বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বিভিন্ন অফিসে ঘুষ বাণিজ্য চলছেই। ঘুষ না দিলে সেবাগ্রহীতাদের বড় অংশকেই ঘুরতে হয় বছরের পর বছর। এ হয়রানি থেকে রেহাই পেতে তাঁরা বাধ্য হয়ে ঘুষ দেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার সাভার ও ইকুরিয়ায় বিআরটিএ অফিসে দালালচক্রের বাণিজ্য ‘ওপেন সিক্রেট’।
বিআরটিএ সদর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গ্রাহকদের হয়রানি দূর করতে সংস্থাটি ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ ১৮টি সেবা দিচ্ছে অনলাইনে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বেশির ভাগ বিআরটিএ অফিসের ধারেকাছে ফটোকপি,
কম্পিউটার কম্পোজ ও স্ট্যাম্প বিক্রির সুবিধা রেখে দোকান দিয়ে দালালরা ঘুষ বাণিজ্য চালাচ্ছে। বিআরটিএ সাভার অফিসে মোটরসাইকেল নিবন্ধনসহ সব সেবার জন্য কম্পিউটার অপারেটর মাকসুদা সুলতানা এবং তাঁর ভাই প্লাবনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা চক্রের সদস্যদের দিতে হয় অতিরিক্ত টাকা। তাঁদের নেতৃত্বেই অফিসকক্ষে চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ করেন দালালরা। দালালদের টাকা দিলেই এই অফিসে কাজ হয়, তা না দিলে মাসের পর মাস বিভিন্ন অজুহাতে ঘোরানো হয় সেবাপ্রত্যাশী ব্যক্তিদের।
গত মঙ্গলবার সাভার বিআরটিএ কার্যালয়ে গেলে গ্রাহকদের বেশির ভাগই ভোগান্তির অভিযোগ করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিআরটিএর সাভার কার্যালয়ে তিনজন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অফিসপ্রধান আসেন সপ্তাহে দুই দিন। এখানকার অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাকসুদা সুলতানা এবং তাঁর ভাই প্লাবনের নেতৃত্বে রানা, এনায়েত, ফারুক, শিপলু, শাহাদাত, মমিন, জামান, নয়ন, হাসান, জাকির, লাবুসহ ১২ জনের দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে। বিআরটিএর সাভার কার্যালয়ে গত মঙ্গলবার সকালে ঢোকার পথেই অফিসের সামনে একটি গাড়ির ওপর কাগজ রেখে গ্রাহকদের সঙ্গে বাড়তি অর্থ নেওয়ার হার ঠিক করতে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায় দালাল জামানকে। এই প্রতিবেদককে দেখেই কাগজপত্র গুছিয়ে হাঁটা শুরু করেন তিনি। আরেকটু সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখা যায়, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাকসুদা সুলতানা কয়েকজন গ্রাহকের সঙ্গে টাকার বিনিময়ে কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন। তিনিও এই প্রতিবেদককে দেখে দ্রুত তাঁর নিজের কক্ষে চলে যান। তাঁর চেয়ারে বসে কাজ করছিলেন আরেক দালাল শাহাদাত। বহিরাগত হয়ে অফিসের চেয়ারে বসে কম্পিউটারে কাজ করার কারণ জানতে চাইলে শাহাদাত বলেন, ‘কম্পিউটারে একটু সমস্যা হয়েছিল। তাই ম্যাডাম দেখতে বলেছিলেন।’ এই অফিসে কী কাজ করেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্যারদের নির্দেশে গাড়ির ফিটনেস, লাইসেন্সসহ বিভিন্ন কাজে মানুষকে সহযোগিতা করি। অনেকেই খুশি হয়ে কিছু বকশিশ দেয়।’ অন্য দালালরা জানান, শাহাদাতের রয়েছে দামি প্রাইভেট কার। প্রতিদিন সকালে গাড়ি নিয়ে তিনি অফিসে যান। সাধারণ গ্রাহকদের জিম্মি করে অর্থের বিনিময়ে তাঁদের কাজ করে দিতে ব্যস্ত থাকেন। অফিসে ঢোকার পর ডান পাশে গ্রিল দিয়ে আটকানো রেকর্ডরুমে সর্বসাধারণের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সেখানেই বসে কাজ করছিলেন দালালচক্রের আরেক সদস্য মো. শিপলু। তিনিও মাকসুদা চক্রের সদস্য। আর ওই কক্ষে বসেই বিভিন্ন সেবার জন্য আসা গ্রাহকদের সঙ্গে ঘুষের হার নিয়ে দেনদরবার করছিলেন মাকসুদার ভাই প্লাবন রহমান। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভাই-বোন মাকসুদা ও প্লাবন মিলে সাভার বিআরটিএ কার্যালয়ে দালালচক্র সামলাচ্ছেন। অফিসের ভেতরে বসে কাজ করার বিষয়ে জানতে চাইলে দালালচক্রের সদস্য শিপলু বলেন, ‘এখানে সব কাজ হয় না। পরীক্ষা হয় গাবতলীতে, সেখানে আরো অনেক দালাল রয়েছে, সেখানে টাকা ওড়ে। আমি গ্রাহকদের কিছু কাজ করে বিনিময়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পাই।’
প্রবাসী এহসান উল্লাহ অভিযোগ করে বলেন, ‘অফিস সহকারী মাকসুদার সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি এমন আচরণ করেন যেন মনে হয় তাঁর কাছে আমরা ভিক্ষুক। আমি এক মাসের ছুটিতে দেশে এসে ১৫ দিন ধরে লাইসেন্সের জন্য ঘুরছি।’ মাকসুদার বিরুদ্ধে গ্রাহক হয়রানি, দুর্ব্যবহারসহ দালালচক্রের মাধ্যমে সেবাপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে উেকাচ নেওয়ার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। অফিসের মোটরযান পরিদর্শক মো. জাফর ড্রাইভিং লাইসেন্সপ্রার্থীদের কাছ থেকে উেকাচ গ্রহণ, ফিটনেস ও অন্যান্য কাজের বিনিময়ে দালালচক্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা আদায় করেন। প্রতি কার্যদিবসে বাস, মিনিবাস, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন গাড়ির অর্ধশতাধিক ফিটনেস সনদ এখান থেকে দেওয়া হয়। সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে দেড় হাজার থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘুষ নেওয়া ফাইলে দালালরা নির্ধারিত সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করেন। পরে ফাইলটি পরিদর্শক জাফরের টেবিলে পৌঁছলে তিনি সাংকেতিক চিহ্ন দেখে ফাইলে স্বাক্ষর করেন। এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে তিনি দালালদের মাধ্যমে এই প্রতিবেদককে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। এ ছাড়া মুঠোফোনে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি সাক্ষাতে কথা বলবেন বলে জানান। দালালদের মধ্যে জামান অফিসের পাশেই আমতলায় একটি বহুতল ভবনের দ্বিতীয় তলায় অফিস নিয়েছেন। সেখানে দালালির কাজ করেন। কালো থাই গ্লাস দিয়ে ঘেরা অফিসঘরে লাইসেন্সপ্রত্যাশীদের ভুয়া মেডিক্যাল সার্টিফিকেট ও জাল কাগজপত্রও দেখা গেছে। এসব কাজ করে জামান সাভার ডিওএইচএসে ফ্ল্যাট ক্রয়সহ নামে-বেনামে জমি ক্রয় করেছেন বলে প্রচার রয়েছে। অভিযুক্ত জামানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
গ্রাহক নাজমুল আলম অভিযোগ করেন, এক মাস আগে ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নের জন্য কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। পরে খোঁজ নিতে এসে দেখেন, তাঁর নথিই গায়েব হয়ে গেছে। আবার নতুন করে কাগজ নিয়ে আসার পর একেক সময় একেকটা কাগজ লাগবে বলে দালালরা ঘোরাচ্ছে।
সাভার বিআরটিএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিআরটিএ ঢাকা জেলা সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুনের কাছে এই দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অফিসের ভেতরে টেবিল-চেয়ার নিয়ে বহিরাগতদের কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। কেউ যদি এই কাজ করে থাকে তাহলে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কম্পিউটার অপারেটর মাকসুদার দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাউকে শাস্তি দেওয়ার জন্য আমাদের এনফোর্সমেন্ট শাখা রয়েছে। তারাই এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।’
প্রসঙ্গত, এ অফিসে দুর্নীতি-অনিয়ম দেখতে ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি ছদ্মবেশে অভিযান পরিচালনা করেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিনিধিরা। দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-২-এর সহকারী পরিচালক ওয়াহিদ মঞ্জুর সোহাগের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে দালালরা তাঁদের কাছে গাড়ির ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা ছাড়াই দেওয়ার জন্য বাড়তি চার হাজার টাকা দাবি করেন। পরে দুদক কর্মকর্তারা অফিসের নথিপত্র ঘেঁটে ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই মোটরসাইকেলের নিবন্ধন দেওয়ার প্রমাণ জব্দ করেন। এই ঘটনার পর তৎকালীন মোটরযান পরিদর্শক আমিনুল ইসলামকে বদলি করা হয়।
ইকুরিয়ায় দালালচক্র : এদিকে কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়ায় বিআরটিএ কার্যালয়ে দালালদের তৎপরতা রয়েছে। গত কয়েক দিন গিয়ে দেখা গেছে, দালালরা এখানে মূল ফটকের বাইরে অবস্থান করেন। সেখানে বাইরে থাকা বেশ কিছু কম্পিউটারের দোকানে গিয়ে এসব দালাল গ্রাহকদের অনলাইন সেবায় সহায়তার বিনিময়ে ঘুষ নেন। ড্রাইভিং লাইসেন্স নেওয়ার প্রথম ধাপ হচ্ছে শিক্ষানবিশ লাইসেন্স নেওয়া, সেটি নিতে সরকারি ফির বাইরে দালালরা দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত নেন। লাইসেন্স নেওয়ার আগে পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়ার নামেও দালালরা চার হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেন। কোনো গ্রাহক ঘুষ না দিলে তাঁকে ফেল করানোর ভয় দেখানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, বাইরের দালাল ছাড়াও অফিসে কর্মরত দালাল অফিস সহায়কদের বড় অংশই এই ঘুষ বাণিজ্যে যুক্ত। গ্রাহক লাল মিয়া জানান, গাড়ির ফিটনেস করাতে গেলে ঘুষ না দিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। ঘুষ দিলে বসতে হয় না। বিআরটিএর ঢাকা জেলা সার্কেলের সহকারী পরিচালক(ইঞ্জি:) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুনের কাছে এ অফিসে ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি মূল অফিসের অনুমতি ছাড়া কোনো বক্তব্য দিতে পারছি না।’
এ অফিসের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, ‘আমাদের এখানে আগে ড্রাইভিং লাইসেন্সের পরীক্ষা হতো। তা এখন হয় তেজগাঁওয়ে।’ ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।