সরকার গঠনের এক মাস পার না হতেই জবাবদিহিতার মুখে বিএনপির একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী। শনিবার বিকালে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তারা জবাবদিহিতার মুখে পড়েন বলে যুগান্তরকে নিশ্চিত করেন একাধিক সংসদ সদস্য। তারা জানান, দলীয় সংসদীয় কমিটির ওই সভায় অন্তত ৬ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কাছে তাদের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। একই সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনায় তাদের দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, আলোচনার একপর্যায়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রীর কাছে তেল, বিদ্যুৎ সরবরাহের বর্তমান পরিস্থিতি ও ঘাটতি বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। একই সঙ্গে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এছাড়া বৈঠকে ঈদযাত্রাকালে সংঘটিত দুর্ঘটায় মৃত্যু নিয়ে আলোচনা হয়। এ বিষয়ে সড়ক, নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়।
জানা যায়, বৈঠকে মন্ত্রী, সংসদ-সদস্যদের সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও চলমান সংকটের বিষয়ে সাধারণ মানুষ ও মিডিয়ার সামনে ভালোভাবে উপস্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মিডিয়ায় অতিরঞ্জিত বক্তব্য না দেওয়ার বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে। এছাড়া জাতীয় সংসদের কার্যক্রমকে গতিশীল করার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে সংসদকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করা জরুরি।’ বৈঠকে সভাপতির বক্তব্যে তিনি সংসদ-সদস্যদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সংসদের কাজে গতি আনতে হবে। কারণ এটি জনপ্রত্যাশা।’
বৈঠকে দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট তৈরি ও চোরাচালান রোধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে সংসদ-সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন।
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মধ্যে বিএনপি কী কী অর্জন করেছে এবং সামনের চ্যালেঞ্জগুলোও তুলে ধরা হয়।’
তিনি বলেন, ‘পার্শ্ববর্তী দেশসহ বিশ্বের অনেক দেশ তেলের দাম বাড়িয়েছে। বাংলাদেশে তেলের মূল্য বৃদ্ধি না করা সরকারের সফলতা। পূর্ব পরিকল্পনা গ্রহণ করায় এমনটি সম্ভব হয়েছে।’
বৈঠকের আলোচনা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর কে কী বক্তব্য রাখবেন বৈঠকে সেসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এছাড়াও দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মধ্যে বিএনপি কী কী অর্জন করেছে এবং সামনের চ্যালেঞ্জগুলোও তুলে ধরা হয়।’
তিনি জানান, বোরো মৌসুমে কৃষকদের যাতে অসুবিধা না হয়, সেটি মাথায় রেখে ভর্তুকি দিয়ে তেল সরবরাহ করছে সরকার। তেল চোরাচালানের বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে। চোরাচালান বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি সাংবাদিকদের জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেও বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে সরকার। প্রতিমাসে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে তেলের দাম ঠিক রাখার চেষ্টা চলছে। কিন্তু কিছু অসাধু চক্রের কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা চলছে। এমনকি সীমান্ত দিয়ে তেল পাচারের অভিযোগও পাওয়া গেছে। এসব বন্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিরুনি অভিযান পরিচালনাসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। চিফ হুইপ আরও জানান, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। ইতোমধ্যে ২ লাখ টন তেল নিয়ে জাহাজ বন্দরে ভিড়েছে এবং আরও ২ লাখ টন আসার পথে রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছেন যাতে সংসদ-সদস্যরা জেলা ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করেন। বিশেষ করে কেউ যাতে অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত তেল মজুত করতে না পারে এবং তেলের দাম যেন কোথাও না বাড়ে, সেদিকে নজর রাখতে বলা হয়েছে। সংসদ অধিবেশনে (আজ) জ্বালানিমন্ত্রী এ বিষয়ে ৩০০ বিধিতে বিস্তারিত বক্তব্য রাখবেন।
এক প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, এ বিষয়ে আজ বিস্তারিত আলোচনা না হলেও আশা করা যাচ্ছে আগামীকালের বৈঠকে এ নিয়ে সিদ্ধান্ত আসবে। এছাড়া সংরক্ষিত নারী আসন ও অন্যান্য বিল নিয়ে ৩০ মার্চের মধ্যে রিপোর্ট পেশ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
সংসদ-সদস্য আখতারুজ্জামান বাচ্চু যুগান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের কার্যক্রমে গতি আনতে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত সংসদ-সদস্যদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী বলছেন যুদ্ধ চলছে, সমগ্র বিশ্ব টালমাটাল। কিন্তু বাংলাদেশে তেলের দাম বৃদ্ধি করা হয়নি। ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ চলছে। সরবরাহের ঘাটতি নেই। আপনারা অহেতুক প্যানিক হবেন না। বির্তক সৃষ্টি হয় এমন কথাবার্তা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত আছে। কতিপয় অসাধু ব্যক্তি কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। সবাইকে এ বিষয়ে খোঁজ রাখতে হবে।
বৈঠকে মূলত ৩৭ দিনে সরকারের গৃহীত জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ, সংসদকে সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু করা, জ্বালানি পরিস্থিতি, সড়ক, পরিবহণসহ বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সংসদ-সদস্য ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আব্দুস সালাম আজাদ বলেন, বৈঠকে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে ঈদযাত্রা ঘিরে সড়ক দুর্ঘটনা, রেলপথ ও নৌপথের দুর্ঘটনার বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরাও তাদের অবস্থান তুলে ধরেছেন।
বৈঠকের শুরুতে জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সহধর্মিণী দিলারা হাফিজের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে মরহুমার রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। এছাড়া সরকারের চলমান কার্যক্রম, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইন প্রণয়ন কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়।
নির্বাচনের পর সংসদ-সদস্য হিসাবে শপথ গ্রহণের পর বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম বৈঠকে শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এরপর দ্বিতীয় সভাটি হয় স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের আগে। এর আগে ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে অধিবেশনে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়। আজ বেলা ৩টায় ফের বসবে মুলতবি অধিবেশন। এর আগে দুপুর ২টায় বিএনপির সংসদীয় দলের আরও একদফা বৈঠক হবে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের জারি করা ১৩৩ অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করছে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। এ কমিটির ১১ সদস্য বিএনপির। তিনজন জামায়াতের। ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১১৩টি জাতীয় সংসদে পাশ করাতে ইতোমধ্যে একমত হয়েছে সরকারি ও বিরোধী দল। ২০টি অধ্যাদেশের বিষয়ে এখনো একমত হতে পারেনি এই কমিটি। আজ রাত ৯টায় কমিটির তৃতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধ্যাদেশ জারির পর তা পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন এবং ৩০ দিনের মধ্যে পাশ না হলে তা বাতিল হয়ে যাবে। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশ ১২ মার্চ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়। ১২ এপ্রিলের মধ্যে অধ্যাদেশগুলো পাশ হতে হবে। এর আগেই অর্থাৎ ২ এপ্রিলের মধ্যে অধ্যাদেশের বিষয়ে বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন দেওয়ার কথা রয়েছে।