ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের (ওয়াসা) বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমোদন ছাড়াই আউটসোর্সিংয়ে জনবল নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২ হাজার ৫৯৪ জনের নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। শুধু তাই নয়, সংস্থাটির চাকরিবিধির তোয়াক্কা না করে ১০ থেকে ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ারও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অনিয়মের সঙ্গে সংস্থাটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আব্দুস ছালাম ব্যাপারী ও উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) আমিরুল ইসলামের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযুক্ত প্রকৌশলী মো. আব্দুস ছালাম ব্যাপারী সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন। তার বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্ত করছে দুদক। তিনি ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক সচিব মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদী যুগান্তরকে বলেন, ওয়াসায় জনবল নিয়োগের আগে স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমোদন নিতে হয় কিনা তা এই মুহূর্তে আমার মনে নেই। এছাড়া একজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে একাধিক দায়িত্ব দেওয়ার বিধান ওয়াসার প্রবিধানে আছে কিনা তাও আমার অজানা। আমি যেহেতু দায়িত্বে নেই তাই এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না। তবে ওয়াসা দেখভাল করে মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব তিনি এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।
স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মনিরুজ্জামান বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে আপনি অন্যদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।
এ বিষয়ে সংস্থাটির ডিএমডি আমিরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলতে কাওরান বাজারে তার দপ্তরে গেলে জানানো হয়, তিনি মন্ত্রণালয়ে আছেন। তবে তাকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি খুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনা উত্তর দেননি।
জানা গেছে, গত ২৮ জানুয়ারি ঢাকা ওয়াসায় দুই বছরের জন্য একসঙ্গে ২ হাজার ৫৯৪ জনকে আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ১৪ দিন আগে তড়িঘড়ি করে এ জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়। এই বিপুলসংখ্যক জনবল নিয়োগে সেবাকে অজুহাত হিসাবে দেখানো হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠানো এক পত্রে সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক উল্লেখ করেন, ওয়াসার বিদ্যমান সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তন, পরিমার্জন ও সংশোধন সময়সাপেক্ষ বিধায় অউটসোর্সিংয়ে জনবল নিয়োগ দেওয়া হলো।
আউটসোর্সিংয়ের কর্মচারীদের মধ্যে অনেককে বিলিং অ্যাসিসটেন্ট হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যারা বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যবহৃত মাসিক পানির বিল তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত। মহানগরীর একাধিক বাড়ির মালিকের অভিযোগ, এরা বাসাবাড়ি এবং নির্মাণাধীন ভবনে গিয়ে লাখ লাখ টাকা বখরাবাজি করে। কোনো বাড়ি বা ভবনের মালিক টাকা দিতে না চাইলে মিটার ভালো না, মিটার টেম্পারিং করা হয়েছে বা মিটারে বিল কম উঠছে ইত্যাদি বলে হয়রানি করে। বিষয়গুলো নিয়ে ওয়াসার স্থায়ী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তারা গ্রাহকদের সাফ জানিয়ে দেন, দেখুন এরা নিম্নশ্রেণির মাস্টাররোল কর্মচারী। এদের চাকরি স্থায়ী নয়। সুতরাং এদের কী বিচার করব। অথচ তারাই অফিসে এসি রুমে ঠান্ডা হওয়ায় বসে গল্প-গুজবে সময় কাটায় আর মাস্টাররোল কর্মচারীদের দিয়ে অপকর্ম করায়।
ওয়াসাসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শতাধিক ব্যক্তিকে নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি দায়িত্ব প্রদানে ১০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। গত ২০ জানুয়ারি রাজস্ব জোন-১ এর উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. তানভীর আহমেদ সিদ্দিকিকে প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার দপ্তরে স্থানান্তর করা হয়। উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার দায়িত্ব রাজস্ব কর্মকর্তার চলতি দায়িত্বে থাকা মো. রফিকুল ইসলামের কাছে হস্তান্তরের আদেশ দেওয়া হয়। অপর এক আদেশে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর (চ:দা:) দায়িত্বে থাকা মো. ফখরুল ইসলামকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের স্টাফ অফিসারের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আরেক আদেশে, সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী (চ:দা:) মো. নুরুজ্জামানকে নিজ দায়িত্বসহ উপসচিব (কো-অর্ডিনেশন) পদের অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। আরেক আদেশে আটজন কর্মকর্তাকে উচ্চতর গ্রেড প্রদান করা হয়েছে। পৃথক এক আদেশে, উপপ্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. সালেকুর রহমানকে প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আরেক আদেশে, ৫ জন প্রকৌশলীকে নির্বাহী প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ভিন্ন এক আদেশে, ৩৮ জন পাম্প অপারেটরকে অফিস সহকারী কাম ডাটা এন্ট্রি অপারেটর পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি দুজনকে উপসচিব পদে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে একজনকে প্রশাসন-১ শাখায় অপরজনকে ভূমি শাখায় বদলি করা হয়। পিএন্ডডি সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আলমগীর হাছিন চৌধুরীকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই মাসের ১০ তারিখে চারজনকে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ৯ ফেব্রুয়ারি ছয় কর্মচারীকে মডস জোন-৩, ৪, ৪, ৫, ৬ ও ১০-এর অফিস সহকারী কাম ডাটা এন্ট্রি অপারেটর, পাম্পচালক পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।