মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে নানা সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশ। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলা এবং ইরানের পালটা হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ চলমান। সহসা এ যুদ্ধ থামার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশে তেল ও গ্যাসের অপ্রতুলতা দেখা যাচ্ছে। সরকারের দিক থেকে আশ্বস্ত করা হলেও যুদ্ধ দীর্ঘদিন চললে তেল ও গ্যাসের বড় ধরনের সংকট তৈরির আশঙ্কা করা হচ্ছে। মূলত আমদানি নির্ভর তেল ও গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে আগামীতে দেশের অর্থনীতি, বিদ্যুৎ, কৃষি উৎপাদন, কলকারখানার উৎপাদন, গার্মেন্টসহ সব ধরনের ব্যবসা, যোগাযোগে চতুর্মুখী সমস্যা ঘনীভূত হতে পারে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি ধাক্কা আসতে পারে মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর রেমিট্যান্সেও।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির যুগান্তরকে বলেন, হরমুজ প্রণালি যদি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে তাহলে বাংলাদেশেও নানা সমস্যার সৃষ্টি হবে। প্রথমত, দেশে তেল ও গ্যাস সংকট প্রকট হবে। কারণ, দেশে ব্যবহৃত ৯০ শতাংশ তেল আমদানি করা হয়। এলপিজি গ্যাস পুরোটাই আমদানিনির্ভর। সেদিকে থেকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা আছে। দ্বিতীয়ত, কাতার ও আশপাশের অন্যান্য দেশ থেকে সারের বড় চালান আসে। এটিও গ্যাসনির্ভর পণ্য। খোদ যুক্তরাষ্ট্রও এই অঞ্চল থেকে সার কিনে থাকে। তাই সারা বিশ্বেই কৃষি উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়বে, বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। কম্পিউটার চিপ থেকে শুরু করে এমআরইসহ নানা মেডিকেল যন্ত্রপাতি আমদানিতে সমস্যায় পড়তে হবে। যুদ্ধ যদি না থামে তাহলে সারা বিশ্বে তেলের দাম বাড়বে, গ্যাস ও সারের সরবরাহ কমে যাবে, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য আমদানিতে বড় আশঙ্কা থাকবে। এর সবই বাংলাদেশের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক তেলের বাজারে চরম অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ১০০ ডলারের মাইলফলক ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছালে বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকরকের প্রধান নির্বাহী ল্যারি ফিংক। বুধবার (২৫ মার্চ) বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য দেন তিনি।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল ক্রয় না করতে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। শনিবার জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের বরাত দিয়ে এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়।
এতে বলা হয়, সরকার চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক বাজার হতে প্রয়োজনীয় তেল ক্রয় করছে। ফলে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতির কোনো সম্ভাবনা নেই।
এদিকে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করে জানিয়েছে, যুদ্ধের সংকটের কারণে জুনের মধ্যে আরও ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ চরম খাদ্য অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদ এমকে মুজেরি যুগান্তরকে জানান, মনে হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘ হবে। এ যুদ্ধ আমাদের অর্থনীতি ও সমাজসহ সর্বত্রই প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধের পর থেকেই বেশি আঘাত পড়েছে জ্বালানি তেলের ওপর। আর জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহণ ব্যয় বাড়বে, পণ্যের মূল্য বাড়বে। বিশ্ববাজারেও পণ্যের মূল্য বাড়ছে। এতে আমাদের বাড়তি মূল্য দিয়ে পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে। সবকিছু মিলে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এছাড়া কৃষি ও শিল্প খাতেও এর প্রভাব পড়বে। এর সমাধানে সরকারকে সমন্বিত বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে; বিশেষ করে যেসব খাতে পদক্ষেপ নিলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে। তিনি আরও বলেন, জ্বালানি তেলের ওপর আঘাত আসায় মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ। এজন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির দিকে খেয়াল দিতে হবে সরকারকে। পাশাপশি বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল আমদানির ওপর জোর দিতে হবে।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার কারণে কয়েক সপ্তাহ ধরে কার্যত বন্ধ রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি। এতে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহে তীব্র অস্থিরতা বিরাজ করছে, যার প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে, এর ফলে বেড়েছে মূল্য। আপাতত এই সংকট দ্রুত কাটার কোনো লক্ষণ নেই। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে প্রণালির দুই প্রান্তে কয়েক হাজার জাহাজ আটকে আছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছেন। তবে বাস্তবতা বলছে, হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এখনো এগিয়ে ইরান। সিএনএনের প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হয়েছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলছেন তারা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান যুগান্তরকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকট কতদিন দীর্ঘায়িত হবে তা সবারই অজানা। সংকট দীর্ঘায়িত হলে ভবিষ্যতে কোন কোন খাতে জ্বালানি রেশনিং করা হবে, দর-দাম কেমন হবে, তা নিয়ে এখনই আলোচনা করে সব অংশীজনদের নিয়ে কর্মপন্থা নির্ধারণ করা উচিত। তা না হলে সামনে আরও কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে। তিনি আরও বলেন, গত সরকারের আমল থেকেই ব্যবসায়ীরা জ্বালানি নীতিমালা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তৎকালীন সরকার অনেক মেগা প্রজেক্ট করলেও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোনো ভূমিকা নেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারও আওয়ামী লীগের দেখানো পথে হেঁটেছে; যার ফল ভুগতে হচ্ছে এখন। ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জ্বালানি মজুতের সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের প্রকল্প নিতে হবে।
শামীম এহসান বলেন, জ্বালানি তেল নিয়ে সরকার ও জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট দেখা যাচ্ছে। সরকার মজুতের ব্যাপারে আশ্বস্ত করলেও জনগণ ‘প্যানিক বায়িং’ অব্যাহত রেখেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বর্তমানে দেশে জ্বালানির মজুত কত আছে, বিশ্বের কোন দেশ থেকে, কোন রুট দিয়ে কী পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করা হয় তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। একই সঙ্গে অভিযান চালিয়ে যারা তেল মজুত করেছে তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা উচিত।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এনার্জি গেটওয়ে। বিশ্বের মোট উৎপাদিত খনিজ তেলের প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এই পথ দিয়েই ট্যাংকারে বহন করা হয়-যা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২১ মিলিয়ন ব্যারেল। প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ইরান ও ওমান।