মেট্রোরেল লাইন-৫-এর কারিগরি প্রকল্পে ৬ মাস মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব নাকচ করেছে পরিকল্পনা কমিশন। এক্ষেত্রে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চতুর্থ দফায় মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য প্রকল্পটি সংশোধনের প্রস্তাব দেয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগ। পরিকল্পনা কমিশনের অনুষ্ঠিত বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (এসপিইসি) সভায় এ প্রস্তাব ভোটে দেওয়া হয়। বলা হয়, এ নিয়ে সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টার নির্দেশনা আছে, তাই মেয়াদ বৃদ্ধির সুযোগ নেই। ফলে ৩০ জুনের মধ্যেই প্রকল্পটি শেষ করতে হবে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডকে (ডিএমটিসিএল)। শুধু তাই নয়, শেষ সময় পরামর্শক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও গাড়ি ভাড়ার প্রস্তাবও বাদ দেওয়া হচ্ছে। এদিকে ডলারের দাম বাড়ায় ভ্যাট-ট্যাক্সে অতিরিক্ত ৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা পরিশোধ নিয়ে বিপাকে পড়েছে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, মেট্রোরেল লাইন-৫ সাউদার্ন রুট প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ৪ কিলোমিটার তৈরি করা হবে। এটি মূলত পাতাল রেলপথ হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে হাতে নেওয়া হয় ‘টেকনিক্যাল অ্যাসিসট্যান্স ফর ঢাকা র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৫) সাউদার্ন রুট’ প্রকল্প। এটির তৃতীয় সংশোধিত প্রস্তাব নিয়ে ১৫ মার্চ পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত হয় এসপিইসি সভা। এতে সভাপতিত্ব করেন কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধান ও সদস্য (রুটিন দায়িত্ব) কবির আহামদ।
সভায় অংশ নেওয়া দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, এসপিইসি সভায় ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সড়ক পরিবহণ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আলী রেজা সিদ্দিকী প্রকল্পটির বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, এমআরটি লাইন-৫ (সাউদার্ন রুট) নির্মাণের জন্য প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বেসিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন, টেন্ডার সহায়তা, ভূমি অধিগ্রহণ প্ল্যান ও পুনর্বাসন অ্যাকশন প্ল্যান তৈরির জন্য কারিগরি সহায়তা প্রকল্পটি চলমান। এটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪০৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ১২৭ কোটি ৩৮ লাখ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ থেকে ২৮১ কোটি ৫ লাখ টাকা। এছাড়া ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মেয়াদ ধরা হয়। পরে কিছু নতুন কাজের অন্তর্ভুক্তি, বিভিন্ন কাজের পরিমাণ ও ব্যয় কমা বা বাড়ানোর কারণে মোট ৪১১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয় ধরে প্রথম সংশোধন করা হয়। সে সময় মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয়েছিল ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত।
এর মধ্যেও কাজ শেষ না হওয়ায় ব্যয় না বাড়িয়ে দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে মেয়াদ আরেক দফা বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এরপর প্রকল্পটি কোনো সংশোধন না করেই পরিকল্পনা কমিশনের কাছ থেকে আরও একবার মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু এতেও শেষ হয়নি কাজ। বর্তমানে সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগ হতে প্রকল্পটির ২য় সংশোধিত অনুমোদিত ব্যয় থেকে ২২ কোটি ৭০ লাখ টাকা বাড়িয়ে মোট ৪৩৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা ধরে তৃতীয় সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়েছে। সেই সঙ্গে মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ করা হয়।
সভায় প্রকল্প পরিচালক বলেন, মূল টেকনিক্যাল প্রকল্প প্রস্তাব (টিএপিপি) তৈরির সময় ১ ইউএস ডলার সমান ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা থাকলেও ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধের সময় এ বিনিময় হার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ১ ইউএস ডলার সমান ১২২ টাকা হয়েছে। ফলে বর্তমান কারিগরি প্রকল্পের আওতায় নিয়োজিত পরামর্শক সেবার বিপরীতে ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধ বাবদ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ভ্যাট-ট্যাক্স বাবদ বিদ্যমান বরাদ্দ সংকট তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের সংশোধন ছাড়া ভ্যাট-ট্যাক্স বাবদ প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত ৬ কোটি ৮০ লাখ ২৪ হাজার টাকা পরিশোধ সম্ভব হবে না। তাই চলমান কারিগরি প্রকল্পটির সংশোধন প্রয়োজন। এছাড়া, সর্বশেষ ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া মেয়াদ বাড়ানোয় প্রকল্পের বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন কাজের অংশে বরাদ্দ প্রায় শেষ এবং কিছু কিছু কাজের অংশে বরাদ্দ একেবারেই নিঃশেষ হয়েছে। এমনকি চলতি মার্চের পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া সম্ভব হবে না। বেতন-ভাতাদিসহ অফিস পরিচালনার জন্য বিভিন্ন কাজের অতিরিক্ত অর্থসংস্থান করার জন্য প্রকল্পের সংশোধন করাসহ বাস্তবায়ন মেয়াদকাল ২০২৬ সালের ৩০ জুনের পরিবর্তে ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো প্রয়োজন। এ পরিপ্রেক্ষিতে সভার সভাপতি কবির আহামদ বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত বহাল রেখে প্রকল্প সংশোধনের বিষয়ে সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টার নির্দেশনা রয়েছে। এ নির্দেশনার আলোকে প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা যৌক্তিক হবে। এ বিষয়ে সভায় সব সদস্য সহমত পোষণ করেন। ফলে মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাবটি নাকচ হয়ে যায়।