Image description
বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশ্লেষকদের অভিমত

ইরান যুদ্ধের কারণে গোটা বিশ্ব এখন সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জ্বালানিসহ নানা সংকট বিশ্ব অর্থনীতিতে গভীর বিপদের বার্তা দিচ্ছে। তবে এই সংকট সৃষ্টির জন্য দায়ী না হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশসহ কোনো দেশই এর প্রভাব এড়াতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে উত্তপ্ত হতে যাচ্ছে দেশের রাজপথ। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বৈশ্বিক এই সংকটকালে বিরোধী দল রাজপথে আন্দোলনে নামলে তা সুখকর হবে না। বরং তা সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। তাদের মতে, এই মুহূর্তে জ্বালানিসহ ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অন্যান্য সংকট মোকাবিলাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশ কীভাবে এটাকে মোকাবিলা করবে, স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নীতির কী কী পরিবর্তন আনা দরকার-তা নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন পর একটি নির্বাচন হয়েছে। এখন দেশে নির্বাচিত সরকার, সংসদ ও বিরোধী দল আছে। তাদের আচার-আচরণ বা রাজনৈতিক ভূমিকায় সব সময় মনে রাখতে হবে যেন কোনোভাবেই দেশে আর অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি না হয়। যে কোনো সমস্যার সমাধান করতে হবে ঐক্য ও আলোচনার মাধ্যমে। এটা থেকে বিচ্যুত হলে সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলেও মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাবেক উপাচার্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, সংবিধান সংশোধন বা সংস্কার নিয়ে রাস্তায় নামার তো কোনো দরকার নেই। কারণ আমি মনে করি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই এসব সমস্যা ও মতবিরোধের সমাধান করা সম্ভব। তার মতে, এটাই হওয়া উচিত। তাছাড়া সংস্কার ইস্যুতে আন্দোলন দু-এক মাস পরে হলেও খুব বেশি ক্ষতি হবে না। কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান যে সংকট, যা আবার আমাদের দ্বারা সৃষ্টি নয়। ইরান এবং আমেরিকা ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধের কারণে এই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। ঢাবির সাবেক এই উপাচার্য বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়-সারা পৃথিবীতেই জ্বালানিসহ নানা সংকট দেখা দিচ্ছে। সরকার ও বিরোধী দল সম্মিলিতভাবে এটা কীভাবে মোকাবিলা করবে, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সরকার কৃচ্ছ সাধনসহ নানা পদক্ষেপ নিতে পারে। নিচ্ছেও। পাশাপাশি সরকার বিভিন্ন মাধ্যম থেকে তেল আনার চেষ্টাও করছে। এখন আমাদের ভোগবিলাস কমাতে হবে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে। তিনি আরও বলেন, এই মুহূর্তে যদি বিরোধী দল রাজপথে আন্দোলনে নামে তাহলে সেটা কোনোভাবেই সুখকর হবে না। বরং তা সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। তাছাড়া নতুন সরকারের মাত্র এক বা দেড় মাস হয়েছে। এখনই রাজপথে আন্দোলনে নামলে জনগণ সেটা ভালোভাবে নেবে বলেও আমার মনে হয় না। অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, অনেক বছর পর একটা নির্বাচন হয়েছে। সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি সরকার এসেছে, সংসদ এসেছে। বহু দিনের বহু সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই পরিস্থিতিটা তৈরি হয়েছে। ফলে এখন যারা সরকারে এবং বিরোধী দলে আছেন তাদের আচার-আচরণ রাজনৈতিক ভূমিকা কিংবা এজেন্ডা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এটা বিবেচনার মধ্যে রাখা উচিত, যাতে আর নতুন কোনো অস্থিতিশীলতা কিংবা জনগণের দুর্ভোগ তৈরি না হয়। তিনি বলেন, রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে, বিরোধিতাও থাকবে। সবাই তো সবকিছুতে একমত হবে না। সরকারের কিছু এজেন্ডা আছে। বিরোধী দলেরও এজেন্ডা আছে। সেগুলো যতটা সম্ভব আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার চেষ্টা করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, এখন জ্বালানি নিয়ে একটা বৈশ্বিক সংকট তৈরি হয়েছে। এই মুহূর্তে সংসদে কয়েকটা বিষয়ে আলোচনা বেশি আসা দরকার। একটা হলো এই সংকট বৈশ্বিক। আমাদের একার নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। ফলে বাংলাদেশ কীভাবে এটাকে মোকাবিলা করবে, স্বল্পমেয়াদে বা দীর্ঘমেয়াদে, জ্বালানিনীতির মধ্যে কী কী পরিবর্তন আনা দরকার তা নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। যাতে সংকট হলেও বাংলাদেশের সমস্যা না হয়। আরেকটা বিষয় আলোচনা করা খুব জরুরি; সেটা হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিগত সরকার একটা সর্বনাশা চুক্তি করে গেছে। খুবই বিপজ্জনক চুক্তি। এই চুক্তির কারণে জ্বালানি, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, স্বাধীনতা সবকিছুতেই একটা বিপদ হবে। ফলে সেই চুক্তি থেকে বের হওয়ার রাস্তা বের করাটা সংসদে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, এই সংকটের সময় ঐক্যবদ্ধ থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঐক্যবদ্ধভাবেই জ্বালানিসহ সব সমস্যা আমাদের সমাধান করতে হবে। তিনি আরও বলেন, এখন আমাদের নির্বাচিত সরকার হয়েছে। আমাদের সংসদ আছে। বিরোধী দলও আছে। আমরা আশা করেছিলাম যে, তারা পরস্পরের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একজন অন্যজনের প্রতি আস্থা রেখে সমস্যাগুলো সমাধান করবে। ঐক্যবদ্ধভাবে সবকিছু করবে এবং ঐক্যই হবে যে কোনো সমস্যা সমাধানের পথ। কিন্তু এটা থেকে বিচ্যুত হলে সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। ফলে একজন নাগরিক হিসাবে অনৈক্য বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি কোনোভাবেই আমাদের প্রত্যাশা নয়। মতবিরোধের কারণে রাজপথ নয়, আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা। এ ব্যাপারে সরকারি ও বিরোধী দলকে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদের মতে, বিএনপি সরকারে আছে। এখানে অবশ্যই বিএনপির দায়িত্ব বেশি। তিনি বলেন, জুলাই সনদের বিষয়টা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। তাই সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রক্রিয়ার মধ্য থেকেই সমাধান করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু জেনে-শুনে বিরোধী দলকে আন্দোলনের জায়গায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে কি না সে প্রশ্ন আছে। কারণ সংবিধান সংস্কার একটা ‘সেটেল্ড ইস্যু’। এখন সংকট তো আছেই। এই বৈশ্বিক সংকট নিয়ে সবাই তো অবগত। আবার সেই সংকট থেকে উত্তরণের সময় এই ধরনের ক্রাইসিসও কারোরই কাম্য ছিল না। কিন্তু আমি মনে করি এটা বিএনপি নিজেরাই তৈরি করছে। একদিকে আপনি বিশ্ব সংকটের কথা বলবেন, আবার নিজেরা ক্রাইসিস তৈরি করবেন এটা তো হতে পারে না।

গণভোটের আলোকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে আজ শনিবার বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ ১১ দলীয় ঐক্য। এদিকে সরকারি দল বিএনপি বলছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ অস্তিত্বহীন। এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন জরুরি। এজন্য সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা হবে। এছাড়া যে অধ্যাদেশের ভিত্তিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট হয়েছে, বৃহস্পতিবার সেই অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। এ অবস্থায় গণভোট প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া ছাড়াও বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হতে পারে। কেউ কেউ এ-ও বলছেন, অধ্যাদেশ বাতিল হলে পুরো গণভোট অবৈধ হয়ে যাবে। এদিকে গত ৩ মার্চ গণভোট এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। ফলে বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে এক ধরনের আইনি জটিলতাও তৈরি হয়েছে। এতে করে সবকিছু মিলে দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে-এমনটিই মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে।