Image description

জ্বালানি সরবরাহে টানাপড়েনের কারণে শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও গ্রামে লোডশেডিং বাড়ানো হচ্ছে। একদিকে যেমন গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহ বাড়ছে, অপরদিকে লোডশেডিংও বৃদ্ধির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কোনও কোনও এলাকায় দিনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। গত কয়েক বছর ধরে লোডশেডিং কম হলেও এবার লোডশেডিং বাড়বে এবং মানুষকে এই পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে, বলছেন  সংশ্লিষ্টরা।

অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও জ্বালানি খাতে ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। এছাড়াও দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া এবং জ্বালানি কেনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থান না থাকায় লোডশেডিং করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। ইরান যুদ্ধ শেষ না হলে এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের কোনও সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, ইতোমধ্যে দেশে তরল জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমানো হয়েছে। সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার তরল জ্বালানিনির্ভর ফার্নেস অয়েল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমিয়ে ২ হাজার ১০০ মেগাওয়াট করা হয়েছে। একইসঙ্গে ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের মধ্যে আদানির সরবরাহ অর্ধেকে নেমে এসেছে। সোমবার (৬ এপ্রিল) দিনের বেলায় প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে আদানি। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে।

সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, চাইলেও জ্বালানি তেল চাহিদা অনুযায়ী আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়টি বৈশ্বিক সংকটের ফলাফল। এর মধ্যে দেশের সবচেয়ে বেশি ফার্নেস অয়েল সরবরাহকারী ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ যদি বন্ধ হয়—তাহলে অস্থায়ীভাবে পরিশোধনাগারটি বন্ধ রাখতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে মার্চে কোনও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা সম্ভব হয়নি। এপ্রিলেও কোনও জ্বালানি তেল আসবে না। ফলে পরিশোধনাগারটি কিছু দিন বন্ধ রাখা হবে। পরিশোধনাগারটি মোট পরিশোধিত তেলের ৮৪ ভাগই ফার্নেস অয়েল উৎপাদন করে, যার পুরোটাই দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার হয়। এর বাইরেও দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফার্নেস অয়েল আমদানি করতে হয়।

পিডিবি সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে ওঠানামা করছে। অথচ উৎপাদনে ঘাটতির কারণে প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ কম সরবরাহ করা হচ্ছে। এর ফলেই বিভিন্ন এলাকা বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে নিয়মিত লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।

দেশের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে এর বড় অংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের সক্ষমতা ৭ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি হলেও সরবরাহ ঘাটতির কারণে এসব কেন্দ্র পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।

বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকরা বলছেন, তাদের কাছে সরকারের বিপুল পরিমাণ বকেয়া জমে আছে, যার পরিমাণ প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর পাওনা ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় তারা নতুন করে জ্বালানি আমদানির জন্য ঋণপত্র খুলতে পারছেন না। ফলে অনেক কেন্দ্রের জ্বালানি মজুত দ্রুত কমে আসছে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গ্রামাঞ্চলের অনেক এলাকায় দিনে কয়েক দফায় বিদ্যুৎ যাচ্ছে, কোথাও মোট সময় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে গরমের মধ্যে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ যেমন বাড়ছে, তেমনই সেচ কার্যক্রমেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে। একদিকে তীব্র গরম, অপরদিকে বিদ্যুৎ না থাকার কারণে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। এখন গ্রামের মানুষও বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। শুধু লাইট জ্বালানো বা ফ্যান ঘোরানোর জন্য তারা বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন না— বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মোটর দিয়ে পানি তোলা, টিভি ও ফ্রিজ ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়লেও বিদ্যুৎ না থাকায় তারা বিপাকে পড়েছেন।

ঢাকার বেশিরভাগ এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহকারী ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক (আইসিটি) রবিউল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সোমবার দুপুর দুইটায় তাদের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৭৪৯ মেগাওয়াট, পুরোটাই সরবরাহ হয়েছে, কোনও লোডশেডিং নেই।

ঢাকার আরেক বিতরণ কোম্পানি ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমাদের অধীন ঢাকার কোনও এলাকায় কোনও লোডশেডিং হচ্ছে না। চাহিদা অনুযায়ী আমরা বিদ্যুৎ পাচ্ছি। আজ দুপুর ১টায় চাহিদা ছিল ১ হাজার ২৪৭ মেগাওয়াট, যার পুরোটাই আমরা পেয়েছি।’’

আরইবি’র বিদ্যুৎ বিতরণ পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাদের এলাকায় নিয়মিত বিরতিতে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। মূলত সরবরাহ কম পাওয়ার কারণেই লোডশেডিং হচ্ছে বলে তারা জানিয়েছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার সুলতান নাসিমুল হক বলেন, ‘‘গত দুই-তিন দিন ধরেই লোডশেডিং করতে হচ্ছে। গড়ে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ লোডশেডিং করতে হয়। রবিবার (৫ এপ্রিল) সন্ধ্যায় চাহিদা ছিল ৮৫ মেগাওয়াট। পুরোটা দেওয়া যায়নি। গত কয়েক দিন ধরেই লোডশেডিং করতে হচ্ছে।’’

এদিকে সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার আজিজুর রহমান সরকারও তার এলাকায় লোডশেডিং হচ্ছে জানিয়ে বলেন, ‘‘রবিবার রাত ৯টায় চাহিদা ছিল ১০৭ মেগাওয়াট, আমরা সরবরাহ পেয়েছি ৭৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ৩২ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে।’’

বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে জানানো হয়, পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। দোকানপাট ও বিপণিবিতানের সময়সীমা কমানো, অফিস সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা এবং অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব হতে পারে।

সব মিলিয়ে স্পষ্ট, জ্বালানি সংকটের এই চাপ সামলাতে আপাতত লোডশেডিংই হয়ে উঠেছে প্রধান সমাধান, যার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে গ্রামাঞ্চলে। শহরে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে গ্রামে বিদ্যুৎ ঘাটতি বাড়ানো হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও কৃষিকাজ দুটোই ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।