Image description
অনলাইনে ক্লাস চান না শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা

অনলাইন ক্লাসের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চালু রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা। তাদের মতে, অনলাইন শিক্ষায় ডিভাইস-সংকট, ইন্টারনেট ব্যয় ও পাঠে মনোযোগ ধরে রাখার সীমাবদ্ধতা যেমন রয়েছে, তেমনি মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট অতিরিক্ত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের মধ্যে আসক্তি বাড়ানোর ঝুঁকিও রয়েছে। গত ৮ এপ্রিল বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখার উপায় নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণকারীরা শিক্ষামন্ত্রীর সামনে এসব উদ্বেগ তুলে ধরে সরাসরি ক্লাস চালু রাখার পক্ষে জোরালো মত দেন। বৈঠক সূত্র ইত্তেফাককে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এক গবেষণায় উঠে এসেছে, করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ১৫ মাসে (ক্লাস হয়েছিল অনলাইনে) অন্তত ১৫১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। এর মধ্যে ৭৩ জন স্কুল শিক্ষার্থী, ৪২ জন বিশ্ববিদ্যালয়-মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী, ২৭ জন কলেজ শিক্ষার্থী ও ২৯ জন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের বেশির ভাগের বয়স ১২ থেকে ২০ বছরের মধ্যে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে তিন দিন অফলাইন ও তিন দিন অনলাইন ক্লাস চালুর ঘোষণা দিয়েছে।         

তবে শুধু কলেজ শাখার জন্য এটি প্রযোজ্য বলে জানায় কলেজ কর্তৃপক্ষ। গতকাল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম স্বাক্ষরিত এক নোটিশে এ তথ্য জানানো হয়েছে। রাজধানীতে বেইলী রোডে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শাখা অবস্থিত। এছাড়া ধানমন্ডি, আজিমপুর ও বসুন্ধরায় তিনটি শাখা রয়েছে। নোটিশে বলা হয়, কলেজ শাখার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আজ রবিবার থেকে তিন দিন অফলাইন (শনিবার, সোমবার ও বুধবার) ও তিন দিন অনলাইন (রবিবার, মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার) ক্লাস কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হবে। অনলাইন ক্লাসের রুটিন এবং ক্লাসে যুক্ত হওয়ার লিংক স্ব স্ব শ্রেণি শিক্ষকের মাধ্যমে ক্লাস গ্রুপে জানিয়ে দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো বলে নোটিশে বলা হয়। জানা গেছে, চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মহানগরীর স্কুল-কলেজে অনলাইন ক্লাস চালুর ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তবে স্পষ্ট নির্দেশনা ছাড়াই বিভিন্ন স্কুল-কলেজে এটি কার্যকর হতে যাচ্ছে। এর ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যে দোটানার সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও অনলাইন, আবার কোথাও সশরীরে ক্লাসের সিদ্ধান্তের কারণে শিক্ষার ধারাবাহিকতা ও মান নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, পরিকল্পনা এবং স্পষ্ট নির্দেশনার অভাবে এমন উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখন ঘাটতি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিক্ষাবিদরা।

এদিকে অনলাইন ক্লাস নিতে না চাওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শনিবার খোলা থাকবে কি না; সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর মেলেনি। যদিও শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন দাবি করেছেন, যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইনে ক্লাস নেবে না, তাদের জন্য ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তারা নির্দেশনা অনুযায়ী শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করবে। তবে ঢাকা, রাজশাহী, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের অন্তত ১৫টি স্কুল ও কলেজের শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনলাইন ক্লাসে না যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ কিংবা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাননি তারা। এতে করে অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে, যা সামগ্রিকভাবে শিক্ষাব্যবস্থায় সমন্বয়হীনতা তৈরি করছে। অনলাইন ক্লাস নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় শিক্ষার্থীরাও পড়েছে দোটানায়। অধিকাংশ শিক্ষার্থীরাই জানে না চলতি সপ্তাহে তাদের সশরীরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হবে নাকি বাসায় বসে অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে হবে। ফলে প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও তারা পিছিয়ে পড়ছে। অভিভাবকদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ, কেননা সন্তানদের নিরাপত্তা ও ধারাবাহিকতা; দুটি বিষয়ই এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা বলেন, অনলাইন-অফলাইন ক্লাস নিয়ে স্পষ্ট ও লিখিত নির্দেশনা থাকাটা খুবই জরুরি।

জানা গেছে, রাজধানীর সক্ষম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চলতি সপ্তাহ থেকে শুরু হচ্ছে অনলাইন-অফলাইন ক্লাস। শিক্ষা মন্ত্রণাল থেকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হবে বলে জানিয়েছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক বি এম আব্দুল হান্নান। এর আগে ঢাকা মহানগরে মাধ্যমিক স্তরের কিছু স্কুলে পরীক্ষামূলকভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য তিন দিন অনলাইন ও বাকি তিন দিন অফলাইনে (সশরীরে) ক্লাস চালুর সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। গত ৯ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী জানান, রবিবার, মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার অনলাইনে ক্লাস হবে। অন্যদিকে, শনিবার, সোমবার ও বুধবার শিক্ষার্থীরা স্কুলে উপস্থিত হয়ে অফলাইন ক্লাসে অংশ নেবে। জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করবে। তবে গতকাল রাত ৮টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

শিক্ষার্থীদের আর ক্ষতি করবেন না : রুবিনা ফেরদৌসের দুই মেয়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রী। রুবিনা ফেরদৌস বলেন, ‘আমার হাজবেন্ড দেশের বাইরে থাকেন। আমি একটা মোবাইল ফোন ব্যবহার করি। ফোনটা আমার, সেটা নিয়ে অফিসে যাই। বাসায় শ্বশুর যে মোবাইল ব্যবহার করেন, তা দিয়ে ইন্টারনেট চালানো যায় না। আমার মোবাইলটা যদি বাড়িতে রেখেও যাই, তবুও তো দুই মেয়ে অনলাইনে ক্লাস করতে পারবে না। এখন ওদের জন্য কি জনে জনে মোবাইল কিনতে হবে? এটা কি হুট করে বললেই সম্ভব?’ শুধু রুবিনা ফেরদৌস নন, অনলাইন ক্লাসের ঘোষণায় দিশাহারা অধিকাংশ অভিভাবক। তা-ও আবার খোদ রাজধানীতে বসবাসকারীরা। ঢাকার বাইরে কিংবা জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অনলাইন ক্লাস চালু হলে এ সংকট আরো প্রকট হবে। অভিভাবক সাব্বির আহমেদ সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, শিক্ষার্থীদের আর ক্ষতি করবেন না। করোনা ভাইরাসের মধ্যে অনলাইন ক্লাস, অটোপাশ দিয়ে তিন-চারটা বছর পার হয়েছে। ঐ সময় কিছুই শিখতে পারেনি। আমার ছেলে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত করোনাকালে কিছু শেখেনি। আবার অনলাইনে ক্লাসের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার পক্ষে নই আমি।

ক্লাসের সময় কমিয়ে হলেও সশরীরে ক্লাস চালু রাখার পক্ষে শিক্ষাবিদরা : অভিভাবকরা বলেন, কোনোভাবেই অনলাইন ক্লাস গ্রহণযোগ্য নয়। শহরে অধিকাংশ বাবা-মা চাকরিজীবী। তারা সন্তানদের স্কুলে দিয়ে কর্মক্ষেত্রে যান, ক্লাস শেষে বাসায় নিয়ে আসেন। বাসায় শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন দিয়ে একা রেখে আসাটা ঝুঁকিপূর্ণ। পাশাপাশি অধিকাংশ পরিবারের পক্ষে সন্তানদের জন্য আলাদা মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করা কষ্টসাধ্য। অনলাইন ক্লাসের পক্ষে নন শিক্ষাবিদরাও। অনলাইন-অফলাইনের সমন্বিত এ পদ্ধতি বাস্তবায়ন অযোগ্য এবং বৈষম্য বাড়াবে বলে মত দিয়েছেন। বরং ক্লাসের সময় কমিয়ে হলেও সশরীরে ক্লাস চালু রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা।