ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের আগুন এখন পোড়াচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন। মৌসুমজুড়ে চাষির ঘামে ফলেছে বাম্পার সবজি ও ফলমূল। কিন্তু পরিবহণে তেলের অভাবে টমেটো, তরমুজ, আনারসসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল ও সবজি বাজারের মুখ দেখার আগে খেতেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেকে উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে বিক্রি করছেন সোনার ফসল। কখনো বা বিক্রি করার সুযোগই পাচ্ছেন না। ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষক। এতে ফল-ফসলে ভরা মাঠ যেন এক নীরব কান্নার সাক্ষী হচ্ছে। মাঠে ফসল থাকলেও কৃষকের মুখে নেই হাসি। এতে একদিকে যেমন কৃষকের আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে, অন্যদিকে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মন্ডল বলেন, কোথাও তেলের সমস্যা নেই। ভবিষ্যতে তেল পাওয়া যাবে কিনা এমন আতঙ্ক কাজ করছে। তাই পাম্পগুলোতে সবাই ভিড় করছে। তবে তেলের অভাবে দেশের কোনো জমিতে সেচ দেওয়া যায়নি এমন নজির নেই। তিনি জানান, মাঠপর্যায়ে সেচের জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সক্রিয় আছেন।
যুগান্তরের রাঙামাটি প্রতিনিধি জানান, রাঙামাটিতে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে সবজিসহ নিজেদের উৎপাদিত পণ্য পরিবহণে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। পণ্য পরিবহণে বেকায়দায় ব্যবসায়ীরাও। উৎপাদিত সবজির পাশাপাশি আনারস, তরমুজ, কলা বাজারে পৌঁছানো নিয়ে অসহায় কৃষক। বিশেষ করে কাপ্তাই হ্রদকেন্দ্রিক নৌপথ ও সড়কপথের পরিবহণ সীমিত হয়ে পড়ায় পাহাড়ের উৎপাদিত শাকসবজি শহরে নিয়ে আসা অনেকটা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। জ্বালানি তেলের সংকটে ইতোমধ্যে বন্ধ করে দিতে হয়েছে বহু ইঞ্জিনচালিত নৌকা। শুক্রবার রাঙামাটি শহরের বনরূপা কাঁচাবাজারে গিয়ে জানতে চাইলে ব্যবসায়ীরা বলেন, পরিবহণ সীমিত হয়ে পড়ায় জেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে পর্যাপ্ত কাঁচা তরকারি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজি কমে যাচ্ছে। বেশি দামেও সবজি পাওয়া যাচ্ছে না। জ্বালানি না থাকায় কাপ্তাই হ্রদ দিয়ে পরিবহণ ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছে। দুর্গম এলাকা থেকে সবজি পরিবহণে ব্যবহৃত ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। সড়কপথেও পিকআপ ও ট্রাক চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে।
বরকল উপজেলা থেকে রাঙামাটি শহরে সবজি নিয়ে আসা কৃষক সোহেল চাকমা বলেন, অতিরিক্ত পরিবহণ ভাড়া এবং ইঞ্জিনবোট চলাচল সীমিত হয়ে যাওয়ায় খেত থেকে উৎপাদিত সবজি বাজারে নিয়ে আসা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত পরিবহণ ভাড়ায় সবজি নিয়ে এলেও লোকসান। তাই খেতেই সবজি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের রাঙামাটির উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, জ্বালানি তেলের সংকটে সেচকাজে কিছু সমস্যা হচ্ছে। তবে এভাবে চলতে থাকলে অবশ্যই বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হতে পারে। অনেকে দূরের উপজেলা থেকে রাঙামাটি শহরে তেল নিতে আসেন। ফলে কৃষিকাজে ব্যয় বাড়ছে। তবে প্রকৃত কৃষক যাতে ডিজেল পান সে বিষয়ে আমরা কাজ করছি। জ্বালানি তেলের অভাবে কাপ্তাই হ্রদকেন্দ্রিক ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচল সীমিত বা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে সবজি, আনারস, তরমুজ, কলাসহ কৃষকদের উৎপাদিত ফল-ফসল পরিবহণ নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পাবনা প্রতিনিধি জানান, জ্বালানি তেল সংকটের কারণে পাবনার কৃষকরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, পাবনা দেশের প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা। এ বছর পাবনায় মৌসুমি বা হালি পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে ৫৪ হাজার ৭৫ হেক্টরে। এতে কমপক্ষে সাড়ে ৮ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও বাম্পার ফলন হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছে কৃষি বিভাগ। আবার এ বছর জেলায় প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে সবজির আবাদ হয়েছে। এতে বাম্পার ফলন হওয়ায় কমপক্ষে ৪ লাখ টন সবজি উৎপাদনের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু ফলন বেশ ভালো হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই।
পাবনার ঈশ্বরদীর খ্যাতিমান ও জাতীয় পদক পাওয়া কৃষক সিদ্দিকুর রহমান ময়েজ ওরফে কুল ময়েজ বলেন, এখন পটোল, ঢেঁড়স, ঝিঙে, বেগুন, লাউ ও টমেটোসহ সব ধরনের সবজি উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু আড়ত থেকে এসব পণ্য ট্রাকে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পরিবহণে তেল সংকটের কারণে সবাই চরম সমস্যায় পড়েছেন। তিনি বলেন, পাম্প থেকে তেল নিতে যানবাহনকে ৩-৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করে লাইন দিয়ে তেল নিতে হচ্ছে। এতে করে যথাসময়ে পণ্যবাহী ট্রাক গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় অনেক সবজি পচে যাচ্ছে বা মান নষ্ট হচ্ছে। ফলে ফসলের দাম কমে যাচ্ছে। আবার তেলের সংকটের কারণে পরিবহণের ভাড়াও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।
দৌলতপুর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, সরেজমিন দৌলতপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে-জিয়নপুর, বাঘুটিয়া, চরকাটারী ও বাচামারার ইউনিয়নের চরাঞ্চল থেকে ট্রলারে করে সবজিগুলো প্রথমে ঘাটে আনা হয়। সেখান থেকে ঘোড়ার গাড়িতে বা পিকআপে করে ঢাকা ও সাভারে পাঠানো হয়। কিংবা উপজেলা শহরে আনা হয়। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে নদীতে ট্রলার ও পিকআপের চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে।
দৌলতপুরের চরাঞ্চলের সবজি চাষি মো. ফুলচান শেখ বলেন, এ বছর প্রচুর টমেটো আর আলু হয়েছে। কিন্তু গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। দুদিন ধরে বস্তা ভরে ঘাটে বসে আছি। মাল ঢাকা নিতে পারছি না। টমেটো পচে যাচ্ছে। বাজারে আলুর দামও কমে গেছে। অথচ খরচ বাড়ছে।
একই অঞ্চলের পরিবহণ শ্রমিক মামুন মিয়া জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও চাহিদামতো ডিজেল মিলছে না। ফলে যাতায়াত খরচ বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। ব্যবসায়ীরা বায়না দিয়েও পরিবহণ পাচ্ছে না। তাই কৃষকের সবজি বিক্রি কমে গেছে। এতে কৃষক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
তারাইল (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, তাড়াইলে ট্রাক ভাড়া বেশি নেওয়ার কারণে বেকায়দায় পড়েছেন আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা। সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত কয়েকদিনের ব্যবধানে জায়গাভেদে ট্রাক ভাড়া ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট রুটে ট্রাক পাওয়া যেমন দুষ্কর হয়ে পড়েছে, তেমনি গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। তাড়াইলের আড়তদার শহিদ বলেন, আগে যে ট্রাক ঢাকা যেত ৭ হাজার টাকায়, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার টাকায়। পরিবহণ খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দামের ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে। কৃষকের পণ্য সময়মতো দেশের বিভিন্ন বাজারে পাঠাতে না পারলে পচে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই সুযোগে ট্রাক মালিক ও চালকরা ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়াচ্ছেন। আমাদের পিঠ এখন দেওয়ালে ঠেকে গেছে।
ভোলা প্রতিনিধি জানান, ভোলায় জ্বালানি তেলের সংকটের অজুহাতে পরিবহণ ভাড়া অনেক বাড়িয়ে দেওয়ায় উৎপাদিত তরমুজ ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষকরা। ফলে খেতে স্তূপ করে রাখা তরমুজ পচে যাচ্ছে। শুক্রবার কাচিয়া মাঝেরচর থেকে কৃষক শাহাবুদ্দিন ফরাজি জানান, তরমুজ উৎপাদন করে লোকসানে পড়েছেন। পরিবহণের টাকা জোগান দিতে না পারায় খেতের তরমুজে পচন ধরেছে। প্রথমদিকে যে তরমুজ ৩ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে সেই চালান এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায়।