Image description

অনিয়ম রোধ, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ ও প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে অভিন্ন প্রশ্নে দেশের সব বোর্ডের মাধ্যমিক (এসএসসি) ও উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। চলতি বছর থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় সারা দেশে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আগামী বছর থেকে এসএসসি পরীক্ষা এই পরিকল্পনায় আনা হবে। যাতে মূল্যায়নব্যবস্থায় সমতা আনা যায় এবং বোর্ডভিত্তিক বৈষম্য দূর করা যায়। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, একই প্রশ্নপত্রে একযোগে দুটি পাবলিক পরীক্ষা আয়োজনের বিষয়ে বর্তমান বিএনপি সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা কার্যকর করা গেলে শিক্ষা খাতে ভালো নজির স্থাপন হবে। সাধারণ নয়টি বোর্ডসহ ১১টি বোর্ড ভিন্নভাবে প্রশ্ন তৈরি করায় প্রশ্নের মান ও সহজ-জটিলতার পার্থক্য দেখা যায়। এতে বই ও সিলেবাস এক হলেও বোর্ডগুলোর ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্ন হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ফলাফলে বৈষম্য সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে ন্যায্য মূল্যায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক চাপ ও অসন্তোষও তৈরি হয়। সরকারের নতুন উদ্যোগে এসবের অবসান হবে বলে আশা তাদের। শিক্ষাব্যবস্থা তথা এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা অভিন্ন প্রশ্নে নেওয়ার পরিকল্পনা বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জানা যায়, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের লক্ষ্যে আজ দুপুরে সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এসএম কামাল উদ্দিন হায়দার যুগান্তরকে বলেন, সারা দেশে সব শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা একই প্রশ্নে নেওয়ার আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে একটি সভা রয়েছে রোববার। সেখানে চূড়ান্ত আলোচনা হবে। একই প্রশ্নে পরীক্ষা নিলে প্রশ্নফাঁস হওয়ার সুযোগ নেই বলে জানান তিনি। আর সামনে এসএসসি পরীক্ষা। সময় কম থাকায় এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন অভিন্ন করার বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপার্চায অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দেশের শিক্ষা বোর্ডগুলোর প্রশ্ন ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় ফলাফলও ভিন্ন ভিন্ন হয়। অনেক সময় প্রশ্নের মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এতে শিক্ষার্থীদের বৈষম্যের শিকার হতে হয়।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার এ সিদ্ধান্ত নিতে পারলে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় বৈষম্য কমবে। একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হলে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন আরও স্বচ্ছ এবং তুলনামূলক ন্যায়সংগত হবে। তবে তারা সতর্ক করেছেন, শুধু প্রশ্ন এক করলেই চলবে না, পাঠ্যক্রম ও শিক্ষার মানও সমানভাবে উন্নত করতে হবে।

শিক্ষকরা বলছেন, অভিন্ন প্রশ্নপত্র শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিকে আরও নির্দিষ্ট ও লক্ষ্যভিত্তিক করবে। তবে তারা আশঙ্কা করছেন, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় সামান্য ত্রুটি হলে এর প্রভাব সারা দেশে পড়তে পারে।

শিক্ষার্থীরাও বলছেন, অভিন্ন প্রশ্নে পরীক্ষা হলে বোর্ডভিত্তিক বৈষম্য কমবে। সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হবে। প্রশ্ন কঠিন হলে সবাই একসঙ্গে চাপের মুখে পড়বে। সব বোর্ডের শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তারা।

অভিভাবকরা বলেছেন, সারা দেশে একই সিলেবাসে অভিন্ন প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক। এতে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সমান হবে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ কিছুটা কমবে। তবে কোনোভাবেই প্রশ্নফাঁস না হয়, সেটির প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। নাহলে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে।

বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের পর থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঝুঁকি এড়াতে বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডে আলাদা বা ভিন্ন প্রশ্নে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া শুরু হয়। প্রায় এক যুগ পর চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষা থেকে সব বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

এছাড়াও মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন থেকে মূল্যবান সময় সাশ্রয় করতে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার সম্ভাব্যতা যাচাইসহ একগুচ্ছ সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে কাজ করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত বুধবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বর্তমানে একজন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পর্যায়ে দশম শ্রেণির ক্লাস শেষ করে তার পরবর্তী বছর এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পায়। এইচএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রেও একই অবস্থার সম্মুখীন হয়। এর ফলে ওই শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের প্রায় দুই বছর সময় তার জীবন থেকে হারিয়ে যায়। বিষয়টি শিক্ষার্থী এবং আমাদের জাতীয় জীবনে বড় ক্ষতি। এ পরিপ্রেক্ষিত্রে প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা সম্পন্ন করার সম্ভাব্যতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষা দেশের সব বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি পরীক্ষাকক্ষে বাধ্যতামূলকভাবে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা (সিসি ক্যামেরা) স্থাপন করার বিষয়েও আলোচনা করা হয়। পরীক্ষায় নকল ও অনিয়ম চিরতরে নির্মূল করতে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়েছে।

বিবৃতিতে শিক্ষামন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলনের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে নকলমুক্ত পরিবেশের কোনো বিকল্প নেই। অতীতে শিক্ষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে যেভাবে নকল প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছিল, আগামী দিনেও আমরা সেই ধারা বজায় রাখব। বিভাগীয় শহরগুলোয় কেন্দ্রসচিব ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু পরীক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

যে কারণে ফলাফলে বৈষম্য তৈরি হয় : ২০২৫ সালে এইচএসসি ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডে ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোয় ইংরেজিতে গড়ে ৩৪ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। এ বিষয়ে বেশি পাশের হার বরিশাল বোর্ডে, আর সবচেয়ে কম যশোর বোর্ডে ৫৪ দশমিক ৮২ শতাংশ। এছাড়া হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন পাশের হার। এ বিষয়ে বোর্ডগুলোর গড় পাশের হার ৭১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এতে ২৮ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। আইসিটিতে বোর্ডগুলোর পাশের হার তৃতীয় সর্বনিম্ন। এতে প্রায় ১৮ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। এর পরে রয়েছে যুক্তিবিদ্যা। এ বিষয়ে বোর্ডগুলোর পাশের হার ৮৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। আর পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে বোর্ডগুলোর পাশের হার ৮৫ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এছাড়া ১১টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফল হয়েছে কুমিল্লা বোর্ডে, পাশের হার ৪৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এই বোর্ডে ইংরেজিতে পাশের হার ৬৫.২৮ শতাংশ, যা সারা দেশে তৃতীয় সর্বনিম্ন। একইভাবে ২০২৫ সালের এসএসসির ফল বিশ্লেষণে একই চিত্র দেখা গেছে। একেক বোর্ডে একেকরকম ফল ও পাশের হার।

এমন বাস্তবতা সামনে রেখে সরকার বোর্ডগুলোর প্রশ্নের অভিন্নতাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ যুগান্তরকে বলেন, অন্যান্য দেশে প্রশ্ন প্রণয়নে স্বচ্ছতা রয়েছে। শুধু বাংলাদেশেই একেক বোর্ডে একেক রকম প্রশ্ন করে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করা হয়। এ ধারা থেকে ফিরে আসার উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসে বিশেষভাবে নজরদারি করতে হবে।