দেশে মারাত্মক টিকা সংকটের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে এই রোগে ৪১ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) সঠিকভাবে পরিচালনায় দেশে বছরে প্রায় ১৫শ কোটি টাকার টিকা প্রয়োজন। অথচ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এ খাতে বরাদ্দ করা হয় মাত্র ৪৬২ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপর্যাপ্ত বরাদ্দ, টিকা সরবরাহে ঘাটতি এবং পরিকল্পনার দুর্বলতার কারণে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
গত ৩০ মার্চ সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির তথ্যে দেখা যায়, ওই দিন পর্যন্ত দেশে প্রয়োজনীয় বেশিরভাগ টিকার মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এমআর (হাম-রুবেলা) টিকার মাসিক চাহিদা যেখানে ২ লাখ ১৫ হাজার ভায়াল, সেখানে একটি সিঙ্গেল ডোজ টিকাও অবশিষ্ট ছিল না। ওপিভি টিকা ছিল মাত্র ৪ হাজার ৪২০ ভায়াল, যেখানে মাসিক চাহিদা ১ লাখ ২৫ হাজার ভায়াল। অর্থাৎ ৩০ মার্চের মজুত দিয়ে এক দিনের বেশি চলা সম্ভব নয়, যার মানে দাঁড়ায়—এরই মধ্যে সেই টিকা শেষ হয়েছে।
একইভাবে টিডি টিকা ছিল ২০ হাজার ৬৭ ভায়াল, যা দিয়ে মাত্র পাঁচ দিনের চাহিদা মেটানো যাবে। সেই হিসাবে আগামী দুই দিন পরে ফুরিয়ে যাবে টিডি টিকা। বিসিজি টিকার মজুত ছিল ৫৫ হাজার ৩২৪ ভায়াল, যা দিয়ে প্রায় ১২ দিন চলা সম্ভব, অর্থাৎ আর ৯ দিন পরে বিসিজি টিকার মজুতও শেষ হবে। পেন্টাভ্যালেন্ট টিকার মজুত ছিল ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৮২৪ ভায়াল, যেখানে মাসিক চাহিদা ১০ লাখ ২০ হাজার ভায়াল। এই হিসাবে প্রায় ১৩ দিনেই মজুত শেষ হওয়ার কথা, অর্থাৎ মজুত শেষ হবে ১০ দিন পরে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, পিসিভি টিকার কোনো মজুত নেই, যদিও মাসিক চাহিদা দুই লাখ ৬০ হাজার ভায়াল। আইপিভি টিকা ১২ হাজার ৮৪৩ ভায়াল থাকলেও এটি দিয়ে প্রায় ১০২ দিন চলা সম্ভব। অন্যদিকে এইচপিভি ও টিসিভি টিকার মজুত তুলনামূলকভাবে বেশি থাকলেও, তা সামগ্রিক সংকট কমাতে পারছে না।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, অন্তর্বর্তী সরকার অনেকটা অর্বাচীনের মতো স্বাস্থ্য খাত পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বাতিল করে বড় ধরনের নীতিগত ভুল করেছে। তিনি বলেন, ওপি বাতিল করার পর কীভাবে স্বাস্থ্য খাত পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। এমনকি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মপরিধি এবং ব্যাপ্তি সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিল সীমিত। ফলে টিকা সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
তিনি আরও জানান, ওই সময় টিকা কেনার জন্য ৪৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়নি। ২০২৫ সালের জাতীয় বাজেটে এ খাতে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও ক্রয় প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়। মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দের অর্ধেক টাকা দিয়ে ইউনিসেফ থেকে এবং বাকিটা ডিপিএম (সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি) পদ্ধতিতে টিকা কেনার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু ডিপিএম পদ্ধতিতে টিকা কেনার সুযোগ না থাকায় সে সময় কোনো কার্যকর ক্রয় সম্পন্ন করতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ৪৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং এর মধ্যে প্রায় ৪৫৮ কোটি টাকার টিকা কেনা হয়। তবে এটি মোট চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট ছিল না।
তিনি জানান, স্বাভাবিকভাবে ইপিআই কার্যক্রম চালাতে বছরে প্রায় ১৫শ কোটি টাকার টিকা প্রয়োজন, যেখানে সিরিঞ্জসহ অন্যান্য ব্যয় অন্তর্ভুক্ত নয়। এরই মধ্যে বাজেট থেকে ২৪২ কোটি টাকার টিকা কেনা হয়েছে এবং ইউনিসেফ থেকে টিকা কিনতে আরও ৪১৯ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। এ ছাড়া জরুরি ক্যাম্পেইনের জন্য ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এমআর, ওপিভি, টিডি, বিসিজি, পেন্টাভ্যালেন্ট, পিসিভি, আইপিভি, এইচপিভি ও টিসিভি টিকা বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। এসব টিকা যক্ষ্মা, পোলিও, হাম, রুবেলা, ধনুষ্টংকার, ডিপথেরিয়া, নিউমোনিয়া, টাইফয়েড এবং জরায়ুমুখের ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগ থেকে দেশের মানুষকে সুরক্ষা প্রদান করে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব আরও বাড়তে পারে এবং সে ক্ষেত্রে শিশু মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়বে। তারা জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ, ক্রয় প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং টিকা সরবরাহ চেইন পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামিম তালুকদার বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে যারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন, তারা স্বাস্থ্যই বুঝতেন না। ফলে তারা অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) কাটআপ করে দেশের মানুষকে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। যার ফলে আজকের এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যাদের অযোগ্যতা ও অদক্ষতায় এত শিশুর মৃত্যু হলো, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।