ঈদুল ফিতরের ছুটিতে প্রিয়জনদের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করতে রাজধানী ছাড়ছে মানুষ। ফলে প্রায় ফাঁকা হয়ে পড়ছে ঢাকা। আর এই ফাঁকা নগরীতেই চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধের আশঙ্কা বেড়ে যায়। বিগত দিনে দেখা গেছে, ঈদের ছুটি শেষে ফিরে এসে অনেকেই বাসার তালা ভাঙা, গ্রিল কাটা পেয়েছেন; খোয়া গেছে মূল্যবান সামগ্রী। এ বছরও দীর্ঘ ছুটিতে একই শঙ্কা নগরবাসীর মনে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, ফাঁকা ঢাকার নিরাপত্তায় কতটা প্রস্তুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছুটিতে বাসা ছাড়ার আগে ব্যক্তিগত সতর্কতা যেমন জরুরি, তেমনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও নিতে হবে সমন্বিত ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সন্দেহভাজনদের নজরদারিতে আনা, টহল জোরদার করা এবং গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর মাধ্যমে ঈদের সময় অপরাধ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঈদ উপলক্ষে রাজধানীতে চার স্তরের বিশেষ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। ফাঁকা শহরে অপরাধ প্রতিরোধে সড়কে বিশেষ টহল জোরদার করা হয়েছে।
র্যাব ও পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজধানীর প্রতিটি এলাকায় দিন-রাত পালাক্রমে ফুট পেট্রোলিং (টহল) বাড়ানো হয়েছে। সন্দেহজনক গতিবিধি পর্যবেক্ষণে ইউনিফর্মের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও দায়িত্ব পালন করছেন সদস্যরা। গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও পয়েন্টগুলোতে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। পাশাপাশি বাসাবাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট এলাকার নিরাপত্তাকর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বাসায় নিয়োজিত গৃহকর্মী, চালক ও দারোয়ানের তথ্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অনেক সময় ভুয়া পরিচয়ে কাজ নিয়ে অপরাধ সংঘটিত হয়। তাই তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, ছবি, মোবাইল নম্বর ও স্থায়ী ঠিকানা সংরক্ষণ করা নিরাপত্তার জন্য সহায়ক হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার আগে প্রতিবেশী বা স্বজনদের মাধ্যমে বাসার খোঁজ রাখার ব্যবস্থা করলে চুরি-ডাকাতির ঝুঁকি অনেকটাই কমে। তিনি বাসা ফাঁকা রেখে যাওয়ার সময় মূল্যবান জিনিসপত্র নিরাপদে সংরক্ষণ এবং বাসাবাড়ি ও প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ক্যামেরা সচল রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
ডিএমপি কমিশনার আরও বলেন, নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার বা মূল্যবান জিনিসপত্র সম্ভব হলে আত্মীয়-স্বজনের বাসায় রেখে যাওয়া ভালো। কারও ঢাকায় এমন ব্যবস্থা না থাকলে পুলিশের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে থানায়ও গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী নিরাপদে রাখা যাবে।
ডিএমপি সূত্র জানায়, ঈদের ছুটিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
জানতে চাইলে র্যাবের মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঈদের সময় রাজধানী ফাঁকা হয়ে যাওয়ায় চুরি-ছিনতাইয়ের ঝুঁকি বাড়ে। এ কারণে সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। আগের ঈদগুলোর অপরাধ প্রবণতা বিশ্লেষণ করে এবারের নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। চেকপোস্টের পাশাপাশি অতিরিক্ত টহলও থাকবে। সম্ভাব্য অপরাধের সময় ও স্থান চিহ্নিত করে টহল পরিচালনা করা হবে।
র্যাবের মহাপরিচালক আরও জানান, তাদের ১৫টি ব্যাটালিয়ন ঢাকা শহরসহ সারা দেশে একযোগে অভিযান পরিচালনা করবে। এছাড়া অনলাইনভিত্তিক অপরাধ ঠেকাতে সাইবার মনিটরিং টিমও সক্রিয় রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ঈদের সময় ফাঁকা ঢাকায় অপরাধের ঝুঁকি বাড়ে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি হাউজিং এলাকার নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে স্থানীয় থানার সমন্বয় বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর অপরাধীদের তালিকা প্রস্তুত করে তাদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হলে ঝুঁকি কমবে। সন্দেহজনক চলাফেরা দেখলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। একটি নির্দিষ্ট অপরাধী গোষ্ঠী এই সময়কে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। সেজন্য তাদের চিহ্নিত করে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ঈদের ছুটিতে ফাঁকা বাসাবাড়ি দুর্বৃত্তদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। তাই বাসা ছাড়ার আগে কিছু বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি। যেমন- সব দরজা-জানালা ও গ্রিল ঠিকভাবে বন্ধ আছে কি না পরীক্ষা করতে হবে। গ্যাসের চুলা ও সিলিন্ডারের সংযোগ বন্ধ রাখতে হবে। মানসম্মত তালা ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত লক বা ডিজিটাল লক লাগাতে হবে। সিসিটিভি ক্যামেরা সচল রাখতে হবে। নিরাপত্তাকর্মীদের অপরিচিত কাউকে যাচাই ছাড়া প্রবেশ করতে না দেওয়ার নির্দেশ দিতে হবে। বিশ্বস্ত প্রতিবেশী বা আত্মীয়কে বাসার খোঁজ রাখার দায়িত্ব দিন। টাইমার লাইট বা স্বয়ংক্রিয় আলোর ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। কোনও সন্দেহজনক ব্যক্তি বা ঘটনা চোখে পড়লে দ্রুত স্থানীয় থানা বা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২০ বা ২১ মার্চ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে। চলতি বছর ৩০ রমজান পূর্ণ হলে ঈদ হবে ২১ মার্চ। ইতোমধ্যে ১৭ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের ঈদ ছুটি। যা চলবে ২৩ মার্চ পর্যন্ত। অনেকে আবার বাড়তি ছুটিও নিয়েছেন।