Image description

ঢাকা দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রশাসন ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। মানুষের ভিড়ে আরো ঘন হয়ে উঠছে শহরটি। কিন্তু এই ব্যস্ত মহানগরীতে মানুষের জন্য একটি মৌলিক চাহিদা ক্রমশই দুর্লভ হয়ে উঠছে। এই শহরের বাসিন্দাদের জন্য নেই পযাপ্ত হাঁটার জায়গা। ফুটপাত দখল, খেলার মাঠের অভাব, উন্মুক্ত পার্কের সঙ্কট এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ঢাকাবাসীর হাঁটার সুযোগ দিন দিন কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যে নয় মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক জীবনের উপর পড়ছে।
ঢাকায় হাঁটার পরিবেশ শুধু সঙ্কুচিতই নয় অনেক ক্ষেত্রে অনিরাপদও। নারীদের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অপর্যাপ্ত আলো, নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক বাধার কারণে অনেক নারীই বাইরে হাঁটতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। অন্যদিকে বয়স্কদের জন্য সমতল, নিরাপদ এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। কিন্তু ঢাকার ফুটপাতের অবস্থা এমন যে অনেক সময় সুস্থ মানুষের পক্ষেও হাঁটা কঠিন হয়ে পড়ে।

সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের তীব্র সঙ্কট এই শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাপকভাবে ব্যাহত করেছে। গণপরিবহনের সংখ্যা কমে যাওয়া, ভাড়া বৃদ্ধি, এবং পরিবহন ব্যবস্থার অচলাবস্থার কারণে হাজার হাজার কর্মজীবী মানুষকে বাধ্য হয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে কর্মস্থলে যেতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি শুধু একটি অর্থনৈতিক সঙ্কট নয় এটি একটি মানবিক সঙ্কটেও রূপ নিয়েছে। পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় অনেক বাস, ট্রাক, এবং সিএনজি চালিত যানবাহন চলাচল কমিয়ে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবহন মালিকরা লোকসানের আশঙ্কায় যানবাহন রাস্তায় নামাচ্ছেন না। ফলে যাত্রীদের জন্য পযাপ্ত যানবাহনের সংখ্যা কমে গেছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার মানুষ যারা নিয়মিত বাসে করে কর্মস্থলে যেতেন তারা অনেকে এখন দীর্ঘপথ হেঁটে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের জন্য নেই পর্যাপ্ত হাঁটার মতো রাস্তা।

গবেষণা ও বুয়েটের তথ্যে জানা যায়, রাজধানীর প্রায় ৮০ শতাংশ ফুটপাতই দখল। এসব ফুটপাতের বেশিরভাগই ব্যবহার হচ্ছে ব্যবসার কাজে। এছাড়া নির্মাণসামগ্রী বা অবৈধ পার্কিংয়ের দখলেও আছে বেশ কিছু ফুটপাত ও সড়ক। এতে শহরের ৩৮ শতাংশ মানুষ বাধ্য হয়ে মূল রাস্তা দিয়ে চলাচল করছে। আর সড়কের ২৬ শতাংশ দুর্ঘটনাই যার প্রধান উৎস। এসব ফুটপাতের বেশিরভাগই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকার সিন্ডিকেটের দখলে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদ- অনুযায়ী, একটি শহরে প্রতি ব্যক্তির জন্য অন্তত ৯ বর্গমিটার উন্মুক্ত সবুজ জায়গা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকায় এই পরিমাণ ১ বর্গমিটারেরও কম। শহরে হাতে গোনা কয়েকটি পার্ক থাকলেও সেগুলোও অনেক সময় অপরিচ্ছন্ন, নিরাপত্তাহীন বা সীমিত সময়ের জন্য খোলা থাকে। শিশুদের খেলার মাঠের অভাব বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। অনেক এলাকায় কোনো খেলার মাঠই নেই, ফলে শিশুরা বাসার ভেতরেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। এতে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এদিকে, রাজধানীর রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে সমন্বিত উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। টানা কয়েকদিনের অভিযানে অনেক জায়গায় ফুটপাতের জায়গা উদ্ধার করা হয়েছে। আবার অনেক জায়গায় উচ্ছেদ করা জায়গাগুলো মুহূর্তেই দখলে নিয়েছেন হকাররা। সায়েন্সল্যাব মোড় থেকে নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাত উদ্ধারে অভিযান চালায় ট্রাফিক রমনা বিভাগ। শুধু নিউমার্কেট নয়, রাজধানীর মগবাজার, বাংলামটর, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, গুলিস্তান, বঙ্গবাজার, পান্থপথ, গ্রিন রোড, দৈনিক বাংলা, ফকিরাপুল, নাইটিঙ্গেল মোড়, খিলগাঁও ক্রসিং, মালিবাগ রেলগেট, ফার্মগেট, ইন্দিরা রোড ও কারওয়ান বাজার, মতিঝিল, গুলশান এলাকায়ও ফুটপাত ও রাস্তা থেকে অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি বাসযোগ্য শহরের অন্যতম শর্ত হলো নিরাপদ ও পর্যাপ্ত হাঁটার সুযোগ। অথচ ঢাকায় হাঁটা যেন এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান। ঢাকার ফুটপাতগুলো মূলত পথচারীদের জন্য নির্মিত হলেও বাস্তবে এগুলো ব্যবহার করছেন দোকানদার, হকার, নির্মাণসামগ্রীর স্তূপ, এমনকি পার্ক করা হয় মোটরসাইকেলও। শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয় বরং একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। যেখানে নগর পরিকল্পনা, আইন প্রয়োগ এবং নাগরিক সচেতনতা সবকিছুর সমন্বয় থাকবে। ফুটপাতকে পথচারীদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত নজরদারি এবং আইন প্রয়োগ জরুরি। নতুন প্রকল্প অনুমোদনের সময় হাঁটার পথ ও উন্মুক্ত স্থানের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করতে হবে। রাস্তাঘাটে পর্যাপ্ত আলো এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে যাতে সবাই স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটতে পারে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নিয়মিত হাঁটা শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এটি হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা রোগ প্রতিরোধে সহায়ক। কিন্তু ঢাকায় নিরাপদে হাঁটার সুযোগ না থাকায় মানুষ ক্রমশ নিষ্ক্রিয় জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। এছাড়া মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও এর প্রভাব পড়ছে। খোলা জায়গায় হাঁটা, প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকা মানুষের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু এই সুযোগের অভাবে শহুরে জীবনে উদ্বেগ ও হতাশা বাড়ছে।

যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা মাহফুজুল হক বলেন, মতিঝিলে তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। নিয়মিত বাসে যাতায়াত করেন। তিনি জানান, বেশকয়েকদিন ধরে তিনি এই পথ হেঁটে অফিসে যাতায়াত করছেন। তবে রাস্তা বা ফুটপাত ভালো না থাকায় স্বাচ্ছন্দে হাঁটতে পারছেন না।

মগবাজারের বাসিন্দা জিয়াউল হক সরকার বলেন, নগরীতে হাঁটার জন্য নির্দিষ্ট জায়গার অভাবে ভোগান্তি হচ্ছে। কেউ কেউ ভোরবেলা বা গভীর রাতে হাঁটার চেষ্টা করেন যখন রাস্তা কিছুটা ফাঁকা থাকে। আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে জিমে গিয়ে হাঁটেন। ছোটবেলায় আমরা রাস্তায় খেলতাম, হাঁটতাম। এখন বাচ্চাদের নিয়ে বাইরে বের হওয়াই কঠিন। আমি প্রতিদিন সকালে হাতিরঝিলে হাঁটতে বের হই। কিন্তু নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে আসতে পারি না। সিটি করপোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝে মাঝে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান পরিচালনা করে। কিছু এলাকায় ওয়াকওয়ে বা হেঁটে চলার পথ তৈরির উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হচ্ছে না। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে নগরবাসীর জন্য হাঁটার জায়গা নিশ্চিত করতে হবে।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, আমরা কখনও সমন্বিত পরিকল্পনা দেখি নাই। ফুটপাত থেকে হকার মুক্ত করার জন্য বহু উদ্যোগই কিন্তু ছিল। কিন্তু দেখা যায় কোনো উদ্যোগই কাজে আসেনি। তারা কিন্তু একটা চক্রকে মাসোহারা দিয়ে কোনো না কোনো উপায়ে ব্যবসা পরিচালনা করে। এক্ষেত্রে যেসব চক্র হকারদের এসব জায়গায় বসাচ্ছে, তারা কিন্তু বড় একটা স্টেক হোল্ডার এই পুরো সিস্টেমের।