Image description

পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে ঢাকা ছাড়ছে ঘরমুখো মানুষ। ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন আর লঞ্চ, ট্রাকসহ যে যেভাবে পারছেন বাড়ি ফিরছেন। এর মধ্যে বাসে যাত্রীদের থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে? সরকারের তরফে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় হচ্ছে না মর্মে দাবি করা হলেও বাস্তবে এর উল্টো চিত্র দেখা গেছে বাস কাউন্টারগুলোতে। যাত্রীদের অনেকেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের টিকিট পাচ্ছিলেন না। তা ছাড়া, ঈদের দুইদিন আগে বুধবার রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট আর মহাসড়কগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। মহাসড়কে তীব্র যানজট তৈরি হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়ে যান ঘরমুখো যাত্রীরা।

গতকাল সরজমিন সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডের অধিকাংশ বাস কাউন্টারে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, অনেক কাউন্টারেই বেশি ভাড়া নেয়া হচ্ছে যাত্রীদের। বিশেষ করে অগ্রিম টিকিট যারা কেটে নিয়েছেন, তাদের থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় না করা গেলেও যাত্রার আগে যারা টিকিট কাটতে এসেছেন, তাদের অনেকের কাছ থেকেই বেশি ভাড়া নিতে দেখা গেছে। যাত্রীপ্রতি টিকিটে ৫০ থেকে টিকিটের মূল দামের সমপরিমাণ বাড়তি টাকা নিতে দেখা গেছে। সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডে বুধবার সারা দিনই উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। প্রতিটি কাউন্টারেই জনসমাগম ছিল অনেক। অসংখ্য যাত্রীদের দেখা গেছে টিকিট না পেয়ে এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করতে। তারা জানান, বেশি ভাড়া দিয়ে হলেও তারা গন্তব্যে যেতে প্রস্তুত।

বাস কাউন্টারগুলোতে যাত্রী সেজে টিকিট কিনতে যায় মানবজমিনের প্রতিবেদক। গিয়ে দেখা যায়, বরিশালগামী অধিকাংশ বাসই বাড়তি ভাড়া আদায় করছে। এমনকি ৪শ’ টাকার ভাড়া ৮শ’ টাকা বলে ডেকে ডেকে যাত্রী নিচ্ছিলেন তারা। যাত্রী হিসেবে কথা বললে তারা জানান, ঈদের মৌসুমে ভাড়া বেশি হবেই। ঈদের পর আর ঈদ মৌসুম এক নয়। পরে যুক্তি দিয়ে বাস কাউন্টারগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়, ঢাকা থেকে বাসগুলো অনেক যাত্রী নিয়ে গেলেও নির্দিষ্ট গন্তব্য থেকে আসার সময় বাসগুলো খালিই আসতে হয়। ফলে লোকসানে পড়তে হয় তাদের। সেই লোকসান পোষাতে এই বাড়তি ভাড়া আদায় করেন যাত্রীদের থেকে।

আনিন্দ্য নামের একজন যাত্রী যশোর যাবেন। তিনি মানবজমিনকে জানান, মঙ্গলবার রাতে যশোর যাওয়ার জন্য হামদান এক্সপ্রেস নামের এক বাস কাউন্টারে গেলে তার থেকে শুরুতে বাড়তি ৩শ’ টাকা দাবি করেন। রাজি না হলে দেড়শ’ টাকা বাড়তি চান ভাড়া বাবদ। সেখান থেকে তিনি টিকিট নেননি। পরের দিন এস আলম সার্ভিসে একশ’ টাকা বেশি দিয়ে টিকিট নেন। আনিন্দ্য বলেন, ৫০ টাকা হোক বা ৫শ’ টাকা, বেশি নেবে কেন? মন্ত্রী বলে দিয়েছেন, ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ নেই ভাড়া বাড়তি নেয়া হচ্ছে না।

হামদান এক্সপ্রেস নামের যশোর বেনাপোলের বাস কাউন্টারে গিয়ে দেখা যায়, বেনাপোলগামী এক যাত্রী ভাড়া নিয়ে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে গেছে কাউন্টারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে। তখন কাউন্টারের টিকিট বিক্রেতাকে বলতে দেখা যায়, আমাদের মালিক পক্ষের এর চেয়ে কম নেয়া সম্ভব নয়। ওই যাত্রী অভিযোগ করে বলেন, আমি ৬০০ টাকা ভাড়ায় বেনাপোল যাই। সেখানে আমার কাছ থেকে আজকে সাড়ে ৭শ’ টাকা করে ভাড়া নেয়া হচ্ছে। এই বাসসহ অন্য ভালো বাসেও এই ভাড়ায় গিয়েছি। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে কাউন্টার ম্যানেজার বলেন, আমরা সাধারণত বছরের অন্যান্য সময়ে যাত্রীদের থেকে ৫০ টাকা করে কম ভাড়া নেই। কিন্তু ঈদের সময় সেটি কম রাখা যাচ্ছে না। তাই সরকার নির্ধারিত ভাড়াই নেয়া হচ্ছে। এজন্য যাত্রীরা হয়তো বলছে ভাড়া বেশি নিচ্ছি আমরা। ১০০ টাকার ৫০ টাকার বেশি নেয়া হচ্ছে না।

ঢাকা-কক্সবাজারের সিডিএম ট্রাভেলসের টিকিট বিক্রেতার কাছে ফেনীর টিকিট চাইলে তিনি ৬শ’ টাকা দাবি করেন। অথচ, সায়েদাবাদ থেকে ফেনীর ভাড়া ৩৮০ টাকার বেশি নয়। ওই টিকিট বিক্রেতা বলেন, এখন কম বইলেন না। কোনো সুযোগ নেই এর কম দেয়ার। আপনি ঈদের পর আসেন, আপনাকে কমে নেয়ার ব্যবস্থা করবো আমি।

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে বরিশালের বাস কাউন্টারগুলোতে দেখা যায়, সেখানে ‘বরিশাল ৮শ’ টাকা’ বলে ডেকে ডেকে টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ ওই বাসগুলোতে বরিশালের মূল ভাড়া ৪শ’ টাকা করে বছরের অন্যান্য সময়ে নেয়া হয়। এসি বাসগুলোতে ৭ থেকে ৮শ’ টাকা হলেও গতকাল এসি বাসের টিকিট ১১শ’ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে।
বরিশালের মিজান পরিবহনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাধারণত ৪০০ টাকা ভাড়া নেয়া হয়, এখন ৭শ’ থেকে ৮শ’ টাকা; যেভাবে পারছে সেভাবে নিচ্ছে। ঈদ মৌসুম শেষ হলে ঈদের দুইদিন পর থেকে ভাড়া স্বাভাবিক হবে বলে জানানো হয়।

বরিশালের সোনারতরী পরিবহনের বিক্রেতা সুমন বলেন, আমরা সাধারণত ঢাকা থেকে যে গাড়িগুলো যায় ওই গাড়িগুলো আসার সময় একজন যাত্রীও পাই না। সেজন্য চাইলেও এখন কম ভাড়া নেয়া যাচ্ছে না। ঈদ মৌসুমে অনেক যাত্রী হওয়াতে আমাদের বিপত্তি আরও বেড়ে গেছে। কারণ অনেক যাত্রী আছে; কিন্তু বাস নাই।

মহাসড়কের যানজট, সীমাহীন ভোগান্তি
কারখানা ছুটি হওয়ায় গাজীপুরের মহাসড়কগুলোয় ঈদযাত্রায় গ্রামমুখী মানুষের চাপ বেড়েছে। এজন্য গাজীপুরের সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার যানজট সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার সকাল থেকে থেমে থেমে যানবাহন চলাচল করায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রী ও চালকরা। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা বাস টার্মিনালসংলগ্ন প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকায় ধীরগতির কারণে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে। তবে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানবাহনের চাপ থাকলেও বড় ধরনের যানজট দেখা যায়নি। চালকরা বলছেন, দুপুরের পর গাজীপুরের প্রায় ৪০ শতাংশ কারখানা ছুটি হলে যানবাহনের চাপ আরও কয়েকগুণ বাড়বে।

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে সফিপুর থেকে চন্দ্রা ত্রিমোড় পর্যন্ত এবং চন্দ্রা-নবীনগর সড়কের বাড়ইপাড়া এলাকা থেকে ত্রিমোড় পর্যন্ত যানজটের বিস্তার দেখা গেছে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকলেও যাত্রী ও যানবাহনের অত্যধিক চাপের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে প্রায় পাঁচ হাজার ছোট-বড় কারখানা আছে। মঙ্গলবার প্রায় ২৫ শতাংশ কারখানা ছুটি হয়েছে। বুধবার অধিকাংশ কারখানা ছুটি দিয়েছে এবং সর্বশেষ আজ আরও ৮৩৩টি কারখানা বন্ধ হবে। ফলে যাত্রীর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।