বহু ঘাট পেরিয়ে একটি মামলা আদালতে শুনানির জন্য কার্যতালিকায় ওঠে। শুনানির জন্য বিচারপ্রার্থীর আইনজীবী দাঁড়ানোমাত্র বেঞ্চ অফিসার জানিয়ে দেন, ‘মামলার নথি আসেনি’। নথি না আসার তথ্যটি ছোট করে জানিয়ে দেয়ার পর বিচারপ্রার্থীর মাথায় বাঁজ পড়ে। কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে মোটা অঙ্কের ফি পাওয়া ‘বিজ্ঞ’ আইনজীবীর কপালেও। নথি না আসায় কখনো কখনো সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ উষ্মা প্রকাশ করেন। কখনো বা অপেক্ষা করেন ‘নথি প্রাপ্তি পর্যন্ত’। কিন্তু কেন নথি পাওয়া যায় নাÑ সেই তত্ত্ব-তালাশ কাউকে করতে দেখা যায় না। মামলার লাখ লাখ নথি।
এর মধ্যে কোন মামলার নথি কোথায় পড়ে আছে কে খোঁজ রাখে! তবে বিশেষ কোনো মামলার নথি ‘নিখোঁজ’ হয়ে গেলেই কেবল সেটি মিডিয়ায় আসে ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। রেকর্ডরুমে নাড়াচাড়া পড়ে। কিন্তু বিশেষত: উচ্চ আদালতে ‘নথি না পাওয়া’র এই ঘটনা যে প্রাত্যহিকÑ সেটি ভুক্তভোগী মাত্রই বুঝতে পারেন। আইনজীবীদের কাছে এটি ‘মামুলি ঘটনা’। ভুক্তভোগী হলেও এ নিয়ে কোনো আইনজীবীকেই উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায় না। কারণ বিরুদ্ধে বলবেন? বলার পর নিজের মামলার নথিটিই গায়েব হয়ে যায় কি-না, এ টেনশন তার থাকে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলা কথিত এই ‘নথি পাওয়া যাচ্ছে না’ নাটক যে সেকশন কিংবা রেকর্ডরুম সংশ্লিষ্টদের একটি পরিকল্পিত এবং পাতানো খেলাÑ এটি ঘুষ প্রদান সাপেক্ষে ‘খুঁজে পাওয়া’র মধ্যেই প্রমাণিত। অথচ যুগ যুগ ধরে চলে আসা নথি না পাওয়া, নথি গায়েব কিংবা উধাও হয়ে যাওয়াÑ ঘটনা বন্ধ হয়নি।
সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি থাকাকালে অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেছিলেন, অনেক সময় নথি আদালতে পাওয়া যায় না। আবার কিছু টাকা-পয়সা খরচ করলে সেটি পাওয়া যায়। এটি রোধ হওয়া দরকার।
‘দরকার’ বোধ করছেন প্রায় সবাই। অথচ অদ্যাবধি উদঘাটিত হয়নি ‘নথি নিখোঁজ’র নথি। হবেই বা কেন? মামলার ‘নথি নিখোঁজ’ হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে বিরাট অর্থনৈতিক সংশ্লেষ। রেকর্ডরুম, বেঞ্চ অফিসার, কখনো বা আইনজীবীর ক্লার্ক (মুহুরি)’র মতো আদালত সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে মামলার পক্ষ বিশেষকে বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দিতে পরিকল্পিতভাবে নথি কিছু সময়ের জন্য গায়েব করেন। স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ টাকা খরচ করলেই খুঁজে পায় নেই নথি। নথি গুমের ঘটনা আদালতে নিত্য দিনের। অথচ এটি বন্ধে নেই কার্যকর কোনো উদ্যোগ। বিচার বিভাগকে ‘স্বাধীন’ এবং ‘পৃথক’ প্রশ্নে মামলা হয়। অথচ বিচার বিভাগকে দুর্নীতিমুক্ত করার কোনো মামলা নেই। দুর্নীতিগ্রস্ত আদালত সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এমন কোনো মামলারও মুখোমুখি হতে দেখা যায় না। এমন সতসিদ্ধ ও প্রতিষ্ঠিত চলমান দুর্নীতি সংস্কৃতি বন্ধে এবার লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট বারের আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া।
গতকাল বৃহস্পতিবার আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ও সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রার জেনারেলকে তিনি এ নোটিশ পাঠান।
নোটিশে অ্যাডভোকেট ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, মামলার ফাইল প্রেরণে অযৌক্তিক বিলম্ব করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ফাইল ‘গায়েব’ বা ‘খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না’ বলা হয়। ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা তদবির ছাড়া ফাইল এগোয় না। এতে একটি অস্বচ্ছ ও অনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যা সরাসরি বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
নোটিশে বলা হয়, একটি মামলার কার্যকর শুনানি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি নির্ধারিত সময়ে আদালতে উপস্থিত থাকার ওপর। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুনানির দিন ফাইল আদালতে পৌঁছায় না। মামলার নথি অনুপস্থিত থাকায় বিচারপতিগণ শুনানি নিতে পারেন না। ফলে মামলাগুলো বারবার মুলতবি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি বিচার-প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক গতিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
সুপ্রিম কোর্ট (হাইকোর্ট বিভাগ) রুলস-১৯৭৩, চ্যাপ্টার-ওঠঅ, রুল-৮ সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ অফিসারকে প্রতিদিন বিকাল ৩টার মধ্যে রিকুইজিশনে স্বাক্ষর করতে হবে। সংশ্লিষ্ট শাখা/সেকশনকে পরদিন সকালের মধ্যে মামলার নথিসংশ্লিষ্ট বেঞ্চে পাঠাতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট রুলস-১৯৬৬, রুল-০৬ অনুযায়ী আদালতের অনুমতি ছাড়া কোনো নথি আদালতের হেফাজত থেকে বাইরে নেয়া যাবে না। এ ছাড়া রেজিস্ট্রার জেনারেলের দফতর থেকে একাধিক সার্কুলার ও অফিস আদেশ ইতোপূর্বে জারি করা হয়েছে। যেখানে এসব নিয়ম কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশনা রয়েছে। তবুও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা অমান্য করা হচ্ছে। ফাইল প্রেরণে অযৌক্তিক বিলম্ব করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ফাইল ‘গায়েব’ বা ‘খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না’ বলা হয়। ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা তদবির ছাড়া ফাইল এগোয় না। এতে একটি অস্বচ্ছ ও অনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যা সরাসরি বিচার-প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
অ্যাডভোকেট ফরহাদ উদ্দিন নোটিশে বলেন, ফাইল সময়মতো আদালতে না পৌঁছানো মামলার জট বৃদ্ধির একটি প্রধান কারণ। একটি মামলা মাসের পর মাস কজ লিস্টে থেকে যাচ্ছে। শুনানি শুরুর করা যাচ্ছে না। বিচার-প্রক্রিয়া অকার্যকর হয়ে পড়ছে। এই অনিয়মের ফলে আদালতের প্রশাসনিক দক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমছে। আইনের শাসন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২ অনুযায়ী জীবনের অধিকার মানে শুধু বেঁচে থাকা নয়, বরং ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তাও এর অন্তর্ভুক্ত। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫(৩) অনুযায়ী প্রত্যেক ব্যক্তির দ্রুত ও উন্মুক্ত বিচারের অধিকার রয়েছে। ফাইল না থাকায় শুনানি না হওয়া এই মৌলিক অধিকারকে সরাসরি ব্যাহত করছে। এর আগে গত বছর ২৪ নভেম্বর একই বিষয়ে রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবর আবেদন করা হয়। কিন্তু কোনো দৃশ্যমান বা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এতে বোঝা যায়, সমস্যাটি সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ অবগত থাকলেও যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
নোটিশে এ-সংক্রান্ত সকল সার্কুলার ও অফিস আদেশ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, দায়িত্বে অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা, ফাইল ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, ঘুষ ও অনিয়ম বন্ধে কার্যকর নজরদারি।
নোটিশপ্রাপ্তির সাত দিনের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া না হলে সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে আইনগত প্রতিকারে ব্যবস্থা নেয়া হবে: মর্মে হুঁশিয়ারি দেয়া হয়।