দেশের আমদানি ব্যয় বাড়ছে। একই সময়ে কমে যাচ্ছে রপ্তানি আয়। এতে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) পণ্য বাণিজ্যে সার্বিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৯১ কোটি ৩০ লাখ (প্রায় ১৭ বিলিয়ন) ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। এটি গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২৩.৪০ শতাংশ বেশি। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৭০ কোটি ৬০ লাখ (১৩.৭০ বিলিয়ন) ডলার। আগের মাস জানুয়ারি শেষে যেখানে ঘাটতি ছিল ১৪ বিলিয়ন ডলারের নিচে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ব্যালান্স অব পেমেন্টস (বিওপি) সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূলত আমদানি বৃদ্ধি ও রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার কারণে এ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতিকে উদ্বেগজনক বলছেন অর্থনীতিবিদরা। যুদ্ধের কারণে আগামী দিনগুলোতে এই ঘাটতি আরও বাড়বে। সবমিলিয়ে পরিস্থিতি খারাপের দিকেই যাচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকট কেটে যাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। বরং তা আরও গভীর ও দীর্ঘ হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে আমদানি ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ৬১৭ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৪ হাজার ৩৭৪ কোটি ডলার। আমদানি বেড়েছে ৫.৬০ শতাংশ। একই সময়ে রপ্তানি ২.৬০ শতাংশ কমে ২ হাজার ৯২৬ কোটি ডলারে নেমেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয় ৩ হাজার ৪ কোটি ডলার। এতে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ১ হাজার ৬৯১ কোটি ডলার হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৩৭১ কোটি ডলার। এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৩২১ কোটি ডলার। আগের মাস জানুয়ারি পর্যন্ত ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৩৭৮ কোটি ডলার। আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে ৩১৩ কোটি ডলার।
এদিকে বিপুল অঙ্কের এই বাণিজ্য ঘাটতির প্রভাবে চলতি হিসাবে ঘাটতি বেড়েছে। রেমিট্যান্সে উচ্চ প্রবৃদ্ধির পরও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আট মাস (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) শেষে চলতি হিসাবে ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ সময়ে রেমিট্যান্সে উচ্চপ্রবাহ না থাকলে চলতে হিসাবের পরিস্থিতি খুব খারাপ হতে পারতো। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রবাসীরা ২ হাজার ২৪৫ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ১ হাজার ৮৪৯ কোটি ডলার। এর মানে এ সময়ে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৩৯৬ কোটি ডলার বা ২১.৪৪ শতাংশ। সবমিলিয়ে চলতি হিসাবে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০০ কোটি ডলার। আগের মাস জানুয়ারি পর্যন্ত যেখানে ঘাটতি ছিল মাত্র ৩২ কোটি ডলারের কম। অবশ্য আগের বছরের একই সময়ে চলতি হিসাবে ঘাটতি ছিল ১৪৭ কোটি ডলার।
আর্থিক হিসাবে ২২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে উদ্বৃত্ত ছিল ২৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার। আগের মাস জানুয়ারি পর্যন্ত উদ্বৃত্ত ছিল ২০ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এ সময়ে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ কমে ৮৭ কোটি ডলার এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ১০৬ কোটি ডলারের বেশি। বিদেশি অনুদান আগের বছরের ২১১ কোটি ডলার থেকে কমে এবার ৭১ কোটি ডলারে নেমেছে। আবার মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ঋণ প্রায় ২৮ শতাংশ কমে ২৭৯ কোটি ডলারে নেমেছে। অবশ্য বিভিন্ন এলসির বিপরীতে ট্রেড ক্রেডিট বেড়েছে। প্রথম ৮ মাসে ট্রেড ক্রেডিট নিয়েছে ২৫৬ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যেখানে ১১৩ কোটি ডলার। সবমিলিয়ে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত ঠেকেছে ৩৪৩ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যেখানে ঘাটতি ছিল ১১৬ কোটি ডলার। এর প্রভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটা স্বস্তিদায়ক অবস্থানে আছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৪.৬৫ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। আর বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯৯৫ কোটি ডলার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে ঋণের নামে ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে বিদেশে পাচার কিংবা অনিয়ম-দুর্নীতির টাকা বিদেশে নেয়ার সুযোগ কমে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় এলসির আড়ালে পাচার হচ্ছে কিনা তদারকি অব্যাহত রেখেছে। এসব কারণে হুন্ডিপ্রবণতা কমে এসেছে। এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে প্রচুর ডলার কিনছিল। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে গত এক মাস ধরে আর কিনছে না।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, আমাদের দেশের বাণিজ্য ঘাটতির অন্যতম কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট। বিশেষত, ইরান যুদ্ধ এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
অর্থনীতির গবেষক বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, এমনিতেই বাংলাদেশের অর্থনীতি সংকটের মধ্যদিয়ে যাচ্ছিলো। অর্থনীতির প্রধান দুই সূচক রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ায় সংকট কেটে যাওয়ার একটা আভাস পাওয়া যাচ্ছিলো। কিন্তু টানা আট মাস রপ্তানি আয় কমায় চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলো। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভূমিকম্পের মতো ধাক্কা দিতে পারে। মূলত দেশের আমদানি আগের চেয়ে বেড়েছে। তবে রপ্তানি আশানুরূপ হচ্ছে না, এই দু’টির ঘাটতির কারণে বাণিজ্য ঘাটতি আগের চেয়ে বেশি বেড়েছে।
জাহিদ হোসেন বলেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অন্যতম বড় ভূরাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। এর ফলে বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এই যুদ্ধের কারণে আমাদের অর্থনীতি মূলত তিনটি মাধ্যমে আঘাত পেতে পারে, যথাক্রমে জ্বালানি, ডলার এবং বাণিজ্য।
এই যুদ্ধের প্রভাব কতোটা হবে তা নির্ভর করবে যুদ্ধের তীব্রতা এবং কতোদিন স্থায়ী হয় তার ওপর। মূল প্রশ্ন শুধু ধাক্কার মাত্রা কতো বড় তা নয়; বরং এটি কতোদিন স্থায়ী হয় সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ যত দীর্ঘ সময় ধরে চলবে, ক্ষতির পরিমাণ তত বেশি হবে বলে মনে করেন জাহিদ হোসেন।