Image description

সংসদ ও রাজপথে সরকারকে চাপে রাখতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। শুরুতেই সরকারবিরোধী জোরালো বক্তব্য দিচ্ছেন নেতারা। বিরোধী দলের সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৪টি বাতিল এবং ১৬টি এখনই বিল আকারে না আনার সুপারিশ করেছে সংসদের বিশেষ কমিটি। ফলে এই ২০টি অধ্যাদেশের কার্যকারিতা থাকছে না। এতেই আপত্তি বিরোধী দলের। কিন্তু তাদের কোনও মতামতকেই কর্ণপাত করেনি সরকারি দল।

এছাড়া গণভোটের রায় পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি ও সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে ‘কারচুপি’ হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে ১১ দলীয় জোট। এ বিষয়টিও তাদের আন্দোলনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি নেতাদের।

এরই মধ্যে ঐক্যবদ্ধভাবে দলগুলো বেশ কিছু কর্মসূচি পালন করেছে। সরকারের দেড় মাসের মাথায় কঠোরতার দিকে গেলেও নিজেদের ঐক্য কতটা শক্তিশালী, কীভাবে সমন্বয় করেছেন কেন্দ্রীয় নেতারা, রাজধানীর বাইরেই বা লিয়াজোঁ কমিটি কতটা সক্রিয় এ নিয়েও নানা আলোচনা হচ্ছে।

বিশেষ করে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী জোটের চারটি দলের মধ্যে সমন্বয় কতটুকু? এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তাদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে সংসদের ট্রেজারি বেঞ্চের বিপক্ষে বিরোধী দলীয় সদস্যদের ওয়াকআউটে দুর্বলতার চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।

আর রাজপথে জামায়াতসহ দুই-একটি দলের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি একেবারেই হাতে গোনা। এমন জোট নিয়ে আগামীর আন্দোলন-সংগ্রামের পথ কীভাবে পাড়ি দেবে বিরোধী দল? জোটে নতুন করে কি অন্য কাউকে যুক্ত করা হবে? আসলে এ জোটের ভবিষ্যৎ কী, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যদিও এসব প্রশ্নকে উড়িয়ে দিচ্ছেন জোটের শীর্ষ নেতারা। তারা মনে করেন—সংসদে তাদের অবস্থান যথার্থই আছে। আর বাইরেও মোটামুটি তাদের আন্দোলন দৃশ্যমান।

এ বিষয়ে লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিগত দুই দশক তো সংসদের প্রধান বিরোধী দলের রাজনীতির চেহারা দেখা যায়নি। আর এখন যারা বিরোধী দলের আসনে আছেন, তাদের ব্যাপারে এখনও মূল্যায়নের সময় হয়নি। তারা ভবিষ্যতে কতটুকু ভূমিকা পালন করতে পারবে—সেটা দেখতে আরও অপেক্ষা করতে হবে। তবে আমার মনে হয়, একসময় তারা ২০০১-২০০৬ ও ২০০৮ সালের পরের বিরোধী দলের মতো ভূমিকা পালন করতে পারবে। আর তাদের জোটও হয়তো আরও সম্প্রসারিত হবে।’’

১১ দলীয় জোটে কারা, নতুন কেউ আসছে?

পাঁচই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর জুলাই সনদ ও গণভোটের দাবিতে প্রথমে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট গঠন হয়। দাবি বাস্তবায়নে তারা বেশ কয়েক মাস রাজপথে সক্রিয় ছিল। তখন জোটের প্রধান দুই আলোচিত দলের মধ্যে ছিল জামায়াত ও চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। তবে মনোনয়ন প্রত্যাহারের দুই দিন আগে এর সঙ্গে যুক্ত হয় তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ও বাংলাদেশ লেবার পার্টি। পরবর্তীকালে আসন বণ্টন ও আদর্শিক বনিবনা না হওয়ায় বের হয়ে যায় ইসলামী আন্দোলন। সর্বশেষ আসন বণ্টনের সংবাদ সম্মেলনে তারা উপস্থিত হননি। তবে তারা চলে গেলেও নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটই বলবৎ থাকে। তারা জোটগতভাবেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।

বর্তমানে জোটভুক্ত দলগুলো হলো—বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)।

সম্প্রতি গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, আন্দোলন বেগবান করতে ১১ দলের সঙ্গে আরও বেশ কয়েকটি দল যুক্ত হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জোটের এক শীর্ষ নেতা জানান, অতীতে জোট থেকে বের হয়ে যাওয়া দলগুলোর পাশাপাশি রাজপথে থাকা কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আশা করি বৃহত্তর স্বার্থে তারাও ১১ দলের সঙ্গে যুক্ত হবে।

১১ দলীয় জোটের মিছিল (ফাইল ফটো)

১১ দলীয় জোটের মিছিল (ফাইল ফটো)

এ বিষয়ে জোটভুক্ত দল খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমাদের জোট নিয়ে হয়তো অনেক কথা বলতে পারেন। তবে আমরা শুরুতেই জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে রাজপথে সক্রিয় আছি। আশা করি অচিরেই আরও কয়েকটি দল এ জোটে সম্পৃক্ত হবে।’’

সংসদে জামায়াত-এনসিপি মতবিরোধ নিয়ে আলোচনা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের চার শরিক দলের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬,  মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২ ও মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিসের একজন এমপি রয়েছেন। তবে সংসদে তাদের মধ্যে কিছুটা সমন্বয়হীনতার চিত্র ফুটে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জোটের এক শীর্ষ নেতা জানান, সংসদে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে আলোচনা হয়নি। এতে অনেক বিষয় এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য কেউ কেউ ভিন্ন কথাও বলেছেন।

বিশেষ করে গত ৯ এপ্রিল সংসদ অধিবেশনে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা নিয়ে মতবিরোধে দেখা দেয়—জোটের বড় দুই শরিক জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে।

এদিন মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম বহাল রেখে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিতে বিল পাস করে জাতীয় সংসদ। এই বিলের বিষয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে আপত্তি জানিয়ে দলের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বক্তব্য দেন। তবে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই বিলের ওপর কোনও আপত্তি নেই বলে স্পিকারকে জানিয়েছে। এ ঘটনায় বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই দলের মতবিরোধ নিয়ে আলোচনা হয়। অনেকে এটিকে দুই দলের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব হিসেবে অভিহিত করেন। এছাড়াও সংসদে দুই দলের নেতাদের বক্তব্যের ক্ষেত্রেও ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে বলে কেউ কেউ মনে মনে করেন।

এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে আমাদের অবস্থান শুরুতে যা ছিল, তাই আছে। এ নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। তবে এ কারণে জোটের মধ্যে ফাটল ধরবে না বলে আমাদের বিশ্বাস।’’

কী হতে পারে রাজপথের চিত্র, যা বললেন নেতারা

১১ দলীয় কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা ধীরে ধীরে পথ চলতে চান। এ জন্য শুরুতেই মারমুখী কর্মসূচিতে না গিয়ে গণসংযোগ ও জনমত গঠনে কাজ করতে চান। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২ এপ্রিল জোটের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক হয়।

এতে নেতারা গণমাধ্যমকে বলেন, তারা গণভোটের রায় যেকোনও মূল্যে বাস্তবায়ন করতে চান। সেই ধারাবাহিকতায় চার দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

এরই মধ্যে ৯ এপ্রিল বিকালে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পক্ষে সপ্তাহব্যাপী লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি শুরু হয়। আর ১১ এপ্রিল সারা দেশের উপজেলা ও থানায় বিক্ষোভ মিছিল, ১২ এপ্রিল সব জেলায় বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল এবং ১৩ এপ্রিল ঢাকায় গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পক্ষে জাতীয় সেমিনারের কথা জানানো হয়।

সর্বশেষ ৯ এপ্রিল বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে ১০ এপ্রিল রাজধানীতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী।

অপরদিকে ১১ দলীয় ঐক্যের বাইরে দলীয়ভাবে কর্মসূচি দিয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। দলটি ১০ এপ্রিল সারা দেশের জেলা-উপজেলায় বিক্ষোভ করে। আগামী ২৪ এপ্রিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণসমাবেশ করবে দলটি। জোট নেতারা জানান, জোটের বাইরেও নিজ দলের ব্যানারে ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন করবে দলগুলো।

জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, ‘‘আমরা সরকারের ইতিবাচক সমালোচনার পাশাপাশি গঠনমূলক ভূমিকাও অব্যাহত রাখবো।’’  তিনি বলেন, ‘১১ দলীয় জোটের ঐক্য সুসংহত। পরিবেশ পরিস্থিতির আলোকেই আমাদের আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি নির্ধারিত হবে।’’

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিগত পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়নেও আমরা রাজপথ থেকে পিছপা হয়নি। এবারও শুরুতেই সংসদের ভেতর ও বাইরে আমরা গঠনমূলক বিরোধিতা করছি। সংসদে যেমন সরকারের অসঙ্গতি তুলে ধরছি, তেমনই রাজপথেও আমাদের ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচি অব্যাহত আছে। আগামী দিনে আমরা জোটগতভাবে সরকারবিরোধী আন্দোলন আরও বেগবান করবো। শুধু ১১ দলীয় জোট নয়, আগামীতে অন্যান্য গণতান্ত্রিক শক্তিও আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে হবে বলে প্রত্যাশা করছি। তবে আমাদের সব কর্মসূচি হবে শান্তিপূর্ণ।’’