পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে ঘরমুখো মানুষের ঢল নেমেছে। টানা সাতদিনের ছুটির শুরুতেই বাস টার্মিনাল ও রেলওয়ে স্টেশনগুলোতে দেখা গেছে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। ছুটির দ্বিতীয়দিনে যাত্রীর সংখ্যা আরও বাড়ছে। বুধবার ভোর থেকেই চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় যাত্রীদের দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা যায়। তবে স্বস্তির বিষয় হলো- অতিরিক্ত ভিড় থাকা সত্ত্বেও ট্রেনগুলো নির্ধারিত সময়েই ছেড়ে যাচ্ছে। এতে যাত্রীদের মধ্যে ভোগান্তি কমেছে এবং অনেকেই নির্বিঘ্নে যাত্রা করতে পারছেন।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে এবার অগ্রিম টিকিট শতভাগ অনলাইনে বিক্রি করা হয়েছে। ফলে টিকিট জটিলতা ও স্টেশন এলাকায় বিশৃঙ্খলা অনেকটাই কমেছে। ‘টিকিট যার, ভ্রমণ তার’ নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করায় টিকিটবিহীন যাত্রীদের প্ল্যাটফরমে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে রেলওয়ে পুলিশ, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। নগরীর পূর্ব মাদারবাড়ী এলাকায় সাব্বির হোসেন পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার জন্য স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি সিলেট, তিনি বাসের চেয়ে ট্রেনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, গ্রামে ঈদ করার আনন্দই আলাদা। তাই যানজট ও ভোগান্তি এড়াতে আগেই বাড়ির পথে রওনা দিয়েছি। ঈদ উপলক্ষে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আগেভাগেই গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছি। রেলস্টেশনে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা জানান, যাত্রীদের চাপ থাকলেও সময়সূচি ঠিক রাখা সম্ভব হচ্ছে।
সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে চট্টগ্রাম থেকে ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে বিজয় এক্সপ্রেসসহ অন্যান্য ট্রেন নির্ধারিত সময়েই ছেড়ে গেছে। কিছু ট্রেনে স্ট্যান্ডিং টিকিট নিয়েও যাত্রা করছেন অনেকে। অন্যদিকে নগরের বহদ্দারহাট, নতুন ব্রিজ, জিইসি ও কদমতলীসহ বিভিন্ন বাস টার্মিনালে ভোর থেকেই যাত্রীদের ভিড় বাড়তে থাকে। যাত্রীর তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা কম থাকায় অনেকেই কাঙ্ক্ষিত টিকিট পাচ্ছেন না। কাউন্টারগুলোতে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও টিকিট না পেয়ে কেউ কেউ ফেরত আসা গাড়িতে করে রওনা দিচ্ছেন গন্তব্যে। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে যাত্রীর চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। প্রতিদিন গড়ে এক হাজার থেকে এক হাজার দুইশ’ আন্তঃজেলা বাস চলাচল করছে, যাতে প্রায় ৪০ হাজারের বেশি যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। ছেড়ে যাওয়া বাসগুলো ফিরে এলে টিকিট সংকট কিছুটা কমবে বলেও জানান তারা।
ঈদে প্রতিদিন আন্তঃজেলার ১২০০টি এসি ও নন-এসি গাড়ি ছাড়ছে। আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির সচিব মনোয়ার হোসেন জানান, ১৬ই মার্চ থেকে আন্তঃজেলা বাসের অগ্রিম টিকিটধারী যাত্রী পরিবহন শুরু হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে এক হাজার থেকে ১২০০টি এসি ও নন-এসি বাস সারা দেশে চলাচল করবে। এসব বাসে ঈদে প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজারের বেশি যাত্রী পরিবহন করা হবে। চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) শেখ মো. সেলিম বলেন, ‘ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। যানজট নিরসন ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতেও আমরা কাজ করছি। এদিকে ঘরমুখো মানুষের স্রোতে ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে আসছে চট্টগ্রাম নগরী। নগরের ব্যস্ত সড়কগুলোতে আগের মতো যানজট নেই। ফলে নগরবাসী কিছুটা স্বস্তি নিয়ে চলাচল করছেন।
যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই যানজট ও ভোগান্তি এড়াতে আগেভাগেই বাড়ির পথে রওনা দিয়েছেন। কেউ কেউ ট্রেনকে বেশি নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক মনে করায় সেদিকেই ঝুঁকছেন। আবার কম খরচে দ্রুত পৌঁছাতে অনেকে মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল এমনকি খোলা ট্রাকেও যাত্রা করছেন। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২১শে মার্চ দেশে ঈদুল ফিতর উদ্যাপিত হতে পারে। এ উপলক্ষে ১৯ থেকে ২৩শে মার্চ পর্যন্ত পূর্বনির্ধারিত ছুটির সঙ্গে ১৮ই মার্চ নির্বাহী আদেশে অতিরিক্ত ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ১৭ই মার্চের শবেকদরের ছুটি মিলিয়ে সরকারি চাকরিজীবীরা টানা সাতদিনের ছুটি উপভোগ করছেন। সবমিলিয়ে, ঈদযাত্রার শুরুতেই চট্টগ্রাম থেকে গ্রামে ফেরার হিড়িক পড়েছে। যাত্রীচাপ থাকলেও সময়মতো ট্রেন চলাচল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে স্বস্তির যাত্রার প্রত্যাশা করছেন ঘরমুখো মানুষ। চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার আবু জাফর মজুমদার বলেন, ঈদযাত্রায় এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক রয়েছে।
ট্রেনের যাত্রীদের ভিড় বেড়েছে। বুধবার থেকে এ চাপ আরও বাড়বে। পাশাপাশি যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রেলওয়ে পুলিশ, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী, আনসার সদস্যসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। এখন পর্যন্ত স্টেশনে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী-আরএনবি’র চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের ইন্সপেক্টর আমান উল্লাহ আমান বলেন, যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ভ্রমণের জন্য আরএনবি সজাগ রয়েছে। টিকিট দেখেই প্রবেশ করানো হচ্ছে। টিকিটবিহীন যাত্রী প্রবেশে কঠোর নজরদারি রাখা হয়েছে।