Image description
ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়ম

ঢাকার আবাসন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। প্রতিষ্ঠানটির কাজ নীতিমালা ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন। তবে এই প্রতিষ্ঠানটি ঘিরে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগ বহু পুরোনো। ঘুষ লেনদেনের ঘটনাও এখানে নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। এবার প্রতিষ্ঠানটির প্রায় দেড় ডজন কর্মকর্তার সন্ধান পেয়েছে কালবেলা—যারা রাজউকে চাকরি নামক জাদুর কাঠির বদৌলতে শূন্য থেকে বনে গেছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ওই কর্মকর্তাদের রয়েছে একাধিক বহুতল ভবন, ফ্ল্যাট, প্লট, গাড়ি; স্ত্রী-সন্তানদের নামেও রয়েছে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। দশম গ্রেডের ইমারত পরিদর্শক থেকে শুরু করে ১৭ গ্রেডের কর্মচারী পর্যন্ত রয়েছেন এই তালিকায়। এসব কর্মকর্তার সবার বিরুদ্ধেই রয়েছে নকশা জালিয়াতি, দরপত্র নিয়ন্ত্রণ ও ঘুষ বাণিজ্যের বিস্তৃত তথ্য-প্রমাণ।

নোটিশের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, সেবা পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য করাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে। এত অপকর্ম করেও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থেকে অতীতে বারবার পার পেয়ে গেছেন তারা। এরই মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রাজউকের একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে। অনুসন্ধানে নেমে নামে-বেনামে এমন অঢেল সম্পদ দেখে তাজ্জব বনে যাচ্ছেন দুদকের কর্মকর্তারাও।

যাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক, তাদের মধ্যে রয়েছেন—ইমারত পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান, নকশাকার শফিউল্লাহ বাবু, সাঁটলিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর জাফর সাদেক, ইমারত পরিদর্শক আমীর খসরু, ইমারত পরিদর্শক মো. তারিফুর রহমান, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আবদুল মোমিন, নকশাকার এমদাদ আলী, সুপারভাইজার খালেদ মোশাররফ তালুকদার (রুবেল), সহকারী অথরাইজড অফিসার মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন, বেঞ্চ সহকারী বাসার শরীফ, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ইউসুফ মিয়া, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর বেলাল হোসেন চৌধুরী রিপন, উচ্চমান সহকারী মোহাম্মদ হাসান ও রেকর্ড কিপার মো. ফিরোজ।

তথ্য বলছে, ঢাকার পরিকল্পিত উন্নয়নের ধারণা শুরু হয় পাকিস্তান আমলে। ১৯৫৬ সালে গঠিত হয় ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি), যা ছিল ঢাকার প্রথম আধুনিক নগর পরিকল্পনা সংস্থা। এর কাজ ছিল নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন, আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়ন। ডিআইটির সময়েই গুলশান, বনানী, ধানমন্ডির মতো পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠে। এরপর ১৯৮৭ সালে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী ডিআইটিকে পুনর্গঠন করে রাজউক প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর মাধ্যমে সংস্থাটির ক্ষমতা ও কার্যপরিধি আরও বিস্তৃত হয়। রাজউক প্রতিষ্ঠার পর থেকে ঢাকার সার্বিক নগর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পায়। এর মধ্যে রয়েছে—মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন, ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, আবাসন প্রকল্প (পূর্বাচল, উত্তরা, ঝিলমিল ইত্যাদি) বাস্তবায়ন এবং নগর উন্নয়ন ও অবকাঠামো পরিকল্পনা। বর্তমানে রাজউক ঢাকার দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যার চাপ ও অবৈধ নির্মাণ নিয়ন্ত্রণের মতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।

অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় দুর্নীতি, অনিয়ম ও অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে ঘুষ-দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে দুদকের এক মহাপরিচালক কালবেলাকে বলেন, ‘রাজউকের কর্মকর্তাদের এত সম্পদ, যা অকল্পনীয়। ১৭ গ্রেডের কর্মচারীও কোটি টাকার মালিক। বেশ কয়েকজনের চাকরির বয়স মাত্র ৫ থেকে ৭ বছর। এত অল্প সময়ে অঢেল সম্পদ দেখেই কিছুটা অনুমান করা যায়—তারা সেবাগ্রহীতাদের কী পরিমাণে হয়রানি করেছেন।’

তিনি জানান, বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান এরই মধ্যে শেষ পর্যায়ে রয়েছে। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদন দাখিল করলেই প্রতিবেদনের আলোকে মামলা করে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজউকের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দুদকে জমা পড়েছে বলে জানিয়েছেন কমিশনের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) তানজির আহমেদ। তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক অনুসন্ধানে এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়ায় এরই মধ্যে প্রকাশ্য অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। অনুসন্ধান দলের প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

৭ বছরে শতকোটির মালিক ইমারত পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান : ২০১৮ ব্যাচের ইমারত পরিদর্শক হিসেবে রাজউকে যোগ দেন মনিরুজ্জামান। চাকরির মাত্র ৭ বছরের মধ্যে বানিয়েছেন অঢেল সম্পত্তি। ঘুষ, দুর্নীতি, ভয়ভীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও মালিকদের জিম্মি করে এসব সম্পদ গড়েছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, মনিরুজ্জামান ভবন মালিকদের নোটিশ দেখিয়ে বা নোটিশের ভয় দেখিয়ে ঘুষ নিতেন। মালিককে আর কোনো নোটিশ দেওয়া হবে না—

এমনটি বলে তাদের কাছ থেকে নিতেন ২০-৩০ লাখ করে টাকা। দাবিকৃত টাকা না দিলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তাদের জরিমানা করতেন। এই কর্মকর্তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অনুসন্ধান করছে দুদক। রাজউক থেকেও এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

মনিরুজ্জামানের সম্পদের মধ্যে রয়েছে উত্তরা সেক্টর-১৭, রয়েলে টাওয়ারে দেড় হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট; ১৭ নম্বর সেক্টরে (পলিয়েন্থাস প্রকল্প) দেড় হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট; বাদলদি এলাকায় ‘বাদলটি হাইটস’ নামক ভবনে ১২শ বর্গফুটের ফ্ল্যাট; মিরপুর, ৬০ ফুট পীরেরবাগে আমতলা টাওয়ারে ১ হাজার ৬৩০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট; মহাখালী, ফলকন টাওয়ার (জি-৩৬), স্কুল রোডে ১২শ বর্গফুটের ফ্ল্যাট; বাংলামটর, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র রোডের সারিনা আশরাফ নিবাসের নবম তলা ভবনে (৯সি) ১২শ বর্গফুটের ফ্ল্যাট।

জমির মধ্যে রয়েছে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ২১নং ওয়ার্ড, বাউপাড়া মৌজায় (আর-এস দাগ নং ১১০) ২৫০ শতাংশ; পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কালীশুরী ইউনিয়নে (মৌজা-বড় আড়াইনাও—এসএ খতিয়ান-৮৯) ৬৬ দশমিক ৭০ শতাংশ; বরিশাল সিটি করপোরেশনের (মৌজা-বগুড়া আলেকান্দা, এসএ ২৪১৬৮, খতিয়ান-৬১৯৩ নং দাগ) স্ত্রীর নামে ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ জমি। বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় এই জমিটির বাজারমূল্য ৬ কোটি টাকা। এখানে একটি ১৩ তলা বহুতল ভবন নির্মাণাধীন। এ ছাড়া মনিরুজ্জামানের আত্মীয়স্বজনসহ নিজের ও স্ত্রীর নামে একাধিক ব্যাংক ডিপোজিট রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইমারত পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামানকে ফোন দেওয়া হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে অসুস্থ আছেন বলে ফোন কেটে দেন।

নকশা জালিয়াতির মাস্টারমাইন্ড শফিউল্লাহ বাবু: ২০০১ সালের ৯ জুলাই ১ হাজার ৮৭৫ টাকা বেতনে কার্য তদারককারী (মান-১) পদে রাজউকে যোগ দেন শফিউল্লাহ বাবু। বর্তমানে জোন-৬ রেখাকার পদে ৯ হাজার থেকে ২১ হাজার ৮০০ টাকার বেতন স্কেলে চাকরি করছেন। শফিউল্লাহ বাবুর বেতন ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ২১ হাজার টাকা হতে প্রায় ২৪ বছর সময় লাগলেও অর্থ কামিয়েছেন ১০ হাতে। এই সময়ে তিনি ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তার সম্পদের মধ্যে মধ্য পীরেরবাগের অপসরা সালমা গার্ডেন, অপসরা রাজ্জাক গার্ডেন, অপসরা সায়েম হোমস, পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় অপসরা পাহশালায় রয়েছে ফ্ল্যাট। এ ছাড়া মধ্য পীরেরবাগে নিজের নামে একটি ১০ তলা, একটি ৭ তলা ও একটি ৬ তলা বাড়ি এবং মিরপুরের ৬০ ফিটে জমিসহ ৫ তলা ভবন।

শফিউল্লাহ বাবুর রয়েছে রাজউক প্রকল্পে নামে-বেনামে প্লট, যার মধ্যে পূর্বাচল প্রকল্প—৫, ৭ ও ১০ কাঠার ৩টি প্লট এবং উত্তরা ও ঝিলমিল প্রকল্পে প্লট। তিনি চড়েন কোটি টাকা মূল্যের গাড়িতে, যার নম্বর ঢাকা মেট্রো-গ-২০-৩০২০।

তথ্য বলছে, স্ত্রী কুলসুমী আক্তার লিজার নামে জয়েন্ট স্টক কোম্পানি থেকে ‘অপসরা হোমস লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন। যার রেজিস্ট্রেশন নম্বর: ৯৫০৫৩, নিবন্ধনের তারিখ ২৩ আগস্ট, ২০১১। এই প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক মূলধন ৩০ লাখ টাকা থাকলেও বর্তমানে শত কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কাগজ-কলমে প্রতিষ্ঠানটির এমডি শফিউল্লাহ বাবুর স্ত্রী কুলসুমী আক্তার লিজা, চেয়ারম্যান শ্বশুর মো. হুমায়ুন কবির এবং পরিচালক শফিউল্লাহ বাবুর ভাই হাসনাত উল্লাহ দিপু।

২০১২ সাল থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে প্রায় ১৭ বার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন শফিউল্লাহ বাবু। তার ব্যবহার করা দুটি পাসপোর্টের নম্বর রয়েছে কালবেলার হাতে। এর মধ্যে থাইল্যান্ডেই গেছেন ৮ বার। এ ছাড়াও সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া নেপাল, দুবাই ভ্রমণ করেছেন।

দুদকে জমা পড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজউকের কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর নকল করে নিজেই ফাইল অনুমোদন করেন শফিউল্লাহ বাবু। তিনি রাজউকের নকশা জালিয়াতি সিন্ডিকেটের প্রধান হোতা। এ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে ডেভেলপার কোম্পানি ট্রপিক্যাল হোমস, সামসুল আলামিন গ্রুপ ও ইউনিক গ্রুপের ব্রোকার হিসেবেও রাজউকে পরিচিত। এর আগে তিনি ১৪ তলা ভবনের নকশা জালিয়াতির দুদকের মামলায় গ্রেপ্তার হলেও রহস্যজনকভাবে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে পার পেয়ে যান।

কম্পিউটার অপারেটর জাফর সাদেকও কোটিপতি: নকশা পাস ও প্লট বেচাকেনার ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণে সম্পদ গড়েছেন জাফর সাদেক। তার সম্পদের মধ্যে রয়েছে আফতাবনগর, ডি-ব্লক, রোড-৫, প্লট-২৯—সাড়ে ৩ কাঠায় প্লটে ৮ তলা বাড়ি (নূর আহমেদ ভিলা) এবং ৩৩, শান্তিনগরে একটি ফ্ল্যাট।

আমীর খসরুর শতকোটির সম্পদ: নব্বইয়ের দশকে উপ-ইমারত পরিদর্শক হিসেবে যোগ দেওয়া আমীর খসরুর নিজের ও স্ত্রীর নামে রাজধানীজুড়ে অনেক ফ্ল্যাট ও প্লট রয়েছে। তার সম্পদের মধ্যে রয়েছে বাড্ডা পুনর্বাসন প্রকল্পে (১০ নম্বর রোড, হোল্ডিং ৭৪) ৬তলা বাড়িতে ১১টি ফ্ল্যাট। প্রত্যেক ফ্ল্যাটের আনুমানিক মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। বাড্ডা পুনর্বাসন প্রকল্পে (১১ নম্বর রোড, হোল্ডিং ৬৯ ও ৭১) তিন কাঠা আয়তনের দুটি প্লট একত্র করে ছয়তলা বাড়ি নির্মাণ। বাড্ডা প্রকল্পে (১২ নম্বর রোড, হোল্ডিং ৬৫) তিন কাঠার ওপর ছয়তলা বাড়িতে মোট ১২টি ফ্ল্যাট। নথিতে এই বাড়ির মালিক খসরুর ভাগনে আসলাম নামের এক ব্যক্তি।

খসরুর আরও সম্পদের মধ্যে আছে পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় (হোল্ডিং ৭৪১) ৬ তলা ভবনে ১৭টি ফ্ল্যাট। উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরে (রোড ৭, হোল্ডিং ২২/এ) ৫ কাঠার প্লট, যার মূল্য ১৩ কোটি টাকা; উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরে (রোড ৮, হোল্ডিং ৪১) ৫ কাঠার প্লট। প্রায় ১৪ কোটি টাকা মূল্যের এই প্লটটি আমীর খসরুর মায়ের নামে নথিভুক্ত।

ইমারত পরিদর্শক তারিফুর রহমানেরও অঢেল সম্পদ: ২০১৮ সালে ২ জুলাই রাজউকে চাকরি নেন তারিফুর রহমান। তার বিরুদ্ধে ডেমরা এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে কৃষি জমিতে অনুমোদন ছাড়াই ভবন নির্মাণে নিরব থাকার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ভবন মালিকদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের ভয় দেখিয়ে প্রতি ভবন থেকে ঘুষ আদায় করতেন তিনি। কেউ টাকা না দিলে একাধিকবার নোটিশ দিয়ে হয়রানি করতেন। এতেও কাজ না হলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করাসহ নানাভাবে হয়রানি করতেন।

তারিফুরের সম্পদের মধ্যে রয়েছে ১৫৮/১, ওয়াপদা রোড, রামপুরা মহানগর মাজিদ ট্রেস ভবনের ৯ তলায় ১৮শ বর্গফুটের ফ্ল্যাট; ১২/৪৭৮, ওমর আলী লেন, রামপুরা চতুর্থ তলায় ৯৫০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট; একই এলাকায় এক্সিউড ডেভেলপার্সে ১৪শ বর্গফুটের ফ্ল্যাট। এ ছাড়াও আফতাবনগরে আড়াই কাঠা ও তিন কাঠার দুটি প্লট।

অভিযোগের বিষয়ে ইমারত পরিদর্শক তারিফুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘দুদকে তদন্ত হচ্ছে, দুদক দেখবে। আমার ইনকাম ট্যাক্স দেওয়া আছে। অবৈধ কিছু নেই।’

ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আবদুল মোমিনের একাধিক বাড়ি-প্লট: রাজউকের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আবদুল মোমিনের রাজধানীতে রয়েছে একাধিক বাড়ি ও প্লট। যার মধ্যে আছে মুগদায় ৭১ নম্বর ওয়ার্ড, ৭ নম্বর প্লটে ৫ কাঠা জমিতে ৭ তলা বাড়ি; মতিঝিল, ১০ কবি জসীমউদদীন রোড, নকশীকাঁথার মাঠ ভবনে ১ হাজার ৭২৫ বর্গফুটের ফ্ল্যাট। এ ছাড়া সাভার, ভাদাইল, পুরোনো ইপিজেড সংলগ্ন হোসেন প্লাজার পাশে দুই বিঘা জমিতে টিনশেড ঘর বানিয়ে ভাড়া দিয়েছেন তিনি। পূর্বাচলে স্ত্রীর নামে রয়েছে আরও একটি প্লট।

নকশাকার এমদাদ আলীর রয়েছে ৬ তলা বাড়ি: নকশাকার এমদাদ আলীর বাড্ডা পুনর্বাসন প্রকল্প ৫ কাঠায় প্লটে রয়েছে ৬ তলা বাড়ি। এ ছাড়া ডেমরায় রয়েছে ৭ কাঠার দুটি প্লট।

সুপারভাইজার খালেদ মোশাররফের ৫ তলা বাড়ি: রাজউকের সুপারভাইজার খালেদ মোশাররফ তালুকদার (রুবেল) বগুড়ার শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে ৭ কাঠা জমিতে নির্মাণ করেছেন ৫ তলা বাড়ি। এ ছাড়া রাজধানীর মাদারটেকে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে রয়েছে একটি মার্কেট। সাধারণ একজন কর্মকর্তা হয়েও নিজে চড়েন প্রাইভেট কারে।

আবদুল্লাহ আল মামুনের বিপুল সম্পদ: রাজউকের সহকারী অথরাইজড অফিসার মো. আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে বিপুল সম্পত্তি অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। এরই মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও পেয়েছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি। এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের টেবিলে জমা পড়া অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—মিরপুর, আফতাবনগর, চিড়িয়াখানা রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় নকশাবিহীন ভবন অনুমোদন দিয়ে ঘুষ গ্রহণ, ভবন মালিকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে মাসোহারা আদায় ও ‘উচ্ছেদ’ বা ‘সংযোগ বন্ধের’ হুমকি দিয়ে অর্থ আদায়। এই কর্মকর্তার সম্পদের মধ্যে রয়েছে আফতাবনগরে (ব্লক-ডি, রোড-৫) প্লট; আফতাবনগর ডিআইটি প্রজেক্টে সাড়ে তিন ও সাড়ে সাত কাঠার জমিতে ১০ তলা ভবন, যার মূল্য প্রায় ৩৯ কোটি টাকা; পিরোজপুরের বাউফল উপজেলার মুরাদপুর গ্রামে নিজ ও আত্মীয়দের নামে প্রায় ৩ কোটি টাকার জমি। গাজীপুরে স্ত্রীর নামে আনুমানিক ২ কোটি টাকার জমি। আরও রয়েছে প্রাইভেট কার টয়োটা ইয়ারিস (ঢাকা মেট্রো খ-২২-০৭৩৯)।

জানতে চাইলে রাজউকের সহকারী অথরাইজড অফিসার মো. আবদুল্লাহ আল মামুন কালবেলাকে বলেন, ‘দুদকে অভিযোগ রইছে দুদক দেখবে, আপনাদের কী। এখন আর কথা বলতে চাচ্ছি না। তারাবিতে যাইতে হবে।’

এ ছাড়াও বেঞ্চ সহকারী বাসার শরীফের রয়েছে ঢাকার মানিকনগর পুকুরপাড়ে ২ হাজার ৬০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট। রয়েছে একটি টয়োটা নোয়া গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-ছ-১৯-০৪১৪)। অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ইউসুফ মিয়ার ঢাকায় কোনো সম্পত্তি না থাকলেও চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মিঠানগর ইউনিয়নের মলিহাস গ্রামে নির্মাণ করেছেন ৩ তলা বাড়ি। রয়েছে দুটি গরুর খামার, যেখানে শতাধিক গরু রয়েছে। অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর বেলাল হোসেন চৌধুরী রিপনের রয়েছে রাজধানীর পল্টনে (৬৬ শান্তিনগর হোল্ডিং) একটি ফ্ল্যাট। উচ্চমান সহকারী মোহাম্মদ হাসানের বাড্ডায় রয়েছে ৬ তলা বাড়ি ও আফতাব নগরে একটি প্লট। রেকর্ড কিপার মো. ফিরোজের উত্তরা মডেল টাউনে (১২ নম্বর সেক্টর) ৬ তলা একটি বাড়ি রয়েছে।

কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও বিপুল সম্পদ থাকার বিষয়ে কথা হলে রাজউকের পরিচালক (প্রশাসন) এ বি এম এহছানুল মামুন কালবেলাকে বলেন, ‘রাজউকের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে রাজউক কর্তৃপক্ষ। আর দুদক যদি অবৈধ টাকা বা সম্পত্তির প্রমাণ পায়, তারা তাদের মতো আইনি ব্যবস্থা নেবে।’

এসব দুর্নীতিবাজের সহায়তাকারীদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি ইফতেখারুজ্জামানের: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দুর্নীতিবাজ এসব কর্মকর্তার নেপথ্যে থেকে যারা সহযোগিতা করেছেন, তাদেরও চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘অবাক হওয়ার কিছুই নেই। রাজউক যে আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত একটি প্রতিষ্ঠান, এসব তথ্য তারই প্রমাণক হিমশৈলীর চূড়ামাত্র। বৈধ উপায়ে এমন সম্পদের মালিক হওয়ার কোনো সুযোগ রাজউকের মতো প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তার নেই। দুর্নীতির অভিযোগে যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে ঊর্ধ্বতন, অধস্তন এবং সমপর্যায়ে যারা অংশীদার রয়েছেন বা বিভিন্নভাবে সুযোগ করে দিয়েছেন এবং সুরক্ষা দিয়েছেন, তাদেরও চিহ্নিত করে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।’