পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার উত্তর হাগলা গ্রামের কাজল হাওলাদারের ছেলে মো. সুমন হাওলাদার। একই গ্রামের মৃত হাসেম হাওলাদারের ছেলে জুয়েল হাওলাদার। সম্পর্কে তারা চাচা-ভাতিজা। দুজনেরই অনলাইন জুয়া ক্যাসিনো খেলার নেশা। শুরুতে জমানো টাকা ও গ্রামের বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে ধার নিয়ে অনলাইন জুয়া খেলতেন। একপর্যায়ে শুরু করেন সুদে টাকা নেওয়া। কিন্তু লাভের বদলে নিঃস্ব হয়ে যান। এরপর সুমন হাওলাদারের মাথায় আসে চোরচক্র গড়ে তোলার কথা। ভাতিজা জুয়েলকে প্রস্তাব দিলে রাজিও হয়ে যান। সেই শুরু তাদের কার্যক্রম। চাচা-ভাজিতা মিলে গড়ে তোলেন ভয়ংকর চোরচক্র। রেকি করার জন্য অন্য দুজনকে দলে ভেড়ান। এভাবে রাজধানীতে একের পর এক চুরি করে সেই টাকা ভাগবাঁটোয়ারা করে নিয়ে যে-যার মতো অনলাইন ক্যাসিনো খেলতে থাকেন।
টাকা ফুরিয়ে গেলে আবারও নামতেন নতুন কোনো বাসায় চুরির মিশনে। শুধু এ চক্রই নয়, অনলাইন জুয়ার নেশায় পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে চুরিতে নাম লেখাচ্ছেন অনেকেই। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার অনেক চোরই অনলাইনে ক্যাসিনো খেলার আসক্তিতে চুরিতে জড়ানোর কথা স্বীকার করেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শহর থেকে শুরু করে গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় ছড়িয়ে পড়া এ অনলাইন জুয়া ঠেকানো না গেলে অপরাধী চক্রে নতুন নাম লেখানোদের সংখ্যা বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। জানা গেছে, ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) ও পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল) ঘিরেও বর্তমানে সারা দেশে অনলাইন জুয়ার রমরমা অবস্থা চলছে। সেলুনকর্মী থেকে হকার, দোকানি, মাছ বিক্রেতা, বাস ও লেগুনার চালক; গৃহকর্মী থেকে বাড়ির কেয়ারটেকার সবাই এখন জুয়ার গ্রাহক। পুলিশের সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর নজরদারি ঠেকাতে পারছে না জুয়ার এ আসক্তি।
গোয়েন্দা সূত্র জানান, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার একটি চুরি মামলার তদন্তে নেমে সুমন মিয়া, তার ভাতিজা জুয়েল এবং দুই স্বর্ণ ব্যবসায়ী সাব্বির হোসেন ও সুমন গাজীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ চক্রে যশোরের অভয়নগর উপজেলার মওদুদ ও পিরোজপুরের কাউখালীর মানিক বাসা রেকির দায়িত্ব পালন করতেন। তারা দুজন এখনো পলাতক। তাদেরও রয়েছে অনলাইন জুয়ার আসক্তি। তাদের মধ্যে চক্রের হোতা সুমন ৪ মার্চ কদমতলীর মেরাজনগর থেকে গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত গত বছরের ডিসেম্বর থেকে মাত্র তিন মাসে অনলাইন ক্যাসিনো খেলে ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা খুইয়েছেন সুমন। একটি বেসরকারি ব্যাংকে তার অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্টেই এ টাকা খোয়ানোর বিষয়টি দেখা গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানান, সুমন ও জুয়েল গ্রামের বাড়িতে প্রভাব দেখানোর চেষ্টা করতেন। সেখানকার কয়েকজন জনপ্রতিনিধি তাদের চুরির গল্প জেনে যাওয়ায় নিয়মিত ওইসব জনপ্রতিনিধিকে টাকা দিতেন তারা। এমনকি গ্রামে গেলে মানুষকে দুই হাতে দান করতেন।
বাসায় এসি ও লাইট বন্ধ দেখলে টার্গেট : রাজধানীর ডেমরা কোনাপাড়া এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন চক্রের হোতা সুমন। আর যাত্রাবাড়ীর একটি বাসায় থাকতেন ওয়ার্কশপের কাজে দক্ষ জুয়েল। তাদের সহযোগী মওদুদ ও মানিক প্রতিদিন সন্ধ্যার দিকে বাসা রেকি করতে বের হতেন। প্রথমে দেখতেন কোন বাসায় এসি এবং সন্ধ্যার পর থেকে লাইট বন্ধ। কোনো এসি লাগানো বাসা দু-তিন দিন লাইট বন্ধ থাকলেই তারা ধরে নিতেন ওই বাসার বাসিন্দারা অন্য কোথাও গিয়েছেন। এর পরই শুরু হতো গ্রিল কেটে চুরির পরিকল্পনা। এভাবে চক্রটি আরও বেশ কয়েকটি ঘটনায় জড়িত বলে ধারণা করছে ডিবি। তবে যাত্রাবাড়ীর ঘটনা ছাড়া সুমনের বিরুদ্ধে একটি ও জুয়েলের বিরুদ্ধে দুটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।
যাত্রাবাড়ীতে চুরির টাকাও অনলাইন জুয়ায় : তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, যাত্রাবাড়ীর বাসাটি থেকে ১ কোটি ১০ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার ও নগদ ৪৫ লাখ টাকা চুরির পর নিজেদের ভাগের টাকা অনলাইন জুয়ায় খুইয়ে ফেলে চোরচক্র। ডায়মন্ড ও স্বর্ণালংকার বিক্রির পর ভাগবাঁটোয়ারা করে সুমন নেন ৬৫ লাখ, জুয়েল ৪০ লাখ ও অন্য দুই সহযোগী নেন ৩০ লাখ টাকা। কিন্তু সুমন ও জুয়েলের কাছে পাওয়া যায়নি কোনো টাকা। তারা যে ব্যবসায়ীদের কাছে অলংকার বিক্রি করেছিলেন, সেই দুই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৪১ ভরি সোনা।