Image description
বিদেশি এয়ারলাইন্সে তেল বিক্রিতে কারসাজি

রাষ্ট্রায়ত্ত পদ্মা অয়েল কোম্পানি ও বিদেশি ব্যাংকের যোগসাজশে বিদেশি এয়ারলাইন্সের কাছে জেট ফুয়েল বিক্রিতে কারসাজির কারণে ঠকছে রাষ্ট্র। নিয়ম অনুযায়ী জেট ফুয়েল বিক্রির অর্থ দেওয়া হয় ডলারে। কিন্তু পদ্মা অয়েল সেই ডলার বিক্রি করে টাকায় বিল দেয় বিপিসিকে। বিপিসি আবার সেই টাকায় ডলার কিনে তেল আমদানি করে। বারবার এভাবে ডলার বিক্রি ও কেনার কারণে প্রতি লিটারে ক্ষতি হচ্ছে ২ টাকা হারে। দৈনিক গড়ে ১ হাজার ৬০০ টন জেট ফুয়েল বিক্রি হয় দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্সে। এ হিসাবে গত ১ বছরে ৩ লাখ ৭৭ হাজার টনের বিপরীতে রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধন হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। এই ক্ষতি বিবেচনা করে ডলার অ্যাকাউন্টে লেনদেনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পদ্মা অয়েল। খবর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রের। তথ্যমতে, বিদেশি এয়ারলাইন্সে ডলারে জ্বালানি তেল (জেট ফুয়েল) বিক্রি করেও সেই ডলার নেয় না পদ্মা অয়েল কোম্পানি। ডলারের পরিবর্তে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে সেই টাকায় পদ্মা অয়েল দেনা শোধ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি)। সরকারি প্রতিষ্ঠান বিপিসি আবার সেই টাকা দিয়ে ডলার কিনে বিদেশ থেকে তেল আমদানি করে। এভাবে ডলারকে টাকা এবং টাকাকে ডলারে পরিণত করে পদ্মা অয়েল এবং বিদেশি কয়েক ব্যাংকের কর্মকর্তার একটি চক্র গত ১ বছরে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বিপিসির কাছ থেকে। যার পরিমাণ প্রায় কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা।

এদিকে, বিদেশি এয়ারলাইন্সে জেট ফুয়েল বিক্রিতে কারসাজির ঘটনাটি সামনে আসার পর নড়েচড়ে বসেছে বিপিসি ও পদ্মা অয়েল কোম্পানি। তারা এখন বিদেশি এয়ারলাইন্সের ডলারের বিল সরাসরি সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে করে প্রতিবছর সরকারের কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি-বিইআরসির ঘোষণা অনুযায়ী এখন বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোকে প্রতি লিটার জেট ফুয়েল কিনতে হয় ১ দশমিক ৪৮ ডলারে।

পদ্মা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মফিজুর রহমান শনিবার যুগান্তরকে বলেন, এতদিন তেল বিক্রির ডলার ভাঙিয়ে টাকা নেওয়া হতো। এখন থেকে ডলার বিপিসির অ্যাকাউন্টে সরাসরি পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা আছে। বিদেশি এয়ারলাইন্সকে তেল বিক্রির দিনেই বিপিসির অ্যাকাউন্টে ডলার পাঠিয়ে দিতে হবে। কিন্তু পদ্মা অয়েল ওই এয়ারলাইন্স থেকে বিল পাবে আরও কয়েক দিন পর। কিন্তু ডলারের দাম তো এক থাকে না। কমবেশি হয়। এই কমবেশির লাভ-ক্ষতির দায়ভার তখন কে নেবে।

যদিও বিপিসির শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, এগুলো সমস্যা নয়। মূল সমস্যা হলো ডলারে বিক্রি করে সেই ডলার বিপিসির অ্যাকাউন্টে জমা করার সিদ্ধান্ত ঠিকমতো কার্যকর করা।

এসবিএসি ব্যাংকের গুলশান শাখার ম্যানেজার আনোয়ারুল কবীর শনিবার যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি খুবই সহজ। বাংলাদেশের গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা ‘বায়ার’র কাছ থেকে এফসি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ডলারে বিল পেয়ে সেই ডলার তার অ্যাকাউন্টে রেখে দেন। ফ্যাক্টরির খরচ চালাতে কিছু ডলার টাকায় পরিণত করেন। বাকি ডলার তার অ্যাকাউন্টে রেখে দিয়ে ব্যাক টু ব্যাক এলসি করেন। তা দিয়ে পোশাকের জন্য বিভিন্ন মালামাল আমদানি করেন। এতে করে ওই গ্রাহককে নতুন করে ডলার কিনতে হচ্ছে না। পদ্মা অয়েল বা বিপিসি এ ক্ষেত্রে ডলারকে টাকা আবার টাকাকে ডলার করে দেশের বড় ক্ষতি করছে-মন্তব্য করেন এই কর্মকর্তা।

দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর কাছে প্রতিদিন দৈনিক যে পরিমাণ জেট ফুয়েল বিক্রি হয় তার মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ তেল বিক্রি হয় দেশীয় এয়ারলাইন্সে। বাকি তেল বিক্রি হয় ৩০টির বেশি বিদেশি এয়ারলাইন্সের কাছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো স্ট্যান্ডার্ড চার্টাড ব্যাংক-এসসিবি, এইচএসবিসি এবং সিটি ব্যাংক এনএর মাধ্যমে ডলারে তেল কেনার বিল পরিশোধ করে। বিপিসির বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েলই কেবল জেট ফুয়েল বিক্রি করে এয়ারলাইন্সগুলোতে। অথচ পদ্মা অয়েলের কোনো এফসি (ফরেন কারেন্সি) অ্যাকাউন্ট নেই। তাই তারা বিদেশি এয়ারলাইন্সের ডলার ওই দিনের টিটি ক্লিন (টেলিগ্রাফিক ট্রান্সফার) রেটে (বর্তমানে টিটি ক্লিন প্রতি ডলার ১২২ দশমিক ২০০ টাকা হারে) বিদেশি ব্যাংকগুলোর কাছে। যার পরিমাণ বছরে ৫০ কোটি ডলারের মতো। সেই টাকা পদ্মা অয়েল পাঠিয়ে দেয় বিপিসির কাছে। বিপিসি প্রতিবছর কমপক্ষে ৬০০ কোটি ডলারের জ্বালানি তেল আমদানি করে। এই তেল আমদানির সময় বিপিসি আবার বিদেশি বা অন্য কোনো ব্যাংক থেকে বিসি (বিলস ফর কালেকশন) সেলিং রেটে ( বর্তমানে প্রতি ডলার ১২৩ দশমিক ২৫০০ ডলার হিসাবে) ডলার কিনে থাকে। বিপিসি হিসাব করে দেখেছে, এভাবে জেট ফুয়েলে প্রতি লিটারে ডলার বিক্রি এবং পুনরায় ক্রয়ে সরকারের লোকসান হয় ২ টাকা হারে। বছরে ১ লাখ টনের বেশি দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্সে জেট ফুয়েল ব্যবহার হয়। যার পুরোটাই আমদানি করে বিপিসি।

বিপিসি গত ১ বছরে বিদেশি এয়ারলাইন্সে তেল বিক্রি করেছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার টনের বেশি। এই হিসাবে ১ বছরেই লোকসান হয়েছে ১০০ কোটি টাকার মতো।

অভিযোগ আছে, বিদেশি ব্যাংক এবং পদ্মা অয়েলের কয়েক কর্মকর্তা মিলে ডলারগুলো টাকায় পরিণত করার ব্যবসা করছেন। বিদেশি এয়ারলাইন্সের কাছে তেল বিক্রির ডলার যাতে সরাসরি বিপিসির অ্যাকাউন্টে যায় সেই সিদ্ধান্ত নিতে ২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর একটি জরুরি সভা হয়েছিল। সভায় সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক আলী আশরাফ তার ব্যাংকে এফসি (ফরেন কারেন্সি) অ্যাকাউন্ট খুলে বিদেশি গ্রাহককে (এয়ারলাইন্স এবং জাহাজ) তেল বিক্রির মূল্য ডলারে সংগ্রহের জন্য পরামর্শ দেন। কিন্তু ২০২১ সালের পর এ বিষয়ে আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এরপর নানা বাহানা দেখিয়ে বিদেশি এয়ারলাইন্সে বিল টাকায় নেওয়া হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে বিপিসির বাণিজ্যিক শাখা থেকে এ বিষয়ে আবার তাগাদা দেওয়া হয়। শুরু হয় নড়াচড়া। বিপিসির অর্থ বিভাগ থেকে এ ব্যাপারে তাগাদা দেওয়া হয় হিসাব বিভাগকে।

২৩ অক্টোবর বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ এসসিবিকে এক চিঠি দিয়ে জানান, এখন থেকে বিদেশি এয়ারলাইন্সে তেল বিক্রির ডলার বিপিসির এফসি অ্যাকাউন্টে জমা হবে। এ ক্ষেত্রে এসসিবি বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা নেবে। চিঠিতে আরও বলা হয়, সোনালী ব্যাংক শহীদ আবরার ফাহাদ করপোরেট শাখায় বিপিসির একটি এফসি অ্যাকাউন্ট আগে থেকেই আছে। বিদেশি এয়ারলাইন্সের ডলার স্থানান্তর করতে ওই এফসি অ্যাকাউন্টের পরিবর্তে অন্য কোনো এফসি অ্যাকাউন্টের দরকার হলে এসসিবি বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেবে।

বিপিসির ওই চিঠির পর ২৭ অক্টোবর এসসিবি জানায়, বিদেশি এয়ারলাইন্সের তেল বিক্রির ডলার বিপিসির অ্যাকাউন্টে সরাসরি পাঠাতে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এতে তারা কিছু শর্ত জুড়ে দেয়।

বিদেশি এয়ারলাইন্সের ডলার এত দিন কেন সরাসরি বিপিসির অ্যাকাউন্টে জমা হয়নি-এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে এসসিবির পরিচালক (ব্যাংকিং লেনদেন) মোহাম্মদ সোহাইব কথা বলতে রাজি হননি।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক ফারজানা রহমান ৮ মার্চ এক চিঠি দিয়ে বিপিসির নামে একটি এফসি অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমতি দেন। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, বিপিসির এফসি অ্যাকাউন্ট থেকে তেল আমদানির বিল পরিশোধ করা যাবে। এ ব্যাপারে বারবার চেষ্টা করেও বিপিসির পরিচালক (অর্থ) নাজনীন পারভীনের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।