Image description
ইউজিসির ৪০০০ কোটির ‘হিট’ প্রকল্প

দেশে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৭০টির ওপরে। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই গবেষণা খুব সীমিত। অথচ গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টিই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূল কাজ। তাই উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বড় প্রকল্প ‘হায়ার এডুকেশন অ্যাকসেলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট)’।

কিন্তু চার হাজার কোটি টাকার এই গবেষণা প্রকল্পে অভিযোগের অন্ত নেই। গবেষণার দিকে নজর না দিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ লোপাট ও এর ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও হিট প্রকল্পের কয়েকজন কর্মকর্তা।

বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এরই মধ্যে এ প্রকল্পে অসন্তুষ্টির কথা জানানো হয়েছে। ফলে বিপুল অঙ্কের ঋণের বোঝার এ প্রকল্পের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হওয়ার পথে।

সূত্র জানায়, ইউজিসি বাস্তবায়নাধীন ‘হিট’ প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকারের অর্থের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক ঋণ সহায়তা দিচ্ছে। পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের কাজ ২০২৩ সালের জুলাই থেকে শুরু হয়। হিট প্রকল্পের মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে চার হাজার ১৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৫০.৯৬ শতাংশ অর্থায়ন করবে বাংলাদেশ সরকার এবং বাকি ৪৯.৪ শতাংশ অর্থ দেবে বিশ্বব্যাংক।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদল শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য আসে। বৈঠকের পর শিক্ষামন্ত্রী জানান, ‘হিট প্রকল্প নিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদল নানা ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করেছে। তারা বিষয়টি নিয়ে নাখোশ।’ এরপর প্রকল্পটি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। কিছুটা চাপের মধ্যেও পড়ে ইউজিসি।

এরপর গত ১ এপ্রিল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ইউজিসি জানায়, হিট প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি সন্তোষজনক। এই প্রকল্পের সামগ্রিক বাস্তবায়ন অগ্রগতি ‘মাঝারিমানের সন্তোষজনক’ (মডারেটলি সেটিসফ্যাক্টরি) বলে মূল্যায়ন করেছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিনিধিদল ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুন আহমেদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে প্রকল্পের সর্বশেষ বাস্তবায়ন

অগ্রগতি তুলে ধরেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়। অর্থাৎ বিশ্বব্যাংকের সন্তুষ্টি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে।

হিট প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসলে যেসব অভিযোগ উঠেছে, তা সঠিক নয়। বলা হচ্ছে শত শত কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। অথচ রিসার্চ ফান্ডের জন্য এখন পর্যন্ত মাত্র ১১৬ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে। আরেকটি ফান্ড ছাড়ার প্রক্রিয়া চলছে।  আসলে এই প্রকল্পটির ডিপিপি আগে করা। কিন্তু সেই ডিপিপি অনুযায়ীই আমাদের কাজ করতে হচ্ছে, যা একটি বড় জটিলতা। সেগুলো সমন্বয় করেই আমাদের এগোতে হচ্ছে।’

সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে হিট প্রকল্প নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত, অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম, অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম, অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক ও অধ্যাপক ড. জামাল উদ্দিন। তাঁরা বলেন, ‘হিট প্রকল্পে ভালো এবং স্বীকৃত গবেষকদের বাদ দিয়ে লো-প্রোফাইল ও কম সাইটেশনধারী শিক্ষকদের প্রজেক্ট নির্বাচিত করা হয়েছে। প্রজেক্ট নির্বাচনে মেধা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়ে স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে। আমাদের পর্যবেক্ষণ বলে, প্রায় ৪০ শতাংশ লো-প্রোফাইলধারী (টোটাল সাইটেশন ১০০-এর কম) গবেষকদের প্রজেক্ট নির্বাচন করা হয়েছে। এ ছাড়া ৫০০ সাইটেশনের কম আছে—এমন ৪০ শতাংশ গবেষকের প্রজেক্ট নির্বাচন করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত গবেষকদের বাদ দিয়ে তুলনামূলক কম গবেষণা ও সাইটেশন রয়েছে—এমন গবেষক নির্বাচন করা হয়েছে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’

শিক্ষকরা বলছেন, গবেষণা প্রকল্প পেতে যোগ্যতার বদলে প্রাধান্য পেয়েছে রাজনৈতিক আনুগত্য ও ব্যক্তিগত পরিচিতি। সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক দিয়ে ব্যবসায় অনুষদ, অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান—এমনকি স্থাপত্যবিষয়ক গবেষণার প্রস্তাব মূল্যায়ন করানো হয়েছে। গণযোগাযোগ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের শিক্ষকদের দেওয়া হয়েছে ইংরেজি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ ও প্রত্নতত্ত্বের মতো ভিন্ন বিষয়ের রিভিউয়ের দায়িত্ব।

এসব অভিযোগের পরও গত বছরের ২৭ আগস্ট নির্বাচিত ১৫১টি উপপ্রকল্প বাস্তবায়নে দেশের ৪৩টি পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি সই করে ইউজিসি। সম্প্রতি কয়েক শ কোটি টাকার অর্থও ছাড় করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ের গবেষণা প্রকল্পের জন্য প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ছাড় করার কথা রয়েছে। 

নাম প্রকাশ না করে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রকল্পটির টার্গেট ভালো। সমস্যা হচ্ছে প্রকল্পটি যাঁরা হ্যান্ডেল করছেন তাঁদের নিয়ে। প্রথম পর্যায়ের গবেষণা প্রকল্প নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে, এর কিছু না কিছু সত্যতা তো রয়েছেই। তবে দ্বিতীয় পর্যায়ে যেন কোনো অভিযোগ না ওঠে, কিভাবে শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করা যায়, সে দিকটায় প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ও ইউজিসির নজর দেওয়া উচিত।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রিসার্চ ফান্ডের জন্য প্রথম পর্যায়েই প্রায় ১০০ কোটি টাকা ভাগবাটোয়ারার আয়োজন করেছে ইউজিসি ও হিটের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। রিভিউয়ারদের ম্যানেজ করে সিন্ডিকেটের শিক্ষকদের প্রকল্প দিয়েছে ওই সিন্ডিকেট। প্রত্যেক রিভিউয়ের জন্য ১৫ হাজার টাকা সম্মানী রাখা হলেও সর্বোচ্চ নম্বর দিলে ১০ লাখ পর্যন্ত অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় ওই সিন্ডিকেট। অন্যদিকে যেসব গবেষণা প্রকল্পে সর্বোচ্চ নম্বর দেওয়া হয় তাদের সঙ্গে ফিফটি-ফিফটির মৌখিক চুক্তি হয়েছে। অর্থাৎ দুই কোটি টাকার প্রজেক্ট পেলে এক কোটি দিয়ে দিতে হবে। এভাবে শতাধিক গবেষণা প্রকল্পে সর্বোচ্চ নম্বর দিয়ে ১০০ কোটি টাকা বাণিজ্য করেছে ওই সিন্ডিকেট। হিট প্রকল্পে বর্তমানে দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হয়েছে। এখানেও বড় ধরনের জাল বিছিয়ে রেখেছে ওই সিন্ডিকেট।

ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর মামুন আহমেদ গত বুধবার এক অনুষ্ঠানে বলেন, হিট প্রকল্পে দ্বিতীয় পর্যায়ের একাডেমিক ট্রান্সফরমেশন ফান্ড (এটিএফ) উপপ্রকল্পের গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়ন সতর্কভাবে করতে হবে। প্রকল্প মূল্যায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মূল্যায়নের সব কাজ শেষ করতে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশ দেন তিনি।

ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘প্রকল্পের মূল্যায়ন যেন বিদ্যমান সামাজিক, রাজনৈতিক ও একাডেমিক বাস্তবতার নিরিখে সঠিক হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রকল্প মূল্যায়ন নিয়ে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি এবং প্রশ্ন যাতে না ওঠে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।’   

সূত্র জানায়, হিট প্রকল্পের শুরুতে পিডি নিয়োগ নিয়েই অনিয়মের শুরু। নিয়োগ পরীক্ষায় ৩২ প্রার্থীর মধ্যে প্রথম হয়েছিলেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আবুল হাসনাত মুহাম্মদ সোলায়মান। ২০২৪ সালের ১৪ মার্চ ইউজিসি তাঁকে নিয়োগ দেয়। কিন্তু ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের মৌখিক নির্দেশে মাত্র এক দিনের মাথায় তাঁর নিয়োগ বাতিল করে মন্ত্রণালয়। পরে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) আওয়ামীপন্থী অধ্যাপক আসাদুজ্জামানকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ ছাড়া এই প্রকল্পে অন্যতম পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোজাহার আলী। তাঁরা দুজন এখনো বহাল রয়েছেন।

এদিকে ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে পিডি পদে নিয়োগ ফিরে পেতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন হিট প্রকল্পে প্রথম হওয়া প্রফেসর আবুল হাসনাত। সেখানে তিনি বলেন, ‘তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীর মৌখিক নির্দেশে সরকারি ছুটির দিন আমার জিও বাতিল করা হয়। অথচ আদেশ বাতিল করতে হলে আন্ত মন্ত্রণালয় সভা করতে হয়। আমার একমাত্র অপরাধ ছিল আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাদা দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত।’

বঞ্চিত প্রার্থী অধ্যাপক হাসনাতের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি যে অন্যায্যতার শিকার হয়েছেন, তা মৌখিকভাবে স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু ইউজিসির একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বড় অঙ্কের টাকা লুটপাট করতে বর্তমান পিডিকেই রেখে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

জানা যায়, দেশে বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৫টি। অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১৬টি। কিন্তু প্রথম পর্যায়ের গবেষণা প্রকল্পে বৈষম্যের শিকার হয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় করলেও তারা কোনো প্রকল্প পায়নি। অথচ তারা একাধিক গবেষণায় দেশে-বিদেশে স্বীকৃতি পেয়েছে। হিট প্রকল্প থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।      

হিট প্রকল্পের পিডি অধ্যাপক আসাদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এখন দ্বিতীয় পর্যায়ে গবেষণা প্রকল্প নিয়ে কাজ করছি। শিগগিরই আমরা রিভিউ শুরু করব।’

প্রথম পর্যায়ের গবেষণা প্রকল্পের বিভিন্ন অভিযোগ-অনিয়মের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে বলার জন্য সরাসরি আসতে হবে। কাগজপত্র দেখে কথা বলতে হবে। তবে দ্বিতীয় পর্যায়ের গবেষণা প্রকল্পের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। সেগুলো নিয়ে কাজ করছি।’