বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়ে হত্যা, হামলা ও সহিংসতার অভিযোগে আদালতে করা মামলাগুলোতে আসামি করা ব্যক্তিদের বড় অংশই তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হচ্ছেন। এ পর্যন্ত তদন্ত শেষ হওয়া ৮২টি মামলার প্রায় ৬৩ শতাংশ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁদের নাম বাদ দিয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে তদন্ত সংস্থা।
এ ছাড়া বেশ কিছু মামলার তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নিরপেক্ষ তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে, তাঁদের অভিযোগপত্রভুক্ত করা হয়েছে এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
আইনজীবীরা বলছেন, ফৌজদারি অপরাধের ঘটনায় নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি এড়াতে মামলার আগে যাচাই-বাছাই প্রয়োজন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নির্যাতন, হামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগে সারা দেশে থানায় ও আদালতে অসংখ্য মামলা করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে করা (সিআর) ১৯৫টি মামলার তদন্ত করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত শেষে দেখা যায়, এগুলোর মধ্যে ৮২টি মামলার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এই ৮২টি মামলায় মোট ৭ হাজার ৬৫৪ জনকে আসামি করা হয়েছিল। তদন্তে তাঁদের মধ্যে ২ হাজার ৮৫৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। বাকি ৪ হাজার ৭৯৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ এসব মামলার মোট আসামির ৬২ দশমিক ৬৫ শতাংশই নির্দোষ বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পিবিআই সূত্র জানায়, অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া ৮২টি মামলার মধ্যে ৮টি হত্যা মামলা। বাকি ৭৪টি মামলা অন্যান্য আইনে করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, আন্দোলনের সময় সংঘর্ষ, ভাঙচুর, বিশৃঙ্খলার অভিযোগে করা অনেক মামলায় অনেক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। পরে তদন্তে আসামিদের অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় করা মামলাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত নিষ্পত্তি করা হচ্ছে বলে জানান পিবিআইয়ের প্রধান ও পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল। তিনি বলেন, অনেক মামলার তদন্তে কিছু নির্দোষ ব্যক্তিকে আসামি করার বিষয়টি উঠে এসেছে। তদন্তে দেখা গেছে, কিছু মামলায় প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে যেসব মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে, সেসব মামলায় এসব বিষয়ে যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকেন্দ্রিক বেশ কিছু মামলায় পুলিশ তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা না পেয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে।
পিবিআইয়ের তদন্ত করা মামলাগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাজধানীর উত্তরার আজমপুরে ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মো. কাওছার মিয়া (২০) নিহত হওয়ার অভিযোগে করা হত্যা মামলাও রয়েছে। ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর বোন শেখ রেহানা, ওবায়দুল কাদেরসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের ২৫৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন নিহত কাওছারের মা মোছা. পারুল খাতুন। মামলার তদন্তকালে বাদী ছেলে নিহত হওয়ার পক্ষে কোনো প্রমাণ পিবিআইকে দেখাতে পারেননি। এমনকি কাওছার ডাকাতির প্রস্তুতির মামলায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারও হন। ফলে ঘটনার সত্যতা না পাওয়ায় এই মামলায় পিবিআই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বাংলামোটর এলাকায় গুলিতে আহত হওয়ার ঘটনায় গত বছরের ১০ এপ্রিল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন শিক্ষার্থী রায়হান (২১)। মামলায় শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ী, সাধারণ নাগরিক, বিভিন্ন পেশায় জড়িত ব্যক্তিদেরসহ ২৯৯ জনকে আসামি করা হয়। মামলার তদন্ত শেষে ৪৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। বাকি আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ না পাওয়া যায়নি।
ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক মো. ইয়াসিন আলী আজকের পত্রিকাকে বলেন, রাজনৈতিক ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, সাধারণ নাগরিকসহ ঢাকার বাইরের জেলায় বসবাসকারী ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছিল। তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে কোনো না কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, তাঁদের ছাড়া বাকি আসামিদের নাম অভিযোগপত্রে বাদ দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট উত্তরার আজমপুরে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে আওয়ামী লীগ, এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীসহ মোট ৬৮ জনকে আসামি করে মামলা করেছিলেন পোশাক কারখানার কর্মী মো. পিয়াস আহমেদ (২৫)। তবে মামলা তদন্ত করে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো সত্যতা পায়নি পিবিআই।
জানতে চাইলে ওই মামলার বাদী পিয়াস আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, মামলায় কিছু সাধারণ মানুষের নাম ঢুকে গিয়েছিল। যারা জড়িত ছিল, তাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে মীমাংসা হয়ে গেছে।
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ফৌজদারি অপরাধের ঘটনায় মামলার আগে যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং নিরপরাধীরা যাতে হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, কোনো মামলায় হয়রানি করার উদ্দেশ্যে আসামি করার প্রমাণ মিললে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। এতে মিথ্যা মামলা করার প্রবণতা কমবে এবং বিচারব্যবস্থার ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপও কমবে।