দেশে বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ পাঁচ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আর সংসদ-সদস্য ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ঘাড়েই রয়েছে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ। সোমবার জাতীয় সংসদে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশের পাশাপাশি এই উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তালিকায় এস আলম গ্রুপ ও বেক্সিমকোর মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্য দেখা গেছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকারের কঠোর পদক্ষেপের কথা জানান অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার স্বপ্ন ও রূপরেখাও তুলে ধরেন।
সংসদে এনসিপির সংসদ-সদস্য আবুল হাসনাতের (হাসনাত আবদুল্লাহ) প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমানে (৩১ ডিসেম্বর ২০২৫) খেলাপি ঋণের পরিমাণ পাঁচ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে বর্তমান সংসদ-সদস্য ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তিন হাজার ৩৩০ কোটি আট লাখ টাকা খেলাপি হিসাবে দেখানো হয়নি। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উপস্থাপিত হয়।
মন্ত্রীর দেওয়া তালিকা অনুযায়ী শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠান হলো-এস আলম সুপার এডিবল অয়েল লি., এস আলম ভেজিট্যাবল অয়েল লি., এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লি., এস আলম কোল্ড রোলেড স্টিলস লি., সোনালী ট্রেডার্স, বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লি., গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন লি., চেমন ইস্পাত লি., এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি প্রাইভেট লি., ইনফিনিট সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ লি., কেয়া কসমেটিকস লি., দেশবন্ধু সুগার মিলস লি., পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্লান্ট লি., পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্লান্ট লি., প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লি., কর্ণফুলী ফুডস (প্রা.) লি., মুরাদ এন্টারপ্রাইজ, সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি, বেক্সিমকো কমিউনিকেশনস লি. ও রংধনু বিল্ডার্স (প্রা.) লিমিটেড।
হাসনাত আবদুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে-শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপি/শ্রেণীকৃত ঋণ আদায়ের অগ্রগতি যাচাই, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইড খেলাপি ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ ও তফসিলি নীতিমালা হালনাগাদকরণ।
ফেনী-২ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ-সদস্য জয়নাল আবদিনের প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম অত্যধিক বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে অতিরিক্ত অর্থায়নে সরকার উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেট সাপোর্টসহ জ্বালানি সাশ্রয়ে নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মন্ত্রী জানান, বৈশ্বিক অস্থিরতা, পণ্যমূল্যের চাপ, বৈদেশিক লেনদেনের চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বিগত সময়ে সৃষ্ট নানা অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে নানামুখী চ্যালেঞ্জ নিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করলেও দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও গতিশীল করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে একগুচ্ছ পদক্ষেপ নিয়েছে। আরও পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে। এ প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্বগ্রহণের পর থেকেই অর্থনীতির ভিত মজবুত করা, মানুষের কষ্ট লাঘব করা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাদিহিতা বাড়ানোকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
কুষ্টিয়া-১ আসনের রেজা আহাম্মেদের (বিএনপি) প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে স্থিতিশীলতা, সংস্কার, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা ও সুশাসনভিত্তিক সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখবে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মইনুল ইসলাম সোমবার রাতে যুগান্তরকে বলেন, নির্দিষ্ট কয়েকজনের নাম প্রকাশ করে তারা এটাকে আরও ঢেকে ফেলার চেষ্টা করছে। বর্তমান গভর্নর নিজেও একজন ঋণ খেলাপি ছিলেন। সুতরাং সরকারের কর্মকাণ্ড দেখে মোটেও আশাবাদী নই। বড় বড় রাঘববোয়াল ঋণ খেলাপিদের কিছুই হবে না। এটা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেছে।