Image description
ইইউ জানিয়েছে হরমুজে তারা সাহায্য করবে না। উল্টো যুদ্ধ থামানোর আহ্বান। যুদ্ধের বিরোধিতা করে কাউন্টার টেররিজম সেন্টার প্রধানের পদত্যাগ। সামরিক নয়, হরমুজ নিয়ে কূটনৈতিক সমাধান চেয়েছে জাতিসংঘ।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে আরও বিপাকে পড়তে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই প্রণালি খুলে দিতে সাহায্য চাওয়ার পর তা নাকচ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। উল্টো যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে তারা। এ ছাড়া জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই সংকটের সামরিক নয়, কূটনৈতিক সমাধান জরুরি। এদিকে দেশের ভেতরেও চাপ বাড়ছে। যুদ্ধের বিরোধিতা করে মার্কিন ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টারের প্রধান পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি ট্রাম্পকে এই যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।

ইরানের হামলার জেরে বন্ধ হয়ে গেছে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল। এতে বাড়ছে তেলের দাম। তবে পরিস্থিতি সামলাতে কিংবা এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু করতে প্রথমে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের সাহায্য চান ট্রাম্প। তাঁর দাবি ছিল, এই প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানো হোক দেশগুলোর পক্ষ থেকে। তবে এই আহ্বানে সাড়া মেলেনি। এরপর পশ্চিমা সামরিক জোটের সদস্যদেশগুলোর কাছে সাহায্য চান তিনি। এরপর গত সোমবার বৈঠক করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো। তবে এর আগেই ইউরোপের দেশ জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও গ্রিস জানিয়ে দেয়, তারা এই যুদ্ধে জড়াবে না। এ ছাড়া ন্যাটোর ঘনিষ্ঠ মিত্র অস্ট্রেলিয়াও একই সিদ্ধান্তের কথা জানায়।

এরপর গতকাল মঙ্গলবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়, তারা এই যুদ্ধে জড়াবে না। ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কাল্লাস বলেন, কেউই নিজেদের লোকজনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে প্রস্তুত নয়।

রয়টার্সকে কাল্লাস বলেন, ‘এটি খোলা রাখার জন্য আমাদের কূটনৈতিক উপায় খুঁজে বের করতে হবে, যাতে আমাদের খাদ্যসংকট, সারসংকট, সেই সঙ্গে জ্বালানির সংকটেও পড়তে না হয়।’

তবে নিজেদের সাহায্য বন্ধ শুধু নয়, বরং যুদ্ধ থামানোর আহ্বান জানিয়েছেন কাল্লাস। তিনি বলেছেন, কীভাবে এই সংঘাতের অবসান ঘটানো যায়, সে বিষয়ে ইইউ মধ্যপ্রাচ্যের সরকারগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করছে।

ব্রাসেলসে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাল্লাস আরও বলেন, হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টায় ইউরোপীয়দের অংশগ্রহণের দরজা বন্ধ হয়ে যায়নি। তবে এটি খুব সম্ভবত একটি কূটনৈতিক সমাধানের অংশ হিসেবে আসবে।

এদিকে ইরান যুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘ এত দিন নীরব ভূমিকা পালন করলেও এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কথা বলেছে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের মহাসচিব আর্সেনিও ডমিঙ্গুয়েজ ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে সামরিক পাহারায় ট্যাংকারগুলোকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া কোনো নিশ্চিত বা ‘টেকসই’ নিরাপত্তা কৌশল নয়। এ ধরনের পাহারা গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে জাহাজগুলোর নিরাপদ পারাপারের ‘শতভাগ গ্যারান্টি’ দেবে না।

জাতিসংঘের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি ঝুঁকি কমায় ঠিকই, কিন্তু ঝুঁকিটা থেকেই যায়। বাণিজ্যিক জাহাজ এবং নাবিকেরা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’ হরমুজ প্রণালি সুরক্ষিত করার জন্য ট্রাম্পকে একটি আন্তর্জাতিক নৌ জোট গঠনের আবেদন জানিয়েছেন তিনি।

ট্রাম্পের জন্য বড় ধাক্কা

ট্রাম্পকে যুদ্ধ বন্ধের ডাক দিয়ে ব্যর্থ হয়েছে কংগ্রেস। কারণ, ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার জন্য সিনেটে একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হলেও রিপাবলিকানদের ভোট তা আটকে যায়। এরপরও বিক্ষোভ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। তবে ট্রাম্প এসব গায়ে মাখেননি। এবার যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টারের পরিচালক জো কেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘বিবেকের তাড়নায় তিনি ইরানে চলমান যুদ্ধকে সমর্থন করতে পারেন না।’

গত জুলাইয়ে এই পদের জন্য ট্রাম্পের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জো কেন্টের নিয়োগ চূড়ান্ত করে সিনেট। তাঁকে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁর এই পদত্যাগের জেরে চাপে পড়বেন ট্রাম্প।

পদত্যাগপত্রে ট্রাম্পের উদ্দেশে কেন্ট বলেন, ‘ইরান আমাদের জাতির জন্য আসন্ন কোনো হুমকি ছিল না এবং এটা স্পষ্ট, ইসরায়েল ও তাদের শক্তিশালী আমেরিকান লবির চাপের কারণে আমরা এই যুদ্ধ শুরু করেছি।’

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমি সেই মূল্যবোধ ও পররাষ্ট্রনীতিগুলোকে সমর্থন করি, যেগুলো নিয়ে আপনি ২০১৬, ২০২০ ও ২০২৪ সালে প্রচারণা চালিয়েছিলেন এবং যা আপনি আপনার প্রথম মেয়াদে কার্যকর করেছিলেন। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত আপনি বুঝতে পেরেছিলেন যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধগুলো হলো একটি ফাঁদ, যা যুক্তরাষ্ট্রের দেশপ্রেমিকদের মূল্যবান জীবন কেড়ে নিয়েছে এবং আমাদের জাতির সম্পদ ও সমৃদ্ধি নিঃশেষ করেছে।’

কেন্ট আরও বলেন, ‘১১ বার যুদ্ধে অংশ নেওয়া একজন সাবেক সৈনিক হিসেবে এবং ইসরায়েলের তৈরি করা একটি যুদ্ধে আমার প্রিয় স্ত্রী শ্যাননকে হারানো একজন গোল্ড স্টার স্বামী হিসেবে, আমি পরবর্তী প্রজন্মকে এমন একটি যুদ্ধে লড়াই করতে এবং মারা যেতে পাঠানোর সমর্থন জানাতে পারি না, যা মার্কিনদের কোনো উপকারে আসে না বা আমেরিকানদের জীবনের মূল্যের ন্যায্যতা প্রমাণ করে না।’

পাশে নেই ন্যাটো

এদিকে ট্রাম্পের ডাকে সাড়া দিচ্ছে না খোদ ন্যাটোও। বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, এই জোটের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। ন্যাটোর একজন কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, তাঁদের সদস্যরা ‘ইতিমধ্যে ভূমধ্যসাগরে অতিরিক্ত নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছেন’।

ওই কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, ‘আমরা অবগত আছি, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটসহ তারা আরও কী করতে পারে, সে বিষয়ে মিত্ররা ব্যক্তিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যদের সঙ্গে কথা বলছে।’

ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের আগে ব্রাসেলসে বলেন, ‘আমরা এই যুদ্ধ চাইনি। প্রথম দিন থেকে আমরা সংঘাত কমিয়ে আনার আহ্বান জানিয়ে আসছি।’

অবাক ট্রাম্প

ইরানে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর প্রতিশোধমূলক আঘাত আসতে পারে, এমন সতর্কবার্তা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আগেই দেওয়া হয়েছিল। অথচ গত সোমবার তিনি দাবি করেছেন, তেহরানের প্রতিক্রিয়া তাঁর কাছে ‘বিস্ময়কর’ ছিল এবং তিনি এতে ‘হতবাক।’ যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা এবং মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সঙ্গে পরিচিত দুটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে। এতে বলা হয়, হোয়াইট হাউসে একটি বৈঠকে এসব কথা বলেন তিনি।

এরপর একই দাবি করেন ওভাল অফিসে বসে। সেখানে জিজ্ঞাসা করা হলে ট্রাম্প বলেন, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের পাল্টা হামলা তাঁকে বিস্মিত করেছে। সোমবার তিনি বলেন, ‘তারা (ইরান) মধ্যপ্রাচ্যের এতগুলো দেশের ওপর হামলা চালাবে বলে কথা ছিল না। কেউ এটা আশা করেনি। আমরা হতবাক।’