হাজিদের সেবায় সরকারি ‘হজ মেডিকেল টিম-২০২৬’ গঠনে দলীয়করণ ও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মেডিকেল টিমে চিকিৎসক, নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের তালিকাভুক্ত করার পর সংশোধনী তালিকা করে ২০ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাদের পরিবর্তে নতুন করে অন্তত ২৫ জনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন তালিকাভুক্তদের বিষয়ে অভিযোগ-দলীয়করণ, প্রভাব খাটানো ও অর্থ লেনদেনসহ ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে তারা হজ মেডিকেল টিমে জায়গা পেয়েছেন। যার সঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় ছাড়াও এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত দুই দপ্তরের কিছু দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত রয়েছেন। জানা যায়, রাষ্ট্রীয় খরচে হজে যাওয়া ছাড়াও মেডিকেল টিমের সদস্যরা নির্দিষ্ট পরিমাণে আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকেন। একজন চিকিৎসক ১২ লাখ টাকা, নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা জনপ্রতি ৮ লাখ টাকা করে পান। যা সৌদি আরব যাওয়ার আগেই এক-তৃতীয়াংশ তাদের দিয়ে দেওয়া হয়। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
তালিকায় বাদ পড়া একাধিক চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মী যুগান্তরকে বলেন, তারা মেডিকেল টিমের জন্য সরকারি সব নির্দেশনা অনুযায়ী শর্তপূরণ করে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিয়ম মেনে টিমে অন্তর্ভুক্ত হতে আবেদন করেন। নিজেদের পাসপোর্ট জমাদান, সার্টিফিকেট অনুবাদ, বায়োমেট্রিক সম্পন্ন ও নুসুক কার্ডের (কাবাঘরে প্রবেশের অনুমতিপত্র) জন্য সৌদি আরবে পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। সঠিক প্রক্রিয়ায় একাধিক ধাপ সম্পন্ন করার পরও কোনো কারণ ছাড়াই তালিকা সংশোধনের নামে ২০ জনকে শেষ মুহূর্তে বাদ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘হজ প্রশাসনিক টিম-২০২৬’ মেডিকেল টিমের সদস্যদের কার্যক্রম মনিটরিংয়ের দায়িত্বে রয়েছেন সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা অধিশাখার যুগ্ম সচিব ড. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান। জানতে চাইলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘আগের প্রক্রিয়ায় তিনি জড়িত ছিলেন না। কিছু বিষয়ে সামনে আসায় ওপর থেকে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যে সিদ্ধান্তের বিষয়ে আমার আইডিয়া নেই। আমি এগুলো পড়েও দেখিনি।’
সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন, প্রজ্ঞাপন থেকে জানা যায়, এবারের মেডিকেল টিমে ১৭৭ জন চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। তাদের মধ্যে চিকিৎসক ৮০ জন, নার্স ৪৭ জন, ফার্মাসিস্ট ৩০ জন, মেডিকেল টেকনোলোজিস্ট/টেকনিশিয়ান ২০ জন রয়েছেন। তালিকায় নাম থাকা ব্যক্তিরা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু গত ১৫ মার্চ হঠাৎ করে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় তালিকা সংশোধন করে নতুন প্রজ্ঞাপন দেয়। সংশোধনী প্রজ্ঞাপনে আগের তালিকায় থাকা ডাক্তারের সংখ্যা ১০ জন কমিয়ে ৭০ জন করা হয়। নার্সের সংখ্যা একজন কমিয়ে ৪৬, ফার্মাসিস্ট ৭ জন কমিয়ে ২৩ ও ল্যাব/ওটি অ্যাসিসট্যান্টের সংখ্যা ২ জন কমিয়ে ১৮ জন করা হয়। এভাবে আগের তালিকা অনুযায়ী ভিসার অপেক্ষায় থাকা ২০ জনের নাম বাদ দেওয়া হয়। বাদ পড়াদের পরিবর্তে নতুন করে ২৫ জনের নাম প্রস্তাবনা দেওয়া হয়। নতুন স্থলাভিষিক্তদের তালিকায় বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাব-এর সদস্য, মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সংগঠন ‘মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এম-ট্যাব)’-এর সদস্য ও বিএনপিপন্থি নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী হিসাবে পরিচিতিদের নাম যুক্ত করা হয়েছে।
যুগান্তরের হাতে আসা তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের জিওতে (সরকারি আদেশে) আগের প্রজ্ঞাপনে জামালপুর মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক (কার্ডিওলোজিস্ট) ডা. কাজী এজাজুল ফেরদৌসের নাম ছিল। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ৯ মার্চের প্রস্তাবনায় তার নাম বাদ দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মেডিকেল অফিসার (এমবিডিসি) ডা. আরিফুর রহমানের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। একইভাবে জাতীয় নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক মো. মেরাজুল ইসলাম সেখের পরিবর্তে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (গাজীপুর) সহকারী পরিচালক ডা. মাহবুব আরেফিন রেজানুরের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মো. শফিউল ইসলামের পরিবর্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. মশিউর রহমান সরকার; চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেজিস্ট্রার (গ্যাসট্রোএন্টোরোলজি) ডা. তাসবীরুল হাসান জিহানের পরিবর্তে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেলের রেজিস্ট্রার (নিউরোলজি) সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ জামিল আহমেদ; নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি) নাহিদুজ্জামানের পরিবর্তে ঢাকা মেডিকেলের রেসিডেন্ট সার্জন (ভাস্কুলার সার্জারি) মঞ্জুরুল হাসান; স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-২) ডা. ওয়াসেক বিন শহীদের পরিবর্তে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেলের মেডিকেল অফিসার (শিশু বহিঃবিভাগ) সাখওয়াত হোসেন; স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. মুহাম্মদ আবদুল কাদেরের পরিবর্তে সলিমুল্লাহ মেডিকেলের এনেসথেসিওলোজিস্ট মো. বাবুল হোসেন; মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (কুষ্টিয়া)-এর অধ্যক্ষ মো. আবদুল মোমেনের পরিবর্তে জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতলের সহযোগী অধ্যাপক মো. বন্দে আলীর নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেলের ইনডোর মেডিকেল অফিসার মো. ইমরান হোসেনের পরিবর্তে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের সহকারী সার্জন মোহা. শামসুল হক; কুমিল্লার বরুড়া হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার, সংযুক্তি (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর) নুজহাত নাদিয়ার পরিবর্তে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ আমির-উল-মূলক; ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারির সিনিয়র স্টাফ নার্স মো. মোশারফ হোসেনের পরিবর্তে ২৫০ শয্যা কক্সবাজার সদর হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স তাসলিমা আক্তার; ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারির সিনিয়র স্টাফ নার্স তৌকির আহমেদের পরিবর্তে সিরাজগঞ্জ শহীদ এম. মনসুর আলী মেডিকেলের নার্সিং সুপারভাইজার মোছা. লতিফা হেলেন; কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স আছমা আকতারের পরিবর্তে ময়মনসিংহ মেডিকেলের সিনিয়র স্টাফ নার্স শাহনাজ পারভীন; শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের সিনিয়র স্টাফ নার্স শারমিন জাহানের পরিবর্তে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেলের সিনিয়র স্টাফ নার্স মোছা. রেখা খাতুন; ফার্মাসিস্টদের মধ্যে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মুহাম্মদ আব্দুর রহমানের পরিবর্তে জাতীয় নিউরোসায়েয়েন্সের মো. আসাদুল্লাহ মিয়া; রাজশাহীর গোদাগাড়ী (প্রেমতলী) উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মো. সুমন আলীর পরিবর্তে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেলের মো. আব্দুল কাদের; সিরাজগঞ্জ খোকশাবাড়ী ১০ শয্যাবিশিষ্ট পল্লী স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মো. আজমল হোসেনের পরিবর্তে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেলের মো. ফিরোজ হোসেন; কুষ্টিয়া সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মো. আরশাফুল হকের পরিবর্তে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মো. মরতুজ আলী; বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মোহা. শামীম রেজার পরিবর্তে লক্ষ্মীপুর জেলা সদর হাসপাতালের মো. জসিম উদ্দিন; বগুড়া ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির টিউটর (ফার্মেসি) মো. আব্দুর রউফের পরিবর্তে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ, দাইপুকুরিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের গোলাম ফারুক; রাজশাহীর ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির লেকচারার (ফার্মেসি) মো. আলাউদ্দিনের পরিবর্তে ময়মনসিংহ মেডিকেলের ফার্মাসিস্ট মো. শাহাদত হোসেনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।
মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের মধ্যে নড়াইলের হাটবাড়িয়ায় অবস্থিত ইসলামিক মিশন হাসপাতালের ল্যাবরেটরি টেকনেশিয়ান মো. ইব্রাহিমের পরিবর্তে ঢাকা ডেন্টাল কলেজের (মিরপুর) মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) মোছা. মমতাজ আক্তার বানু; নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) মো. আব্দুল মান্নানের পরিবর্তে মহাখালীর ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইচটি) মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ডেন্টাল) মো. রুবেল আহমেদ এবং কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওটি অ্যাসিসট্যান্ট আবদুল আজিজের পরিবর্তে জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটের অটোক্লেভ স্টাবিলাইজার অপারেটর মো. জাহাঙ্গীর আলমের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।
নতুন তালিকায় বাদ পড়া চিকিৎসক মো. নাহিদুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, মেডিকেল টিমের সদস্য হিসাবে আবেদন করে সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক গুগলস ফরম পূরণ, একাডেমিক সার্টিফিকেট প্রদান, এরাবিক ট্রান্সলেশন, টিকা গ্রহণ ও সৌদি আরবের বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেছিলাম। সবশেষ ভিসার অপেক্ষায় রেখে গত ১৫ মার্চ এক নির্দেশনায় আমার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। অনেকে আশায় ছিলেন পবিত্র কাবা শরিফ ও নবীর রওজা মুবারক জিয়ারতে যাবেন। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই শেষ মুহূর্তে বঞ্চিত করা হলো।
বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ফার্মাসিস্ট শামিম রেজা বলেন, আমি কোনো দল করি না। আমাদের ভিসার অপেক্ষায় রেখে বাদ দেওয়ায় হতাশ হয়েছি।
ড্যাব ও প্রভাবশালী মহলের চাপ ও তদবিরে তালিকা পরিবর্তন করা হয়েছে কিনা-এমন প্রশ্নে স্বাস্থ্য মন্ত্রালয়ের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা অধিশাখার যুগ্ম সচিব ড. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, ‘কে ড্যাব, কে এনডিএফ তা নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই। কার নাম পরিবর্তন বা সংযোজন হয়েছে সেটিও নলেজে নেই। বিষয়টি নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। তবে কারও বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেবে।’