Image description
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ বাতিল

বাতিল হওয়া গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশটি এতটাই জনগুরুত্বপূর্ণ যে এটি নতুন করে আইনে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত সরকারের ওপর চাপ বাড়তেই থাকবে। কারণ জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে ভিন্নমত দমনের অন্যতম হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। শুধু গুমের ভয়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরাসহ বেশির ভাগ মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নামা তো দূরের কথা, কোনো রকম প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে পারেননি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মৌলিক স্পিরিট ছিল এই গুমের বিরুদ্ধে। ফলে এই গুম প্রতিরোধ ইস্যুটি এখন জনদাবিতে পরিণত হয়েছে। এছাড়া এ কারণে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ২০ দিনের মাথায় এ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনে স্বাক্ষর করে। অর্থাৎ বিএনপি সরকারকে যত দ্রুত সম্ভব এ আইন প্রণয়ন করতেই হবে। যত বিলম্ব হবে, তত এ অধ্যাদেশসহ আরও অন্তত গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি অধ্যাদেশ নিয়ে সাধারণ মানুষের দাবি দিন দিন জোরালো হবে। বিষয়টি নিয়ে যুগান্তরের কাছে এমন মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ।

এদিকে বিরোধী দলও বলছে, গুমের মতো মৌলিক সংস্কারে সরকার আগ্রহী নয়। তারা আগের সরকারের মতো মানুষকে ভয় দেখাতে চায়। ফলে তারা গুমের আইন পাশ করেনি। যদিও সরকার ভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করে বলছে, তারা আইনটিকে আরও শক্তিশালী করে সংসদে উত্থাপন করতে চায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশটির ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্ত এখনো পরিষ্কার নয়। একবার বলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আইনে গুমের বিচার করবে। আবার বলা হচ্ছে-অধ্যাদেশটি আপাতত বাতিল হলেও পরবর্তীতে আরও শক্তিশালী করে সংসদে উত্থাপন করা হবে। কিন্তু কবে এবং কীভাবে উত্থাপন করা হবে তা নিশ্চিত নয়। ফলে এ বিষয়ে জনমনে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তাই সরকারের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে অথবা জরুরিভিত্তিতে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিষয়গুলো পরিষ্কার করা উচিত। তাদের মতে, জনআকাঙ্ক্ষার এসব মৌলিক সংস্কারে সরকার ব্যর্থ হলে স্বৈরাচার ফিরে আসবে।

জানতে চাইলে সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, যে অধ্যাদেশগুলো বাতিল হয়েছে, এগুলোই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করার ব্যাপারে তাদের (সরকারের) এই অনীহা এবং সংস্কারের টালবাহানা একটি অশনিসংকেত। তিনি বলেন, আমরা আগে জানতাম গুম হয় দক্ষিণ আমেরিকাতে। বাংলাদেশে গুম হয় সেটা জানা ছিল না। কিন্তু গত সরকারের আমলে বাংলাদেশে সেটি চালু হয়। একপর্যায়ে এটি মারাত্মক আকার ধারণ করে। এ কারণে এটি চিরতরে বন্ধ করতে আইনি কাঠামো দরকার। সেই কাঠামোর জন্যই গুম অধ্যাদেশ জারি করা হয়। তিনি আরও বলেন, এই অধ্যাদেশ আইনে রূপ নিলে গুম কমিশন গঠনের নিশ্চয়তা পাওয়া যেত। নিশ্চিত করা সম্ভব হতো ক্ষমতার ভারসাম্য, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকার। সরকার বলছে, তারা এগুলো পরবর্তী সময়ে উত্থাপন করবে। কিন্তু কবে এবং কী রকম পরিবর্তন করবে, তা নিশ্চিত নয়। তার মতে, বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো ও আইনের সীমাবদ্ধতাই শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচারে পরিণত করেছিল। এগুলো অব্যাহত থাকলে পরবর্তী এই সরকারেরও স্বৈরাচারে পরিণত হওয়ার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বদিউল আলম মজুমদার বলেন, পুরোনো পথে হেঁটে নতুন গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে না। ‘বহু মানুষের আত্মত্যাগ ও রক্তের ওপর আমরা দাঁড়িয়ে আছি। মৌলিক সংস্কারে ব্যর্থ হলে আমরা স্বৈরাচারের ফিরে আসার সুযোগ করে দেব। রক্তের ঋণ শোধ করতে ব্যর্থ হব, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ’

আওয়ামী লীগের আমলে দেশে গুম ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ওই সময়ে সরকারের শীর্ষ মহলের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিরোধী দলের নেতাদের গুম করে। এ সময় গুম করা ব্যক্তিদের লুকিয়ে রাখতে ‘আয়নাঘর’-এর মতো ভয়ংকর আস্তানা তৈরি করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর একটি গুম কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। ওই কমিশনের রিপোর্টের আলোকে গুম থেকে দেশের সব নাগরিককে সুরক্ষা দিতে আইনি কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এতে গুমকে সংজ্ঞায়িত করা হয় ‘চলমান অপরাধ’ হিসাবে। গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয় মৃত্যুদণ্ড। এছাড়াও গুমের অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তির স্থাবর, অস্থাবরসহ সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার বিধান রাখা হয়। অধ্যাদেশে বলা হয়, ‘এ অধ্যাদেশের অধীন শাস্তিযোগ্য কোনো অপরাধ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা অথবা যে কোনো জরুরি পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে অথবা সরকারি বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ বা নির্দেশ মোতাবেক করা হইয়াছে এইরূপ অজুহাত অগ্রহণযোগ্য হইবে।’ অধ্যাদেশে আরও বলা হয়, গুমের বিচারে একটি কমিশন গঠিত হবে। এই কমিশনকে আইনে অবারিত ক্ষমতা দেওয়া হয়।

এদিকে নির্বাচনের পর বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে জনগুরুত্বপূর্ণ ২০টি অধ্যাদেশ আইনে রূপ দেয়নি। এর মধ্যে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ অন্যতম। ফলে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে যায়। তবে সরকার বলছে, তারা গুমের অপরাধকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) আওতায় বিচার করবে।

এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, গুম কমিশন অধ্যাদেশ নিয়ে কথা এসেছে। কিন্তু গুম কমিশন অধ্যাদেশে যা আছে, তা হুবহু পাশ করলে যারা গুম হয়েছেন, তাদের প্রতি অবিচার করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমি নিজে গুমের শিকার। তাই আমি গুমের আইন শক্তিশালী করতে চাই।’ এ কারণে আমরা এখন গুমের বিচার আইসিটি আইনে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই আইনে গুমের অপরাধের শাস্তি ২০ বছর কারাদণ্ড। মামলার পর দ্রুত তদন্ত হয়। কারণ, এখানে তদন্তের জন্য ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি আছে। কিন্তু গুম কমিশনে এসব নেই। সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, গুম কমিশন অধ্যাদেশের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, অপরাধের তদন্ত করবে মানবাধিকার কমিশন। তদন্ত শেষে এক থেকে দেড় বছর পর রিপোর্ট দেবে। তারপর মামলা হবে নিু আদালতে। কিন্তু আইসিটি বর্তমানে হাইকোর্ট ডিভিশনের মর্যাদা পাচ্ছে। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এখন বলেন, কোনটা ভালো?’ অপরদিকে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান শুক্রবার সংসদে বলেন, বাতিল হওয়া ১৬টি অধ্যাদেশকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করতে পর্যালোচনার মধ্যে রাখা হয়েছে। বিরোধী দলের সঙ্গে পরার্মশ শেষে এগুলো পরে উত্থাপন করা হবে।

গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী শনিবার যুগান্তরকে বলেন, সরকার কেন এমনটা করল বুঝলাম না। যদি সংশোধন আনতে চায়, তাহলে এটা ‘এজ ইট ইজ’ (যেমন আছে তেমন) রেখে পরে সংশোধনী আনতে পারত। অর্থাৎ এখন এটা অনুমোদন করে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা যেত। তিনি বলেন, এই অধ্যাদেশ পাশ হলে আরও ভালো হতো। কারণ, এটা নিয়ে অনেকেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে (কনফিউজড) আছেন।

 তার মতে, আইসিটিতে যে গুমের বিচারের কথা বলা হয়, ওই গুম হলো মানবতাবিরোধী অপরাধ। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গুমের যে অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল, সেটি ছিল আলাদা বিষয়। এটি আলাদা হওয়ার কারণ হলো-বাংলাদেশ ইতোমধ্যে গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনে (ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব অল পার্সনস ফ্রম এনফোর্সড ডিজএপিয়ারেন্স) সই করেছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট এতে সই করেন। এর ফলে অভ্যন্তরীণ আইনে গুমের সংজ্ঞায় পরির্বতন আনা বাংলাদেশ সরকারের ওপর একটা দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার বলছে, এটা নিয়ে আমরা পরে কাজ করব, কিংবা চিন্তাভাবনা করে পরে করব। এগুলো রাজনৈতিক (পলিটিক্যাল) ব্যাপার। আমি রাজনীতিক (পলিটিশিয়ান) না। তবে আমি এতটুক বলতে পারি, এই অধ্যাদেশটা অনুমোদন হলে সবার জন্যই ভালো হতো।

সংসদে বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি কোনো ধরনের সংস্কার করছে না। গুম প্রতিরোধ আইনের মতো মৌলিক সংস্কারে তাদের আগ্রহ নেই। বিরোধী দল হিসাবে সংসদে আমরা এ বিষয়ে কথা বলেছি। কিন্তু তারা আমলে নেয়নি।

জানতে চাইলে গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস যুগান্তরকে বলেন, অধ্যাদেশ বাতিলের কাজটি মন্দ হলো। কারণ, এটি বাতিল হওয়ার পর দেশের ফৌজদারি আইনে গুমের কোনো সংজ্ঞাই আর থাকছে না। ওনারা (সরকার) সংসদে গুম অধ্যাদেশ থাকাটাকে ‘বালখিল্যতা’ বলেছেন। তিনি বলেন, আইসিটি আইন নিয়ে কথা আসছে। কিন্তু ওই আইনে শুধু মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করা যায়। ফৌজদারি অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন গুমের বিচার আইসিটি করতে অক্ষম। তারা চাইলেও এটি করতে পারবে না। তিনি বলেন, সরকার বলেছে আইসিটিতে তদন্ত কমিটি, প্রসিকিউশন-সবই আছে। তাহলে আলাদা কমিশন করার দরকার কী? কিন্তু বাস্তবে কাল যদি কেউ গুম হয় এবং সেই অভিযোগ আইসিটিতে গেলে তারা বলবে, আমাদের কিছু করার নেই। কারণ, তাদের সেই ক্ষমতাই নেই। ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, আমার মনে হয়, সংসদে মন্ত্রীরা এটি বুঝতে পেরেছেন, সাধারণ মানুষ হয়তো ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ এবং ‘ফৌজিদারি অপরাধের’ মধ্যে পার্থক্য বোঝে না। তাদের এই অজ্ঞতার সুযোগ নেওয়া হচ্ছে। আইনি জটিলতা তাদের (সাধারণ মানুষ) জানার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে দুটি (আইসিটি এবং অধ্যাদেশে উল্লেখিত কমিশন) আলাদা বিষয়।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, হত্যা আর গণহত্যা যেমন আলাদা, তেমনই গুম আর গণহারে গুমও আলাদা। আপনি গণহারে গুমের বিচার আইসিটিতে করতে পারবেন। কিন্তু সেখানে বিচ্ছিন্ন গুমের বিচার করা যায় না। তিনি আরও বলেন, গণহারে গুম তখনই প্রমাণ করা সম্ভব, যখন পুরো ঘটনা সমাপ্ত হয়। যেমন: শেখ হাসিনার পতন হলো, এখন বলতে পারছেন আপনার কাছে গণহারে গুমের প্রমাণ আছে। কিন্তু গুমের মতো একটি অপরাধ, যা লুকিয়ে করা হয়, সেই অপরাধ চলাকালীন এতগুলো প্রমাণ পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে যে সরকার গুম করেছে, সেই সরকারই আপনাকে প্রমাণ নিয়ে আইসিটিতে মামলা করতে দেবে না। ওই প্রমাণ নিয়ে যাওয়ার আগেই আপনাকেও গুম করে ফেলবে।