একের পর এক নেতা হারিয়ে ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে ইরান। সে আগুনে পুড়ছে ইসরাইল ও তার ‘মনিব রাষ্ট্র’ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলো। কুয়েত, কাতার, সৌাদি আরব, বাহরাইন, আরব আমিরাত-সব আকাশেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র। মঙ্গলবার রাত থেকে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে তেহরান। সর্বোচ্চ নেতার পরের কাতারেই থাকা দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানি নিহত হওয়ায় ফুঁসে উঠেছে ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি)। রাতভর ইসরাইলের ১০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। বুধবার ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি ঘোষণা দেন, ‘সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদ) সেক্রেটারিকে হত্যার ঘটনায় ইরানের প্রতিক্রিয়া হবে চূড়ান্ত ও অনুশোচনাযোগ্য।’ আইআরজিসি তাদের হুঁশিয়ারিতে বলেছে, ‘শহীদ আলী লারিজানি ও তার সঙ্গীদের হত্যার রক্তের প্রতিশোধ নিতে’ মধ্য ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। আলজাজিরা।
লারিজানির পর ইরানের গোয়েন্দাবিষয়কমন্ত্রী ইসমাইল খতিবকেও হত্যা করেছে ইসরাইল। বুধবার এক বিবৃতিতে এই দাবি করেন ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ। বলেন, মঙ্গলবার রাতে এক বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন খতিব। তবে তার মৃত্যুর বিষয়ে এখন পর্যন্ত ইরানের পক্ষ থেকে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সামরিক বাহিনীকে ইরানের যে কোনো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে হত্যার অনুমতি দিয়েছেন বলেও জানান কাৎজ।
মঙ্গলবার ইসরাইল দাবি করে, সোমবার রাতে তেহরানে ইসরাইলের বিমান হামলায় আলী লারিজানি তার পুত্রসহ নিহত হয়েছেন। তেহরানের পৃথক বিমান হামলায় আধা-সামরিক বাহিনী বাসিজপ্রধান জেনারেল গোলামরেজা সোলেইমানিও নিহত হন। মঙ্গলবার রাতে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। বুধবার লারিজানি-সোলেইমানি এবং শ্রীলংকার উপকূলে নিহত দেশটির নৌ-সেনাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানায়, তাদের জানাজায় সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার পাশাপাশি অংশ নেন হাজার হাজার মানুষ।
এদিকে লারিজানি হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইতোমধ্যেই ইসরাইলের রাজধানী তেল আবিবে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এই হামলায় প্রথমবারের মতো ‘ক্লাস্টার ওয়্যারহেড’ বা গুচ্ছবোমা ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানি সংবাদ মাধ্যম। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, অভিযানে খোররামশহর-৪ এবং কদর মডেলের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যেগুলোর প্রতিটিতে একাধিক সাব-মিউনিশন বা ছোট বোমা সংযুক্ত ছিল। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের মতে, তেল আবিবের জনবহুল এবং সামরিক গুরত্বসম্পন্ন একটি এলাকায় এই হামলায় অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন। এছাড়াও তেল আবিবের ট্রেন স্টেশনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরাইলের মধ্যাঞ্চলে বিস্ফোরণ দেখা গেছে। এছাড়াও ইরানের উচ্চপদস্থ গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে প্রেস টিভি জানিয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরানি প্রতিশোধমূলক অভিযানে এ পর্যন্ত অন্তত ২০০ মার্কিন সেনা নিহত এবং ৩ হাজারেরও বেশি আহত হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ৫ হাজার পাউন্ড ওজনের শক্তিশালী ‘ডিপ পেনিট্রেটর’ বা বাংকার ব্লাস্টার বোমা দিয়ে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। বুধবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড এক বিবৃতিতে এই হামলার খবর নিশ্চিত করে জানায়, গুরত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচল পথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার লক্ষ্যেই এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্মিলিত আক্রমণের প্রতিবাদে ইরান এই জলপথটি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছিল। এই অচলাবস্থা কাটাতে এবং আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন বাহিনী তাদের অস্ত্রাগারের অন্যতম শক্তিশালী এই বোমাগুলো ব্যবহার করেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভাষ্য, এসব স্থাপনায় থাকা ইরানের জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক নৌযানের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছিল। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহণ হয়। ইরান কার্যত এই পথ বন্ধ করে দেওয়ায় সামুদ্রিক চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং বৈশ্বিক তেলের দাম বেড়ে গেছে। এ ধরনের হামলার জন্য সাধারণত দুটি বোমা ব্যবহার হয়-জিবিইউ-২৮ এবং নতুন জিবিইউ-৭২। এর মধ্যে জিবিইউ-৭২ ব্যবহারের সম্ভাবনাই বেশি। জিবিইউ-৭২ প্রথম পরীক্ষা করা হয় ২০২১ সালে। এটি একটি বড় ধরনের নিখুঁত লক্ষ্যভেদী বোমা, যা স্যাটেলাইটের সাহায্যে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী বলেছে, এই বোমা বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে মাটির গভীরে থাকা শক্ত ঘাঁটি ধ্বংস করার জন্য।
যুক্তরাষ্ট্রের কাউন্টার টেরোরিজম প্রধানের পদত্যাগ : যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্টার টেরোরিজম সেন্টারের (এনসিটিসি) পরিচালক জো কেন্ট ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধের প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছেন। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক চিঠিতে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, ‘অনেক চিন্তা-ভাবনার পর আমি আজ থেকেই ন্যাশনাল কাউন্টার টেরোরিজম সেন্টারের পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। চলমান ইরান যুদ্ধকে আমি বিবেকের দিক থেকে সমর্থন করতে পারছি না। ইরান আমাদের দেশের জন্য কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল না এবং স্পষ্ট যে, আমরা এই যুদ্ধে জড়িয়েছি ইসরাইল ও তাদের শক্তিশালী মার্কিন লবির চাপে।’ তবে তার পদত্যাগকে ভালো হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, নিরাপত্তা বিষয়ে দুর্বল ছিলেন কেন্ট।
বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রে হামলা : ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রের একটি পেট্রো কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে বুধবার ভোরে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। ইসরাইলের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ও ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা তাসনিম এ খবর জানিয়েছে।
হামলায় স্থাপনাটিতে আগুন ধরে গেছে এবং উদ্ধারকারী ও ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা বর্তমানে ঘটনাস্থলে রয়েছেন। উল্লেখ্য, ইরানের সাউথ পার্স বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র। যেখানে ইরান ও কাতার উভয় দেশের গ্যাস উত্তোলনবিষয়ক স্থাপনা রয়েছে।