Image description
মালয়েশিয়ায় লোক পাঠাতে ব্যাপক চাঁদাবাজি

মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর নামে হাজার হাজার কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়েছে। নেপথ্যে ছিল ১৫ জনের প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। গডফাদার ছিলেন সাবেক প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী ইমরান আহমেদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপেদষ্টা সালমান এফ রহমান এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী আ ফ ম মোস্তফা কামাল ওরফে লোটাস কামালসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু ব্যক্তি।

রিক্রুটিং এজেন্সি মেসার্স ইউনাইটেড এক্সপোর্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম রফিক এ বিষয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে সব ফাঁস করে দিয়েছেন। গত ডিসেম্বরে তিনি জবানবন্দি দেন এবং এর ভিত্তিতে এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্তদের মধ্যে অন্যতম হিসাবে সম্প্রতি লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়। বর্তমানে তিনি রিমান্ডে আছেন। তিনিও রিমান্ডে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, এ বিষয়ে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মামলা হওয়ার পর রিক্রুটিং এজেন্সি মালিক এস এম রফিক জামিন নেন। এরপর স্বেচ্ছায় হাজির হয়ে তিনি আদালতে জবানবন্দি দেন। আদালতে দেওয়া জবানবন্দির কপি যুগান্তরের হাতে এসেছে। যেখানে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনেকের নাম উল্লেখসহ চাঞ্চল্যকর নানান তথ্য রয়েছে।

ডিবি সূত্র জানায়, লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত ১০ হাজার লোক পাঠানো হয় মালয়েশিয়ায়। প্রত্যেকের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে নির্ধারিত ফি’র চেয়ে মোটা অঙ্কের অতিরিক্ত টাকা। এছাড়া বাংলাদেশে প্রায় তিন হাজার রিক্রুটিং এজেন্সি বা জনশক্তি প্রতিষ্ঠান থাকলেও সিন্ডিকেট ছিল ১০৩টি এজেন্সির। এসব এজেন্সি ছাড়া অন্য কোনো এজেন্সিকে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠাতে দেওয়া হয়নি।

সূত্রমতে সাবেক মন্ত্রী ইমরান, সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং সাবেক মন্ত্রী লোটাস কামাল ছাড়াও সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যরা হলেন- লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, আমি ওরফে দাতু আমিন, রুহুল আমিন স্বপন, সাবেক এমপি আলাউদ্দিন নাসিম, নিজাম হাজারী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, ড. মনিরুস সালেহীন ও নূর আলী প্রমুখ। এই সিন্ডিকেটের সদস্য হতে গেলে শুরুতেই দিতে হতো ১০ কোটি টাকা। এই টাকা উঠাতেন মাসুদ উদ্দিন, রুহুল আমিন স্বপন, আমিনুল ইসলাম বিন আব্দুল নুর, আবুল বাসার নুর আলী ও দাতু আমিন।

এদের মধ্যে দাতু আমিন ও রুহুল আমিন নূরের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। সিন্ডিকেট সদস্যদের মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করতেন তারা। সিন্ডিকেট সদস্যরা লোক সংগ্রহ করতেন বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে। কেবলমাত্র সিন্ডিকেট সদস্যদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানই নয়, ১০৩টি প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক মালিকই মালয়েশিয়াগামী ব্যক্তিদের কাছ থেকে সরকারি ফি’র চেয়ে দেড় থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত বেশি করে আদায় করতেন। অবশ্য যেসব এজেন্সির কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়েছে সেসব এসেন্সি মালিকরা এখন আদালতে সাক্ষ্য দিতে রাজি হয়েছেন। ইতোমধ্যে তারা ডিবির সঙ্গেও যোগাযোগ করছেন।

সূত্র জানায়, কেবল ওই অতিরিক্তি টাকা আদায় করেই ক্ষান্ত ছিলেন না চক্রের সদস্যরা। তারা খুলেছিলেন ‘আমি প্রবাসী’ নামের একটি অ্যাপ। এই অ্যাপের কোনো সরকারি অনুমোদন না থাকলেও যারা মালয়েশিয়া যেতে আগ্রহ দেখাতেন তাদের সবাইকে ওই অ্যাপে নিবন্ধন করতে হতো। এ ক্ষেত্রে নেওয়া হতো ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা। এভাবে ফি দিয়ে প্রায় এক কোটি লোক নিবন্ধন করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এছাড়া কোভিড টেস্ট, পাসপোর্ট খরচ ও মেডিকেল চেকআপসহ নানা বাহানায় নেওয়া হতো মোটা অঙ্কের অতিরিক্ত টাকা। এ বিষয়ে রিক্রুটিং এজেন্সি মেসার্স ইউনাইটেড এক্সপোর্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম রফিক (মামলার আসামি) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন।

আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে এসএম রফিক বলেন, ‘রুহুল আমিন স্বপন, নূর আলী, আমিনুল ইসলাম বিন আব্দুল নুর, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, নিজাম হাজারী, আলাউদ্দিন নাসিম এবং বাসেদসহ বেশ কয়েকজন ছিল মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানো নেপথ্যের কারিগর। শেখ হাসিনার জ্ঞাতসারে তারা স্মার্ট বাংলাদেশ নামক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে হাতিয়ে নিয়েছেন হাজার হাজার কোটি টাকা। যারা খুবই ব্যাপকভাবে চাঁদাবাজি করতেন।

আমার এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ার লোক পাঠানোর সময় রুহুল আমিন স্বপনকে প্রথম ধাপে দুই লাখ ও দ্বিতীয় ধাপে দেড় লাখ করে চাঁদা দিতে হতো (এ বিষয়ে তেজগাঁও থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করেছি)। অথচ মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফি ছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। অতিরিক্ত চাঁদা পরিশোধ করার পর টাকা দেওয়া হয়নি অভিযোগ তুলে মাঝেমধ্যে পাসপোর্ট আটকে দিয়ে হয়রানি করা হতো। এমনকি লাইসেন্স ব্লক করে দেওয়া হতো।

নির্ধারিত ফি এবং অতিরিক্ত চাঁদার টাকার বাইরে পাসপোর্ট খরচ বাবদ ১০ হাজার, কোভিড-১৯ টেস্ট বাবদ ১৭ হাজার, মেডিকেল খরচ বাবদ ৬ হাজার ৫০০ এবং পোশাক খরচ বাবদ তিন হাজার টাকা করে নিতেন চক্রের সদস্যরা। অথব সব খরচই বহন করার কথা সরকারি ফি’র ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার মধ্য থেকে। এই অপকর্মের বিরুদ্ধে তৎকালীন সরকারের উচ্চ পর্যায়ে অভিযোগ করেও কোনো সুরাহা পাওয়া যায়নি। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে আমি হাইকোর্টে রিট করি। অভিযোগটি আমলে নিয়ে আদালত ৯০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে দুর্নীতি দমন কমিশন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মানি লন্ডারিং শাখাকে নির্দেশ দেন।

প্রবাসী, বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিটিএমইএ মহাপরিচালককে শোকজ করেন। এতে আমার ওপর মাফিয়া চক্রের চাপ এত বেড়ে যায় যে, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। আমার প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করে দেওয়া হয়। পরে বাধ্য হয়ে আমি রিট পিটিশনটি প্রত্যাহার করি। বরাদ্দ অনুযায়ী আমাদের তিন হাজার ৩০০ জন লোক পাঠানোর অনুমতি থাকলেও নানা প্রতিবন্ধকতায় দুই হাজার ৮২২ জন লোক পাঠাতে সক্ষম হই। জবানবন্দিতে এসএম রফিক আরও বলেন, ২০২২ সালের সিন্ডিকেট চক্রের ২৫ জনের তালিকা প্রকাশ হলে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করি। এই অভিযোগের পর সিন্ডিকেট সদস্য বেড়ে ৭৫ জন হয়। পরে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১০০ এর বেশি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবি সাইবার টিমের অতিরিক্ত উপকমিশনার সুমন মিয়া যুগান্তরকে বলেন, এটি একটি অনেক বড় বিষয়। মানবপাচার মামলায় আসামি লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতারের পর প্রথম দফায় পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে দ্বিতীয় দফায় তাকে ছয় দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না।

এদিকে পৃথক মামলায় ডিবি হেফাজতে রিমান্ডে আছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মামুন খালেদ এবং আফজাল নাসের। তারাও ডিবিকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছেন উল্লেখ করে ডিবির যুগ্ম কমিশনার নাসিরুল ইসলাম বলেন, তাদের প্রত্যেকের দেওয়া তথ্য যাচাই করে দেখা হচ্ছে।