Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বিএনপি। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর ক্ষমতায় ফেরায় দলটির নেতাকর্মীরা এখন এক ধরনের উৎসবের আমেজের মধ্যে রয়েছেন। এমন পরিস্থিতির মধ্যে চলে আসছে আরেক উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর। তাই ঈদে বেশির ভাগ মন্ত্রী ও এমপি এবার নিজ নিজ এলাকায় যাবেন। পরিবারের পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেবেন তারা।

জানা গেছে, এলাকার জনগণের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানেরও নির্দেশনা রয়েছে। মন্ত্রী-এমপিরা এলাকায় যাবেন বলে তৃণমূল নেতাকর্মীরাও উজ্জীবিত। তাদের কেউ কেউ আগেভাগেই নিজ নির্বাচনি এলাকায় অবস্থান করছেন বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে। বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছেন, গত ১৭ বছর অনুকূল পরিবেশে ঈদ উদযাপনের সুযোগ পাননি তারা। রাজনৈতিক চাপ, মামলা ও নানা শঙ্কার কারণে অনেকেই এলাকায় যেতে পারেননি। এবার সেই পরিস্থিতি বদলেছে বলে মনে করেন তারা। ফলে বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে এবারের ঈদ শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, রাজনৈতিকভাবেও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

তারা বলছেন, ভয়-ডরহীন পরিবেশে পরিবার ও দলের সহকর্মীদের সঙ্গে এবার ঈদ উদযাপনের সুযোগ পেয়েছেন তারা। তাই স্থানীয় নেতাকর্মীদের বড় অংশই এলাকায় মন্ত্রী ও এমপির আগমনের অপেক্ষায় আছেন।

এদিকে দীর্ঘ ১৭ বছর পর এবার সপরিবারে দেশে ঈদ উদযাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ঢাকায় ঈদের নামাজ আদায় করবেন তিনি। ঈদের দিন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় সকাল ১০টা থেকে ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, রাজনৈতিক দলের নেতা, মন্ত্রী-এমপি, বিশিষ্ট নাগরিক, আলেম-ওলামা-মাশায়েখ, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন প্রধানমন্ত্রী।

সরকারে অনেক মন্ত্রী-এমপি ও বিএনপির সিনিয়র নেতারা সকালে জাতীয় ঈদগা ময়দানসহ বিভিন্ন স্থানে নামাজ শেষে যমুনায় শুভেচ্ছা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। পরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিস্থল জিয়ারত করবেন তারা। এরপর তাদের নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় যাওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে কেউ কেউ সকালে নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় ঈদ উদযাপন শেষে ঢাকায় ফিরবেন।

জানা যায়, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকায় ঈদ করবেন। পরদিন নির্বাচনি এলাকা ঠাকুরগাঁও যাবেন তিনি। প্রতিবছরের মতো এবারও নিজ নির্বাচনি এলাকা চট্টগ্রামে ঈদ করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ নিজ এলাকা কক্সবাজারে যাওয়ার কথা রয়েছে।

বিদুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ঈদ করবেন ঢাকায়। মহিলা ও শিশু এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেনের নিজ এলাকা দিনাজপুরে যাওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়কমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু ঢাকায়, ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ কুমিল্লায়, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু রাজশাহী, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী মাগুরা, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সিলেট, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক সিলেট, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বরিশাল, খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ কুমিল্লা, বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা মানিকগঞ্জ, পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি লক্ষ্মীপুর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু লালমনিরহাট, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ঝিনাইদহ, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের কুমিল্লা, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক দীপেন দেওয়ান রাঙামাটি, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন চাঁদপুর, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন নরসিংদী, ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম টাঙ্গাইল, সড়ক, সেতু, রেল ও নৌমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ঢাকা এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আযম খান টাঙ্গাইলে ঈদ করবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের অনেকেই ঢাকায় ঈদের নামাজ শেষে এলাকায় যাওয়ার কথা রয়েছে। আবার কেউ কেউ এলাকায় ঈদ করে ঢাকায় ফিরবেন।

এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) মির্জা আব্বাস গুরুতর অসুস্থ হয়ে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। মন্ত্রী পদমর্যাদার রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান ও রুহুল কবির রিজভী ঢাকায় ঈদ করবেন। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) হুমায়ুন কবির ও মাহদী আমিনও ঢাকায় ঈদ করবেন। তবে হুমায়ুন কবিরের সিলেট যাওয়ারও কথা রয়েছে।

এছাড়া প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জামালপুরে, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত যশোর, মো. শরীফুল আলম কিশোরগঞ্জ, শামা ওবায়েদ ইসলাম ফরিদপুর, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু টাঙ্গাইল, ফরহাদ হোসেন আজাদ পঞ্চগড়, মো. আমিনুল হক ঢাকা, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন চট্টগ্রাম, হাবিবুর রশিদ হাবিব ও মো. রাজিব আহসান ঢাকায়, মো. আব্দুল বারী জয়পুরহাট, মীর শাহে আলম বগুড়া, জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি ঢাকা, ইশরাক হোসেন ঢাকা, ফারজানা শারমীন নাটোর, শেখ ফরিদুল ইসলাম বাগেরহাট, নুরুল হক নুর পটুয়াখালী, ইয়াসের খান চৌধুরী ময়মনসিংহ, এম ইকবাল হোসেইন ময়মনসিংহ, এমএ মুহিত সিরাজগঞ্জ, আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর পিরোজপুর, ববি হাজ্জাজ ঢাকা, আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম রাজবাড়ীতে ঈদ করবেন বলে জানা গেছে।

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বরগুনায়, হুইপ জিকে গউছ হবিগঞ্জে, রকিবুল ইসলাম বকুল খুলনায়, মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু ঢাকা ও শরীয়তপুর, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু নাটোর, আখতারুজ্জামান মিয়া দিনাজপুর এবং এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান লক্ষ্মীপুরে ঈদ উদযাপনের কথা রয়েছে।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, পরিবারের সদস্য ও এলাকার মানুষের সঙ্গে সব সময় আমার ঈদ কাটে। এবারও তেমনটাই হবে। সকালে পারিবারিক মসজিদে ঈদের নামাজ পড়ব। মা-বাবার কবরসহ পরিবারের অন্যদের কবর জিয়ারত করব। নামাজ শেষে পরিবারের সবাই একত্রে খাওয়া-দাওয়া করব। প্রতিবছর দিনের বেশির ভাগ সময়ই এলাকায় কাটাই।

সেতু ও নৌ-পরিবহণ প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান যুগান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অনেক বড় দায়িত্ব দিয়েছেন। নাড়ির টানে ঢাকা ছাড়ছেন রাজধানীবাসী। ঈদে মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারে সেটি তদারকির জন্য এবার সদরঘাটসহ বিভিন্ন নৌ টার্মিনালে থাকব। সবকিছু ঠিক থাকলে ঈদের দিন রাতে নির্বাচনি এলাকা (বরিশাল-৪) হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জের জনগণের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করব।

বিএনপির সিনিয়র নেতাদের ঈদ : বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন দাউদকান্দি কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে নামাজ আদায় করে ঢাকায় ফিরবেন। এরপর তিনি প্রধানমন্ত্রীর ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য জমিরউদ্দিন সরকার, সেলিমা রহমান ঢাকায় ঈদ করবেন। গয়েশ্বর চন্দ্র রায় তার নির্বাচনি এলাকা কেরানীগঞ্জে নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঈদের সময় কাটাবেন। এছাড়া বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বরিশালে, বরকতউল্লা বুলু নোয়াখালী, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন নরসিংদী, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স ময়মনসিংহ ও আব্দুস সালাম আজাদ মুন্সীগঞ্জে ঈদ করবেন। ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুল গাজীপুরের নিজ নির্বাচনি এলাকায়, নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ ঢাকায় ঈদ করবেন।

সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, এবারের ঈদে সবাই মুক্ত মনে যার যার ঠিকানায় ফিরে যাচ্ছেন। কিছু দিনের জন্য নিকট আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করবেন। গত সতের-আঠারো বছরে এমন গণতান্ত্রিক মুক্ত পরিবেশ কখনো আসেনি। মনে হচ্ছে মানুষ একটা বিশুদ্ধ বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। সেই সঙ্গে মনের দুয়ার খুলে দিয়ে এবার ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করবেন।

জামায়াতের সংসদ-সদস্য ও সিনিয়র নেতারা কে কোথায় ঈদ করবেন : জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এমপি তার নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-১৫ আসনের মানুষের সঙ্গে পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করবেন। নামাজের পর সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন তিনি। বিরোধীদলীয় নেতার ২৯ মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবনে বেলা ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ঢাকার কূটনৈতিক মিশনের কূটনীতিকদের সঙ্গে এবং বেলা ৩টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে পবিত্র ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন।

সংসদ-সদস্য ও দলটির নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম ঢাকায়, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান রাজশাহীর গোদাগাড়ী, ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের ঢাকায়, সাবেক এমপি মাওলানা শামসুল ইসলাম চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায়, সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার খুলনায়, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম কুমিল্লার লাকসামে, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায়, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ ঢাকায়, মাওলানা আবদুল হালিম কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জম হোসাইন হেলাল বরিশালে, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সিলেটে, মাওলানা মো. শাহজাহান চট্টগ্রামে, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য আবদুর রব ঢাকায়, সাইফুল আলম খান মিলন এমপি ঢাকায়, অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ ঢাকায়, অধ্যক্ষ মো. শাহাবুদ্দিন বগুড়ায়, অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহ এমপি সাতক্ষীরায়, মোবারক হোসাইন ঢাকায় ঈদ উদযাপন করবেন।