়ী কৃষিজমির মাটি কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ব্যাপারে আইন কঠোর। নিজের প্রয়োজনেও মাটি কাটতে হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিতে হবে। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনটি টিম পাঠানো হয়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না। এ ধরনের অপরাধের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীও জিরো টলারেন্স, পুলিশও জিরো টলারেন্স।’ তিনি স্থানীয় ভুক্তভোগীদের আশ্বস্ত করে বলেন, কেউ অভিযোগ দিতে ভয় পেলে বা হুমকিতে থাকলে গোপনে আমাদের জানালে আমরা অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেব। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন- অভিযোগ, অভিযান, আশ্বাস- সবই আছে; নেই শুধু কার্যকর ব্যবস্থা। দেড় বছর ধরে প্রশাসনের নাকের ডগায় মাটি লুটের ঘটনা ঘটছে। অনেকে অভিযোগ দিয়েছেন, কিন্তু প্রতিকার পাননি।