হদিস নেই ১৪ বছর। জীবিত না মৃত। কোনো কিছুই জানা যায়নি। একবারের জন্য তাকে গুমের কথা কেউ স্বীকার করেনি। কোথায় আছে, কেমন আছে জানে না পরিবারও। সিলেটের তুখোড় ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমদ দিনারের কথা। তখনকার জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক। সাহসী এক রাজনৈতিক কর্মী। ইলিয়াসের মতো নির্ভীক ছিল দিনারও। সরকারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথ কাঁপিয়ে তুলতো। সেই দিনার সরকারবিরোধী আন্দোলনে মামলার পর মামলায় জর্জরিত হয়ে ফেরারি ছিল। আর ফেরারি অবস্থায় নিখোঁজ হয়ে যায়। সঙ্গে ছিল আরেক ছাত্রদল কর্মী জুনেদও। ২০১২ সালের এপ্রিল মাস সিলেটের মানুষের জন্য একটি কালো অধ্যায়। এই মাসে গুম হন বিএনপি’র তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী সহ ৪ জন। ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হন এপ্রিলের ১২ তারিখ। তার ৯দিন আগে ৩রা এপ্রিল গুম হন জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার আহমদ দিনার। ছাত্রদলের তুখোড় নেতা হওয়ায় রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ছিল সে। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যতম স্পট লাইটেও ছিল।
আন্দোলনে প্রশাসনের সব বাধা উপেক্ষা করে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলে। এ কারণে অনেকের কাছে চক্ষুশূল হয়ে গিয়েছিল দিনার। নগরের উপশহরকেন্দ্রিক রাজনীতির সে ছিল বাধাহীন এক কর্মী। আন্দোলনে মাঠে থাকার কারণে একের পর এক মামলায় জর্জরিত হয় দিনার। সিলেটের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে ধরার জন্য দফায় দফায় অভিযান চালায়। গ্রেপ্তার এড়াতে বন্ধু জুনেদকে নিয়ে পাড়ি জমায় ঢাকায়। শোনা গিয়েছিল; হাইকোর্ট থেকে জামিন নিতে গুম হওয়ার কয়েকদিন আগে ঢাকায় যায়। স্বজনরা জানিয়েছেন, গুম হওয়ার সময় দিনারের অবস্থান ছিল রাজধানী উত্তরায়। সেখান থেকেই বন্ধু জুনেদ সহ গুম হয় দিনার। এরপর থেকে তাকে অনেক খোঁজাখুঁজি করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুয়ারে দুয়ারে ছুটেছেন। কেউ খোঁজ দিতে পারেননি। দিনারের অপেক্ষায় এখনো পরিবার। প্রতি বছর ৩রা এপ্রিল এলে দিনারের সন্ধান কামনা করে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয় নগরের উপশহরের বাসায়। এ জন্য গতকালও দিনারের জন্য দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। দোয়া মাহফিলের পর দিনারের দুলাভাই ও সিলেট জেলা বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক শামীম আহমদ জানিয়েছেন- আমরা আশাবাদী দিনার এখনো জীবিত অবস্থায় আছে।
বিগত সরকারের বাহিনী তাকে গুম করে রেখেছে। এ জন্য আমরা আশাবাদী দিনার ফিরবেন। তিনি বলেন- এই সরকারের শীর্ষ মহল থেকে আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে যারা গুম হয়েছেন সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদের সঠিক খবরটা জানানো হবে। আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তিনি আশ্বস্ত করেছেন যারা গুম হয়েছেন তাদের একটি সিদ্ধান্ত সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের জানাবেন। অনুমাননির্ভর বলার এখন সুযোগ নেই। আমরা যেহেতু ১৪ বছর অপেক্ষা করেছি আশা করি ভালো কিছু সংবাদ পাবো। দোয়া মাহফিলের সময় থেকেই ঘরের ভেতরের একটি রুমে অঝোরে কাঁদছিলেন দিনারের বোন সিলেট জেলা মহিলা দলের ভারপ্রাপ্ত সভানেত্রী তাহসিন শারমিন তামান্না। ভাইয়ের জন্য অস্থির তিনি। কেউ স্বীকারও করেনি তাকে গুম করা হয়েছে। তামান্না সাংবাদিকদের জানিয়েছেন- ৩রা এপ্রিলের রাতের মধ্যে তার ভাইকে গুম করা হয়েছে। দীর্ঘ ১৪ বছরের একেকটা দিন, একেকটা মাস, একেকটা বছর কীভাবে পাড়ি দেই সেটা বলে বুঝাতে পারবো না। আমি প্রতিদিনই আমার ভাইকে মিস করি। প্রতিদিনই তার কথা মনে হয়। তিনি বলেন- যেহেতু কেউ এখন পর্যন্ত বলেনি যে, আমার ভাইকে মেরে ফেলা হয়েছে। এরকম সাক্ষ্য কেউ দেয়নি। আমরা সেটা বিশ্বাসও করি না। আমরা বিশ্বাস করি আমার ভাই ফিরে আসবে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারকে বিতাড়িত করার আন্দোলনের জন্যই আমার ভাইটা গুম হয়েছিল। এ ছাড়া গুম কমিশন এ নিয়ে অনুসন্ধান চালালেও তাদের কাছ থেকে কোনো সদুত্তর মিলেনি।