মায়ের গর্ভে ১০ মাস ১০ দিন থেকে সন্তান ভুমিষ্ট হন এটা চিরায়ত নিয়ম। আবার জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম একশ দিনকে ধরা হয় হানিমুন পিরিয়ড়। এ সময়টুকু সরকারকে স্বাভাবিক গতিতে চলতে দেয়া হয়। চিরায়ত সে নিয়ম এবং সময়ের জন্য যেন কেউ অপেক্ষা করতে চাচ্ছেন না। বেনিয়া চিকিৎসা ব্যবসায় নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রায়ই সন্তানকে সিজারের মাধ্যমে ভুমিষ্ট করা হচ্ছে। অনেকটা তেমনি নতুন সরকারকে ‘হানিমুক পিরিয়ড’ সময় না দিয়েই রাজপথে নেমে অভ্যুত্থানের হুমকি দেয়া হচ্ছে।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধী দল কেউ সময়কে হেলাফেলা করতে নারাজ। বিরোধী দল যেমন নিজেদের সুবিধামতো সরকারের ভুলত্রুটি ধরে নাস্তানাবুদ করছে; তেমনি ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রি-প্রতিমন্ত্রী-এমপিরাও যেন সময়ক্ষেপণ না করেই প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। ফলে প্রায় দেড় যুগ পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ‘কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান’ দৌঁড়ে রাজনৈতিক পরিবেশ ঘোলাটে হচ্ছে।
জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে জনপ্রত্যাশা নিয়ে বিতর্কের বদলে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ‘দলীয় ইগো’ আর ‘স্বার্থের বাহাস’ চলছে। এ অবস্থায় সংসদে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরীক এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর ‘বিসিবি বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ড’ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। ‘বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ড’ বক্তব্যই গত কয়েক দিন ধরে টক অব দ্য কান্ট্রি। প্রশ্ন হচ্ছে এনসিপি নেতা কার বাপের দেয়ার প্রতি ইংগিত করেছেন?
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ইচ্ছামাফিক নির্বাচিত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ভেঙ্গে দিয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) তামিম ইকবালের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন করে। নতুন এ কমিটিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের পুত্র সাইয়্যেদ ইব্রাহিম আহমেদ, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পুত্র ইসরাফিল খসরু, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসের পুত্র মির্জা ইয়াসির আব্বাস এবং শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী স্ত্রী ব্যারিষ্টার রাশনা ইমামকে সদস্য করা হয়। এছাড়াও কমিটিতে আছেন মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, আতাহার আলী খান, তানজিল চৌধুরী, সালমান ইস্পাহানি, রফিকুল ইসলাম বাবু, ফাহিম সিনহা। কমিটির পর্যালোচনা করে দেখা যায় ১১ সদস্যের মধ্যে ৫ জনই চট্টগ্রামের।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস যেমন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে চট্টগ্রামের লোকজনকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন; নির্বাচিত সরকার বিসিবির কমিটি গঠনে সে পথ ধরেন। বিতর্ক চট্টগ্রাম কেন্দ্রীক কমিটি নিয়ে নয়; মন্ত্রীদের পুত্র ও প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রীকে অন্তভূক্তি নিয়ে তোলপাড় চলছে। প্রশ্ন হচ্ছে বিএনপি কি ভারতের বিজেপিকে অনুসরণ করছে? ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের দ্বিতীয় ব্যাক্তি অমিত শাহ’র পুত্র জয় শাহকে আইসিসি’র সভাপতি করা হয়েছে। সে দেশের ক্রিকেটে বিশেষজ্ঞদের মতে, জয় শাহ ক্রিকেটের ‘ক’ বোঝেন না। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজের পুত্রকে আইসিসির সভাপতি পদে বসিয়েছেন। অনেকটা সে রকম প্রভাব খাটিয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পুত্র-স্ত্রীকে নিয়ে বিসিবি’র অ্যাডহক কমিটি গঠন করায় গত ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রশ্ন তুলেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নবগঠিত অ্যাডহক কমিটিকে ‘বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ড’ মন্তব্য করেন।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ক্রিকেট বোর্ডসহ সারাদেশের ক্লাবগুলোতে প্রভাব বিস্তার করেন অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার তদন্তের পর সেই বোর্ড ভেঙে দিয়ে আহ্বায়ক কমিটি করা হয়েছে। এখানে বাপের দোয়া মায়ের দোয়া কমিটি করিনি।’ বিসিবি’র অ্যাডহক কমিটিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর পুত্রের অন্তভূক্তি জায়েজ করতে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসের পুত্র মির্জা ইয়াসির আব্বাসকে সুকৌশলে নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে বিএনপির অনেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। ঢাকার রাজপথে বিএনপির যে দু’চারজন গুরুত্বপূর্ণ মুখ; বিগত ১৭ বছর জুলুম-নির্যাতনের মধ্যেও ঢাকার রাজপথ কাপিয়েছেন তাদের অন্যতম হচ্ছেন মির্জা আব্বাস। নির্বাচনের পর সরকারে তার মূল্যায়ন হয়নি। বিদেশে চিকিৎসারত মির্জা আব্বাসের পুত্রকে বিসিবির অ্যাডহক কমিটিতে নিয়ে ‘খাইলাম না ছুঁইলাম না গ্লাস ভেঙ্গে জরিমানা’ প্রবাদের মতো দুর্নামের ভাগিদার করা হয়েছে। এ নিয়ে দলের নেতাদের মধ্যে চলছে চাপা ক্ষোভ। নতুন সরকারের দুই মাস পূর্তির আগেই ‘মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পুত্র-স্ত্রীকে দিয়ে বিসিবির কমিটি গঠন করে বিতর্কের সৃস্টি করা হলো কেন? যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল ইসলামের কাছে বিএনপির হিতাকাঙ্খী একজন সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক জানতে চাইলে জবাবে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বিনয়ের সঙ্গে জানান, ‘ভাই আমার ঘাড়ে কয়টা মাথা?’
‘বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ড’ বক্তব্য দেয়ার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় হাসনাত আবদুল্লাহকে নিয়ে ‘ধন্যধন্য জোয়ারে ভাসলেও’ স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে তিনি কার্যত এ মন্তব্য করেছেন। আমিনুল ইসলাম বুলবুলের কমিটি বিলুপ্ত করে তামিম ইকবালের নেতৃত্বে অ্যাডহক কমিটি গঠন এনসিপির নেতাদের স্বার্থহানির মুল কারণ। আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ক্রীড়া উপদেষ্টা পদে থেকে জেলায় জেলায় বিসিবির কাউন্সিলর নিয়োগে অনিয়ম করেছেন। তার বিতর্কিত কর্মকা- ও দুর্নীতি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে তদন্ত চলছে। ফারুক আহমদের কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে ফোন করে এনে নিয়োগ দেয়া পরর্বর্তীতে পাতানো নির্বাচন করায় ব্যপক লেনদেন ও অনিময় হয়েছে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। এমনকি সাবেক উপদেষ্টা সজীব ভুইয়া প্রভাব খাটিয়ে বিসিবির কমিটিতে ওয়েস্টিন হোটেলে হাঁসের গোশত খাওয়ার পুরস্কার স্বরুপ মো; সাখাওয়াত হোসেনকে সহ সভাপতি পদে বসিয়েছিলেন। বিসিবির সেসব অনিয়ম ওই সময় হাসনাত আবদুল্লাহ’র নজরে আসেনি। এখন তিনি প্রভাবশালী মন্ত্রীদের পুত্রদের নিয়ে অ্যাডহক কমিটি করায় রুষ্ট হয়ে কথা বলছেন।
সাবেক উপদেষ্টা সজিব ভুঁইয়ার সময় বিসিবির অনিয়ম নিয়ে টকশোর সঞ্চালক খালেদ মহিউদ্দিন বলেছেন, ‘মন্ত্রী পুত্রদের দিয়ে বিসিবির অ্যাডহক কমিটি গঠনে বিএনপি চোখের পর্দা রাখেনি। কিন্তু সাবেক উপদেষ্টা সজিব ভুইয়া যে প্রক্রিয়ায় আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে সভাপতি পদে বসিয়েছেন সেটাও ছিল অনিয়ম এবং রং সিদ্ধান্ত। এমনকি যে প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের মাধ্যমে বুলবুলকে সভাপতি করা হয় সেটাও ছিল বিতর্কিত। কোনোটিই সঠিক পথে হয়নি’। প্রভাবশালী মন্ত্রীদের পুত্রদের বিসিবির অ্যাডহক কমিটিতে নেয়ার পর বোমা ফাটিয়েছেন এনসিপি নেতা সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভুঁইয়া। তিনি বলেছেন, ‘মন্ত্রীদের পুত্র-স্ত্রীকে নিয়ে গঠিন নতুন কমিটিকে আইসিসি যাতে অনুমোদন করে সে জন্য তদবির চলছে। অবৈধভাবে বোর্ড ভাঙ্গার পর একজন কর্মকর্তা লন্ডনে অবস্থানরত বিসিবির সাবেক সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তিনি যাতে ভারতের বিজেপি নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পুত্র আইসিসির সভাপতি জয় শাহের সঙ্গে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) নেতাদের বৈঠকের ব্যবস্থা করে দেন’। সজীব ভুঁইয়ার এ বক্তব্যে পরিস্কার যে দুই প্রভাবশালী মন্ত্রীর পুত্রকে বিসিবির অ্যাডহক কমিটিতে নেয়া হয়েছে কোন খুঁটির জোরে। মন্ত্রিসভা গঠনেও ভারতের পণ্য বিরোধী আন্দোলনকরা গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের কোনঠাসা করে দিল্লিপন্থী হিসেবে পরিচিতদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
মন্ত্রীপুত্রদের দিয়ে বিসিপির অ্যাডহক কমিটি গঠন হওয়ায় বিএনপির নেতাদের মধ্যেই অসন্তোষ দেখা দিযেছে। প্রকাশ্যে এ নিয়ে কথাবার্তা না বললেও তারা মনে করেন ক্ষমতা গ্রহণের দুই মাস যেতে না যেতেই কিছু মন্ত্রী স্বজনপ্রীতি করে বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলছে। প্রভাবশালী মন্ত্রীরা নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে পরিবারের সদস্যদের পদ পদবিতে বসানোয় দল বিতর্কিত হচ্ছে এবং দলের প্রধানের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
উটিউব চ্যানেল জাহিদ’স টক এখনো সচল রেখেছেন। বিএনপি সরকার ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা প্রসঙ্গে দিয়ে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পরিকল্পিতভাবে ফ্যাসিস্ট হাসিনার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিএনপি এখন আওয়ামী লীগ হতে চায় প্রচারণা চালাচ্ছে। বিরোধী দল জামায়াত-এনসিপি ছাড়াও দেশের কিছু সুশীল বুদ্ধিজীবী এমন অপপ্রচার চালাচ্ছেন। এটা হতাশাজনক। তারেক রহমানকে ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে বানানো হচ্ছে এবং আরেকটি গণঅভ্যুত্থানের হুমকি দেয়া হচ্ছে এটা অযৌক্তিক’। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহিদ উর রহমান যতই বাস্তবধর্মী বক্তব্য দিক না কেন বিএনপি সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা বিতর্কিত কিছু করলে সে দায় প্রধানমন্ত্রীর উপর পড়ে। এটাই বাস্তবতা। জুলাই অভ্যুত্থান ঠেকাতে শেখ হাসিনা ছাত্রজনতাকে হত্যার নির্দেশনা দিয়েছিলেন আইন শৃংখলা বাহিনীকে। কিন্তু ১৪শ নিহতের সবাইকে হত্যার নির্দেশনা অবশ্যই দেননি। কিন্তু সব দায় হাসিনাকে বহন করতে হচ্ছে।
তারেক রহমানের প্রতি প্রশাসন চালাতে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানিয়ে এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলের চিত্র তুলে ধরে সাবেক সচিব বদিউর রহমান বলেছেন, ‘জিয়াউর রহমানের শাসনমালে ক্যু-পাল্টা ক্যু এসব নিয়ে আমার বক্তব্য নেই। তবে শাসক হিসেবে আমি জিয়াউর রহমানকে কাছ থেকে দেখেছি। সরকারের ছোট কর্মকর্তা হিসেবে মন্ত্রিসভার বৈঠকে আমাকে হাজির থাকতে হতো। জিয়া যে নিয়মানুবর্তিতা, সততা, ন্যায় পরায়ণতা এবং অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ছিলেন তা দেখেছি। মন্ত্রীরা যত প্রভাবশালী হোক তিনি পক্ষপাতিত্ব এবং অনিয়মকে প্রশ্রয় দিতেন না। ফলে সিনিয়র-জুনিয়র সব মন্ত্রী এবং আমলারা জিয়াউর রহমানের ভয়ে টতস্থ থাকতেন এবং অনিয়ম-স্বজনপ্রীতির কথা ভাবতে পারতেন না। তারেক রহমান যদি শাসক হিসেবে পিতা জিয়াউর রহমানের দৃঢ়তার মতো হতে পারেন তাহলে মন্ত্রী-এমপিরা যতই প্রভাবশালী হোক অনিময়-অন্যায় ও স্বজনপ্রীতি করার সাহস দেখাতে পারবেন না; তার ইমেজও ক্ষুন্ন হবে না’।
বিএনপি দেশের সবচেয়ে বড় এবং জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। জাতীয় সংসদের প্রতিটি আসনে দলটির ৫ থেকে ১০ জন এমপি হওয়ার মতো যোগ্য নেতানেত্রী রয়েছেন। কিন্তু সিনিয়র কয়েকজন নেতা এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেদের পাশাপাশি তাদের পুত্র-কন্যা-স্ত্রীদের দলীয় প্রার্থী করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে ‘এক পরিবারে একজন প্রার্থী দুইজনকে নমিনেশন নয়’ কঠোর সিদ্ধান্ত নেন। এ সিদ্ধান্তে দু’চারজন সিনিয়র নেতা মনোক্ষুন্ন হলেও সর্বমহলে প্রশংসিত হয়। নির্বাচনে ভূমিধ্বস বিজয়ের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর সিনিয়র মন্ত্রীদের কারো কারো বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এখন ওপেন সিক্রেট। ফলে সংরক্ষিত নারী আসনে ১২ মে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে কারা মনোনয়ন পাচ্ছেন তা নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা-বিতর্ক। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী মনোয়ন দাখিলের শেষ তারিক ২১ এপ্রিল। প্রার্থীতা প্রত্যাহারের শেষ তারিক ২৯ এপ্রিল। সংরক্ষিত আসনের হিসেবে অনুযায়ী বিএনপি ৩৬টি আসন পাবে। ইতোমধ্যেই এসব আসনে এখন পর্যন্ত ১০২৫ জন মনোনয়ন প্রত্যাশী আবেদন পত্র ক্রয় করেছেন। তারা এমপি হওয়ার জন্য প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপিদের পিছনে ঘুরছেন এবং তদবির করছেন। সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নে বিরোধী দল জামায়াত এতোমধ্যেই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেতাকর্মীদের জানিয়ে দিয়েছে। যারা এমপি হয়েছেন সে পরিবার থেকে কাউকে সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি মনোনয়ন দেয়া হবে না। জামায়াতের এ সিদ্ধান্ত প্রশংসিত হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নে বিএনপি কি করবে? সংরক্ষিত নারী আসনে প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপিদের পরিবারের সদস্য ও পছন্দের নেত্রীদের অগ্রাধিকার দেবে, নাকি বিগত ১৮ বছর জুলুম-নির্যাতনের মধ্যেও রাজপথে লড়াই করা পরীক্ষিত, দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ যোগ্য নেত্রীদের মনোনয়ন দেবে? সর্বত্রই এখন সে আলোচনা চলছে।
প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং সুবিধাবাদী নেতানেত্রীরা যে যাই বলুক না কেন বিসিবির অ্যাডহক কমিটিতে নির্জজ্জভাবে মন্ত্রীদের পুত্রদের নিয়োগ দেয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হয়তো জানতেন না। কিন্তু ঘটনার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় হৈচৈ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুনাম ও মর্যাদা ক্ষুন্ন করেছে। ১৭ বছর পর দেশে ফিরে যুক্তরাষ্ট্রের মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম’ উক্তি উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেছিলেন ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’। লাখো জনতার উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘দেশ পুনর্গঠনে আমার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে। এ দেশের সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আমি সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব। আর এই লক্ষ্য অর্জনে আপনাদের প্রত্যেককে কাজ করতে হবে।’ তিনি ত্রায়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী প্রচারণায় ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শ্লোগান দিয়ে মানুষকে ঐকবদ্ধ করেছিলেন। মানুষ তারেক রহমানকে মর্যাদা দিয়েছেন ভোটের মাধ্যমে। ফলে তারেক রহমানের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা এখন আকাশচুম্বি। সবার আগে অফিসে উপস্থিতি, নির্বাচনের অমোচনীয় কালি শুকানোর আগেই ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড বিতরণ শুরু এবং কৃষিতে সেচ নিশ্চিত করতে খালকাটা কর্মসূচিসহ অনেকগুলো সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করে তারেক রহমান প্রশংসিত হয়েছেন। কিন্তু সরকার গঠনের দ্ইু মাস না হতেই বিরোধী দল বিএনপিকে ‘জুলাই সদন বিরোধী’ এবং ‘সংস্কার বিরোধী’ ট্যাগ দিয়ে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে সরকারের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্থ করার চেষ্টা করছে জামায়াত-এনসিপি। কিছু গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সুশীলদের একটা অংশ তাতে ইন্ধন দিচ্ছেন এবং বিএনপির বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছেন। সংসদের বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে ফের গণঅভ্যুত্থানের হুমকি দিয়ে রাজপথে নামার কর্মসূচি দিয়েছে। এ অবস্থায় তারেক রহমানকে পিতা-মাতার মতোই দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু নতুন সরকারের হানিমুন পিরিয়ড়ের মাঝপথেই দাবি দাওয়ার নামে বিরোধী দল একদিকে নানামুখি সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করছে; অন্যদিকে সরকার গঠনের দুই মাস যেতে না যেতেই মন্ত্রিসভার দু’চারজন মন্ত্রীর কা-জ্ঞানহীন বক্তব্য এবং স্বজনপ্রীতি বিরোধী দলকে উষ্কে দিচ্ছে। ১৮ কোটি মানুষের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারেক রহমান যখন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তখন প্রভাবশালী দু’চারজন মন্ত্রী স্বজনপ্রীতি ও বিতর্কিত কর্মকা- বিএনপিকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? বিএনপিকে ডোবাতেই কি এমন বিততির্ক কর্মকা- করা হচ্ছে?