মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। বিশেষ করে কাতার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে— যা আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে তার প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে পড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লো
বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, গ্রিনিচ মান সময় অনুযায়ী রবিবার রাত ১০টায় আন্তর্জাতিক বাজার খোলার পরপরই তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক অপরিশোধিত তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) মে মাসের ডেলিভারি মূল্য প্রায় ১ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করে। তবে কিছু সময় পর দাম কিছুটা কমে আসে।
একই সময়ে নর্থ সি ব্রেন্ট ক্রুডের মে মাসের ডেলিভারি মূল্যও বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৩ দশমিক ৪৪ ডলারে পৌঁছায়। যদিও লেনদেন শুরুর প্রায় ৪৫ মিনিট পর তা সামান্য কমে প্রায় ১১১ ডলারের কাছাকাছি স্থিতিশীল হয়।
উল্লেখ্য, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরুর আগের দিন আন্তর্জাতিক বাজারে ডব্লিউটিআই ও ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল যথাক্রমে ৬৭ দশমিক ০২ ডলার এবং ৭২ দশমিক ৪৮ ডলার।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাত এখন উল্লেখযোগ্যভাবে আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও তার প্রভাব দ্রুতই বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প কার্যক্রম এবং রপ্তানি সক্ষমতার ওপর পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে বিকল্প উৎস তুলনামূলক বেশি থাকলেও এলএনজি বা এলপিজির ক্ষেত্রে সরবরাহের উৎস সীমিত। ফলে এই খাতে সংকট তৈরি হলে দ্রুত সমাধান খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আর সেই কারণেই এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়াকে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এলএনজি নির্ভরতার ঝুঁকি
বাংলাদেশে গ্যাস দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান জ্বালানি। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসে। পাশাপাশি তৈরি পোশাক, সার, সিরামিক, কাচ ও টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন শিল্প খাতেও গ্যাসের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু গত এক দশকে দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধীরে ধীরে কমে এসেছে। নতুন বড় কোনও গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হওয়ায় ঘাটতি পূরণে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে এলএনজি আমদানি শুরু করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই এটি দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১৭০ থেকে ১৮০ কোটি ঘনফুট। বাকি চাহিদা পূরণে এলএনজি আমদানির ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আমদানিকৃত এলএনজির বড় অংশই আসে কাতার থেকে। বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় তুলনামূলক কম দামে গ্যাস পাওয়ায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে কাতারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। ধারণা করা হয়, বর্তমানে দেশের আমদানিকৃত এলএনজির প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই আসে এই দেশটি থেকে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও সরবরাহ অনিশ্চয়তা
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সংঘাত পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে তেল ও গ্যাস পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালীতেও। এই রুট দিয়ে বিশ্বের বড় একটি অংশের জ্বালানি পরিবহন হয়ে থাকে।
এর মধ্যেই কাতারের রাস লাফান শিল্পাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। রাস লাফান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি কেন্দ্র। কাতারের প্রায় সব এলএনজি এখান থেকেই প্রক্রিয়াজাত ও রফতানি করা হয়।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, কাতারের রাস লাফান এবং ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র মিলিয়ে বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের উল্লেখযোগ্য অংশ বর্তমানে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন ও সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।
ইতোমধ্যে ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাসের দাম প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্পট মার্কেটে বাড়তি ব্যয়
এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দিলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কিনতে হয়। কিন্তু স্পট মার্কেটে দাম সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির তুলনায় অনেক বেশি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, “বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে তুলনামূলক কম দামে এলএনজি পেয়ে আসছিল। কিন্তু যদি সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়, তাহলে স্পট মার্কেট থেকে অনেক বেশি দামে গ্যাস কিনতে হবে। এতে সরকারের জ্বালানি ভর্তুকির চাপ বাড়বে।”
তিনি বলেন, ‘‘যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া বা আফ্রিকার কিছু দেশ থেকে এলএনজি আমদানির সুযোগ থাকলেও সেসব উৎস থেকে গ্যাসের দাম তুলনামূলক বেশি। তাছাড়া বিশ্ববাজারে যদি সরবরাহ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং দাম আরও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।’’
বিদ্যুৎ উৎপাদনে সম্ভাব্য চাপ
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। দেশের মোট উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। ফলে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস সংকট তীব্র হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে লোডশেডিং বাড়তে পারে। এতে শিল্প উৎপাদন, বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং নগর জীবনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হলে শিল্প কারখানাগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হবে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর শিল্প যেমন— সার, টেক্সটাইল, সিরামিক, কাচ ও স্টিল শিল্পের ওপর এর প্রভাব দ্রুত পড়তে পারে।
রফতানি শিল্পে উদ্বেগ
রফতানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘‘গ্যাস সংকট তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প উৎপাদনে।’’
তার ভাষায়, “গ্যাসের ঘাটতি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাবে, আর সেটার সরাসরি প্রভাব পড়বে শিল্প উৎপাদনে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের মতো রপ্তানিনির্ভর শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।”
তিনি বলেন, “কাতার বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক সহজ ও নির্ভরযোগ্য গ্যাসের উৎস ছিল। এখন যদি অন্য দেশ থেকে এলএনজি সংগ্রহ করতে হয়, তাহলে বাড়তি দাম দিতে হবে। সেই অতিরিক্ত ব্যয় শিল্প খাত কতটা বহন করতে পারবে, সেটাও বড় প্রশ্ন।”
সরকারের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস আমদানির বিষয়েও আলোচনা চলছে।
সরকারি সূত্র জানায়, ভারত, চীনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে যোগাযোগ করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যমান মজুত এবং আগেই কেনা জ্বালানি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বৈশ্বিক সংকটের কারণে অনেক দেশই জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করছে। বাংলাদেশও বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি কৌশল জরুরি
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ দিয়ে সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বাংলাদেশকে নতুন কৌশল নিতে হবে।
ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, “বাংলাদেশের জ্বালানি নীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য অস্থিরতাও দেশের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে।”
তার মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। বিশেষ করে স্থলভাগ ও সমুদ্রাঞ্চলে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বড় আকারের কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন।
অপরদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকেও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, শিল্প কারখানায় বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার উৎসাহিত করা এবং এ খাতে নীতিগত প্রতিবন্ধকতা কমানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
অধ্যাপক ম. তামিমের মতে, “ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা অনেক সহজ হবে।”
অর্থনীতির জন্য নতুন পরীক্ষা
বিশ্লেষকদের মতে, কাতারের এলএনজি সরবরাহ যদি দীর্ঘ সময় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে না পারে, তাহলে তার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প উৎপাদন, রফতানি প্রবৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এখন শুধু একটি ভূরাজনৈতিক সংকট নয়; বরং বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তার একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। আর সেই কারণেই সময় থাকতে বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজা এবং দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাকে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা ।